Published : 26 Dec 2025, 03:58 PM
বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন সারা বিশ্বে। সুনামের সাথে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন এবং সমাদৃত হচ্ছেন সেই দেশে। তেমনই এক প্রবাসী বিজ্ঞানীর গল্প আজ বলব।
বগুড়ার ছেলে মাহমুদুল কবীর ১৯৯৪ সালে জাপানের ‘মনবুশো বৃত্তি’ নিয়ে সেদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। তিনি জাপানের আকিতা ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৮ সালে তিনি সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১৭ সাল থেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
ড. কবীরের গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক বা ডাই-ইলেকট্রিক উপকরণের ‘ইকুইভ্যালেন্ট সার্কিট মডেলিং’, জিঙ্ক অক্সাইড ভিত্তিক কম্পোজিট, ‘ইলেক্ট্রো-কাইনেটিক’ পদ্ধতিতে মাটি পরিশোধন, বর্জ্য বায়োমাসের পুনর্ব্যবহার এবং ‘মাইক্রোবিয়াল ফুয়েল সেল’ (এমএফসি) বিশেষত শ্যাওলা বা ‘ব্লু-গ্রিন অ্যালগি’ (জাপানি ভাষায় যাকে বলা হয় ‘আওকো’) ব্যবহার করে ক্ষুদ্র পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
আকিতা অঞ্চলের হ্রদ থেকে সংগৃহীত শ্যাওলা কালচারের ওপর ভিত্তি করে তার গবেষণা দল বর্তমানে ল্যাবে এমএফসি নির্মাণের কাজ করছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো বর্জ্যকে শক্তিতে রূপান্তর করে টেকসই জ্বালানি এবং দুর্যোগকালে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের সমাধান খুঁজে বের করা। অধ্যাপক মাহমুদুল কবীর এই সাক্ষাৎকারে তার গবেষণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
মশিউর রহমান: শ্যাওলা বা ‘আওকো’ আসলে কী? আমরা পুকুরে যা দেখি সেটা কেন হয়?
মাহমুদুল কবীর: শ্যাওলা বা ‘ব্লু-গ্রিন অ্যালগি’ হলো এক ধরনের ক্ষুদ্র অণুজীব, যা পানির ভেতর সূর্যের আলো ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণ বা ‘ফটোসিন্থেসিস’ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে। গরমের দিনে যখন জলাশয়ে অতিরিক্ত পুষ্টি যেমন- নাইট্রেট বা ফসফেট থাকে, তখন শ্যাওলা খুব দ্রুত বাড়ে এবং সবুজ আবরণে পানির উপরিভাগ ঢেকে ফেলে। পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ইউট্রোফিকেশন’ বলা হয়। এটি একটি পরিবেশগত সমস্যা, কারণ এর ফলে জলাশয়ের অক্সিজেন কমে যায় এবং জলজ প্রাণীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই শ্যাওলাকেই আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি!
মশিউর রহমান: মাইক্রোবিয়াল ফুয়েল সেল বা এমএফসি আসলে ঠিক কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করে?
মাহমুদুল কবীর: মাইক্রোবিয়াল ফুয়েল সেল বা সংক্ষেপে এমএফসি হলো এক ধরনের জৈব প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি এমন একটি যন্ত্র যেখানে অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়ারা যখন কোনো জৈব পদার্থ ভেঙে ফেলে, তখন সেখান থেকে যে ‘ইলেকট্রন’ মুক্ত হয়, সেটিকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়। সহজভাবে বললে, এটি প্রকৃতির ক্ষুদ্র অণুজীবদের সাহায্যে বিদ্যুৎ বানানোর এক অনন্য প্রযুক্তি। ফটোসিন্থেসিসের মাধ্যমে শ্যাওলা আলো থেকে জৈব পদার্থ ও অক্সিজেন তৈরি করে। সেই জৈব পদার্থই ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে এবং উৎপন্ন অক্সিজেন ক্যাথোড প্রতিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। অর্থাৎ, শ্যাওলা একদিকে খাদ্য তৈরি করে, অন্যদিকে পরিবেশে অক্সিজেন যোগ করে এমএফসির কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
মশিউর রহমান: স্কুলে বা বাড়িতে ছোট পরিসরে এমএফসি বানানো সম্ভব কি? এর জন্য কী কী প্রয়োজন হবে?
মাহমুদুল কবীর: হ্যাঁ, এটি খুবই সম্ভব এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবেই করা যায়। এর জন্য দুটি ছোট কাচ বা প্লাস্টিকের পাত্র, দুটি গ্রাফাইট পেন্সিলের লিড (অ্যানোড ও ক্যাথোড হিসেবে ব্যবহারের জন্য), কিছু শ্যাওলা মিশ্রিত পানি এবং একটি ছোট এলইডি লাইট লাগবে। অ্যানোডে শ্যাওলার মিশ্রণ রাখা হয় এবং ক্যাথোডে থাকে অক্সিজেনযুক্ত পানি। তারের মাধ্যমে এই দুটি ইলেকট্রোডের সংযোগ দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই এলইডি লাইটটি মৃদু আলো দেবে। এভাবেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের হাতে একটি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ কোষ তৈরি করতে পারে। ইন্টারনেট বা ইউটিউবে এ সংক্রান্ত অনেক ভিডিও রয়েছে যা দেখে এটি সহজে তৈরি করা সম্ভব।
মশিউর রহমান: শ্যাওলা ভিত্তিক এমএফসির মূল বৈজ্ঞানিক নীতিটি আসলে কী?
মাহমুদুল কবীর: একটি সাধারণ এমএফসির দুটি প্রধান অংশ থাকে- অ্যানোড চেম্বার এবং ক্যাথোড চেম্বার। এই দুটি অংশের মাঝখানে থাকে একটি ‘ক্যাটায়ন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন’, যা কেবল ধনাত্মক হাইড্রোজেন আয়ন বা প্রোটনকে প্রবেশ করতে দেয়। শ্যাওলা ফটোসিন্থেসিস করে অক্সিজেন ও জৈব পদার্থ তৈরি করে। অ্যানোডে থাকা অণুজীবরা এই জৈব পদার্থ ভেঙে ইলেকট্রন মুক্ত করে। এই ইলেকট্রন অ্যানোড থেকে তারের মাধ্যমে ক্যাথোডে যায় এবং সেখানে অক্সিজেনের সাথে প্রতিক্রিয়া করে পানি উৎপন্ন করে। এই পুরো চক্রটি চলার সময় নিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে থাকে।
মশিউর রহমান: সব শ্যাওলাই কি নিরাপদ? ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো সতর্কতা আছে কি?
মাহমুদুল কবীর: না, সব শ্যাওলা নিরাপদ নয়। কিছু শ্যাওলা (যেমন- ‘মাইক্রোসিস্টিস অ্যারুগিনোসা’) টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ নিঃসরণ করে, যা মানুষ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি করতে পারে। তাই এমএফসি তৈরিতে আমরা সব সময় নন-টক্সিক বা বিষমুক্ত প্রজাতি ব্যবহার করি। বিষাক্ত শ্যাওলা সাধারণত পানির ওপর ঘন সবুজ বা নীলচে সবুজ ফেনার মতো স্তর তৈরি করে। অন্যদিকে, অ-বিষাক্ত শ্যাওলা সাধারণত পাতলা আস্তরণ তৈরি করে অথবা পানিতে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে।
মশিউর রহমান: এই ধরনের প্রকল্প থেকে শিক্ষার্থীরা কী কী শিখতে পারে?
মাহমুদুল কবীর: প্রথমত, তারা বুঝতে শেখে যে প্রকৃতি নিজেই শক্তির এক অসীম উৎস। দ্বিতীয়ত, তারা দলগত কাজ, পরীক্ষার নকশা তৈরি এবং পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পায়। এটি একই সাথে বিজ্ঞান, পরিবেশ ও প্রযুক্তি শিক্ষার বা ‘স্টেম’ এডুকেশনের এক বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয়। বর্তমানে অনেক দেশের স্কুলে বিজ্ঞান মেলা বা হাতে-কলমে শিক্ষার অংশ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
মশিউর রহমান: বাংলাদেশের মতো দেশে এই গবেষণা কোথায় সবচেয়ে বেশি কাজে লাগতে পারে?
মাহমুদুল কবীর: বাংলাদেশের অনেক জলাশয় যেমন- বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যার মতো নদী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পুকুরগুলো শ্যাওলায় আবৃত থাকে। এই শ্যাওলা পরিষ্কার করার পাশাপাশি যদি আমরা এমএফসি পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি, তবে দুটি সমস্যার একসঙ্গে সমাধান সম্ভব হবে। এছাড়া গ্রামীণ স্কুলগুলোতে ছোট এমএফসি ল্যাব কিট দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চাকে দারুণভাবে উৎসাহিত করা যায়।
মশিউর রহমান: ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কেমন হতে পারে?
মাহমুদুল কবীর: ভবিষ্যতে এমএফসি প্রযুক্তি দুর্যোগকালীন সময়ে ছোট সেন্সর বা মোবাইল চার্জিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যবহৃত হতে পারে। এছাড়া হ্রদ বা লেক পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি স্বল্প পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের এই গবেষণা জাতিসংঘের এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৭ (সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি) এবং ১৪ (জলজ জীবন রক্ষা) অর্জনে সরাসরি সহায়তা করছে।
মশিউর রহমান: তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?
মাহমুদুল কবীর: আমার মতে, প্রকৃতিই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। পুকুরের শ্যাওলা দেখে যদি কেউ সাধারণ দূষণ মনে না করে একে শক্তির উৎস হিসেবে ভাবতে পারে, তবেই সে একজন বিজ্ঞানী হওয়ার পথে রয়েছে। ছোট ছোট আইডিয়া আর পরীক্ষা থেকেই একদিন বড় আবিষ্কারের জন্ম হয়। বিজ্ঞান আসলে অবিরাম কৌতূহলের চর্চা।