Published : 24 Sep 2024, 04:05 PM
ধোঁয়ার গন্ধটা যেনো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ভোরের আলো ঠিক পুরোপুরি ফোটেনি, কিন্তু স্টেশনের মাটিতে স্টিম ট্রেনের ইঞ্জিনের গর্জন পুরো এলাকা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে স্টিম ট্রেনটি স্টেশনের দিকে এগিয়ে আসছে, ঐতিহ্যের চাকার ঘূর্ণনে ক্রমাগত ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে আকাশ।
একটা সময় এটাই ছিল কোন শহরের প্রতিদিনের গল্প। আজ পুরোনো প্রযুক্তির জায়গায় এসেছে নতুন প্রযুক্তি। তখন আমরা পুরোনোকে ফেলে নতুন প্রযুক্তিকে আপন করে নিই। কিন্তু পুরোনোর মধ্যে রয়ে যায় ইতিহাস। তেমনই অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের রেলওয়ে জাদুঘর, স্থানীয়ভাবে ‘এনএসডব্লিউ রেলওয়ে মিউজিয়াম’ হিসেবে পরিচিত। এখানে সযত্নে সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার রেলওয়ের ইতিহাস।
এ জাদুঘরে গেলে হারিয়ে যেতে হয় সেই ধোঁয়াওঠা স্টিম ট্রেনের সময়ে। এটি নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণের সাবার্ব থ্রিলমেয়ারে অবস্থিত। এটি নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজধানী সিডনি থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সিডনি থেকে এখানে জনপরিবহন বা ব্যক্তিগত পরিবহনে যাওয়া যায়।
ওদের ওয়েবসাইটে গিয়ে টিকিট করে ফেললাম। চাইলে ওখানে পৌঁছেও সরাসরি কাউন্টার থেকে টিকিট কাটা যায়। তবে পুরোনো আমলের ট্রেনে চড়তে চাইলে আগে থেকেই টিকিট করাই উত্তম।
সপ্তাহান্তের শুরুর দিন আমরা রওয়ানা দিয়ে দিলাম থ্রিলমেয়ারের উদ্দেশ্যে। যাওয়া আসার জন্য আপনি যদি মোটরওয়ে এড়িয়ে যান তাহলে রাস্তার দুপাশে চমৎকার সব দৃশ্য দেখতে পাবেন। সেখানে পাহাড়ের ঢালে বা সমতলভূমিতে দেখতে পাবেন পালে পালে গরু, ভেড়া, ছাগল বা ঘোড়া চড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ একটা দুইটা বাড়ির চিমনি থেকে বের হচ্ছে সাদা ধোঁয়া। দেখে মনে হবে এগুলো যেনো সাদা মেঘের কারখানা। চিমনি থেকে দমকে দমকে সাদা মেঘ বের হয়ে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।
এমন সব দৃশ্য দেখতে দেখতেই আপনি পৌঁছে যাবেন থ্রিলমেয়ারে। পৌঁছে পার্কিংটা আপনাকে নিজে খুঁজে নিতে হবে। মূল রাস্তার দুই পাশে পর্যাপ্ত পার্কিং আছে। তারপর মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই টিকিট কাউন্টার। সেখানে টিকিট দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন টিকিটের দিন যেকোন সময়। শুধু খেয়াল রাখতে হবে আপনার ট্রেন ভ্রমণের সময়টা। ট্রেন ভ্রমণের সময়ের ১৫ মিনিট আগে ওরা মাইকে ঘোষণা দেয়। তখন স্টেশনে গিয়ে হাজির হতে হয়।
আমরা ট্রেন ভ্রমণের সময়ের একটু আগেভাগেই গিয়েছিলাম। পরিকল্পনা ছিল জাদুঘরটা ঘুরে দেখে তারপর ট্রেনে চড়ে ভ্রমণটা শেষ করা। আপনি চাইলে সেটা ট্রেনে চড়ার পরেও করতে পারেন। কাউন্টারের সামনেই কালের সাক্ষী হয়ে সব পুরোনো আমলের ট্রেনে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে প্রত্যেকটা ট্রেনে কোনটা কোন সময়ের উল্লেখসহ কোনটা কোন কাজে ব্যবহৃত হতো সেটাও লেখা আছে।
এছাড়া ট্রেনের কক্ষগুলোর ভেতরের সাজসজ্জাও ট্রেনের ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য আছে ক্ষুদে রেললাইন এবং ক্ষুদে ট্রেন। আরও রাখা হয়েছে পুরোনো আমলের বাক্স পেটরা থেকে শুরু করে স্টেশনের ঠেলাগাড়ি পর্যন্ত। এতে করে কিছু সময়ের জন্য হলেও আপনি হারিয়ে যাবেন সেই সময়ে।
একটা ট্রেন ব্যবহৃত হতো জেলের আসামিদের আনা-নেওয়ার কাজে। সেটার ভেতরে ঠিক সেই পরিবেশ ধরে রাখার জন্য রাখা হয়েছে হাতকড়া পরানো আসামির মূর্তি। আর ক্যাসেটে বাজানো হচ্ছে আসামিদের কথোপকথন। এমনকি আলোরও ভারসাম্য রাখা হয়েছে। এতে করে একটা গা ছমছমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আমি গিয়ে আসামির সামনের কক্ষে বসে আমার মেয়েকে বললাম ছবি তুলে দিতে। তারপর আসামিদের ঘরের বাইরের চেয়ারে বসিয়ে ওদেরও ছবি তুলে নিলাম।
এছাড়া আছে রেলওয়ের পথ বদলানোর সরঞ্জাম। আছে স্টেশনের ঘড়ির আদলের বড় ঘড়ি। অবশ্য সেখানে সঠিক সময়ই দেখানো হচ্ছে। পাশেই কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আগেকার আমলের ট্রেনের সিগন্যাল বাতি। এগুলো দেখিয়ে ছেলেমেয়েকে আমাদের ছোটবেলার গল্প বলছিলাম। এর পাশাপাশি রাখা হয়েছে আগেকার আমলের স্টেশনের ট্রেনের সময়সূচি। যেখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে কোন ট্রেন কখন আসবে আর কোন কোন স্টেশনে থামবে।
আমরা সেখানে গিয়ে কাঠের বর্গাকৃতির শলাকাগুলো ট্রেনের স্টেশনের নামগুলো বদলে দিলাম। রয়েছে আগেকার আমলের টিকিট কাউন্টারসহ আরও অনেক কিছুই। সেখান থেকে বেরিয়ে পূর্বদিকে রয়েছে আগেকার দিনে ব্যবহৃত সব প্রকার ট্রেনের বগির প্রদর্শনী। সেখানে যাত্রী পরিবহন থেকে শুরু করে আছে নির্মাণের মালামাল পরিবহনের বগি। আরও আছে গবাদিপশু যেমন গরু ও ঘোড়া পরিবহনের বগি। সেগুলোকে আরও বাস্তব রূপ দিতে তার মধ্যে রাখা হয়েছে গরু ও ঘোড়ার মূর্তি।
এইসব বগির ভিড়ে আমরা হারিয়ে গেলাম কিছু সময়ের জন্য। এমনকি বগিগুলোর মধ্যে উঠে ট্রেনের ড্রাইভারের কক্ষ থেকে শুরু করে যাত্রীদের বসার স্থান সবই আমরা দেখলাম। তারপরই ঘোষণা এলো আমাদের ট্রেনের ভ্রমণের সময়সূচির। আমরা দ্রুত জাদুঘরের অন্য প্রান্তের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। সেখানে গিয়ে দেখি থ্রিলমেয়ার স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো আমলের ধোঁয়াওঠা বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত একটা ট্রেন।
আমরা টিকিটের নম্বর মিলিয়ে বগির সামনে লাইনে দাঁড়ালাম। তারপর টিকিট চেকার আমাদের টিকিট চেক করে জানিয়ে দিলেন বগির কোনদিকে আমাদের সিটগুলো অবস্থিত। আমরা নির্দিষ্ট কক্ষে গিয়ে দেখি সেখানে আরও একটা পরিবার রয়েছে। খুব দ্রুতই ওদের সাথে ভাব হয়ে গেলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে সব যাত্রী উঠে পড়লে টিকিট চেকার এসে কিছু নির্দেশনা দিলেন। উনি আমাদের কক্ষের জানালা খোলা দেখে বললেন, জানালা গরমের দিনে খোলা রাখলে ভালো হতো। আজকে তো অনেক ঠান্ডা। তবুও তোমরা খোলা রাখতে পারো। তবে একটা বিষয় খেয়াল রেখো, যখন ট্রেন চলতে শুরু করবে তখন কয়লার ছাই উড়ে এসে জানালা দিয়ে ঢুকবে। তাই চোখটা একটু যত্নে রেখো।
ট্রেন চলতে শুরু করলো। আমরা সিট থেকে উঠে বগিগুলো ভ্রমণে বের হলাম। প্রত্যেকটা বগি দুইভাগে বিভক্ত। আর ঠিক মাঝখানটায় টিকিট চেকারের বসার জন্য একটা সিট আছে। সেখানে আমাদের বগির টিকিট চেকার কেভিন বসে আছে দেখে আমরা আলাপ জুড়ে দিলাম। কেভিন খুবই হাসিখুশি একজন মানুষ। বাচ্চারা উনার কাছ থেকে অনেক গল্প শুনলো। বাচ্চাদের বললো, সিগন্যালের এই বাতির পাখাটা উঁচু থাকার অর্থ হলো ট্রেন আসবে না। আর পাখাটা নিচু থাকার অর্থ- ট্রেন আসবে। আমাদের ট্রেনটা কুড়ি মিনিট ভ্রমণ করে যাবে বাক্সটন। তারপর ইঞ্জিনের স্থান বদলে আবার ফিরে আসবে থ্রিলমেয়ার।
আমরা ট্রেনের করিডোরের জানালা খুলে মাথা বের করে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলাম। এছাড়া অন্যান্য বগিগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে কুড়ি মিনিট সময় শেষ হয়ে গেলো। বাক্সটনে ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে নেমে সবাই ইঞ্জিনের ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমরা বাইরে গিয়ে ইঞ্জিনের স্থান বদলের প্রক্রিয়াটা হাতে কলমে দেখলাম। ইঞ্জিনটা সামনে থেকে পেছনে আসার পর কীভাবে বগির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় সেটা ছেলেমেয়েদের ব্যাখ্যা করলাম। ওরা খুবই কৌতূহল নিয়ে ঘটনাগুলো শুনলো।
তারপর আবার আমরা ট্রেনে চড়ে বসলাম। আবার ট্রেনের বগির মধ্যে ঘোরাঘুরি করে, কখনওবা জানালা দিয়ে মাথা বের করে উঁকি দিয়ে সময় কাটালাম। ট্রেনের জানালার কাচ যে খোলা যায় সেটা বাচ্চাদের জন্য একটা নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। আর একটু পরপর ভুস করে ইঞ্জিনের দম নেওয়ার ব্যাপারটাতে বাচ্চারা অনেক আনন্দ পাচ্ছিল। ট্রেন এসে আবার থ্রিলেমেয়ারে পৌঁছালে আমরা ট্রেন থেকে নামলাম। আমাদের বগির টিকিট চেকার কেভিন, স্টেশন মাস্টার এবং ট্রেনের চালকদলকে ধন্যবাদ দিয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এলাম।