১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আঙুলে ভোটের কালি: ইতিহাস ও ব্যবহার

কালির এই দাওয়াই কিন্তু অতি সাধারণ বিজ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Feb 2026, 12:06 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:57 PM

নির্বাচনের উৎসব মানেই এক পরিচিত দৃশ্য। ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়েই হাস্যোজ্জ্বল মুখে তর্জনী উঁচু করে ধরা। সেখানে লেপ্টে আছে এক চিলতে বেগুনি বা সেপিয়া রঙের দাগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই আঙুলের ছবি পোস্ট করা এখন এক নাগরিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। 

তবে এই ছোট্ট দাগটি কেবল এক ফোঁটা কালি নয়; এটি একজন নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার, স্বচ্ছতা আর গণতন্ত্রের এক অমোচনীয় ঘোষণা। একেই আমরা চিনি ‘ইনডেলিবল ইঙ্ক’ বা অমোচনীয় কালি হিসেবে।

ভোটের এই কালির আধুনিক যাত্রা শুরু হয় বিশ শতকের ষাটের দশকে। ১৯৬২ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে প্রথমবার এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। মূল উদ্দেশ্য ছিল জালিয়াতি ঠেকানো—যাতে এক ব্যক্তি বারবার ভোট দিতে না পারেন। সেই থেকে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে ভোট মানেই আঙুলের ডগায় এই কালির স্পর্শ।

ভারতে এই বিশেষ কালি তৈরির একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে ‘মহীশূর পেইন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড’-এর। ১৯৩৭ সালে মহীশূরের মহারাজা চতুর্থ কৃষ্ণরাজা ওয়াদিয়ার এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। পরে ভারতের ‘ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি’র বিজ্ঞানীরা এই কালির রাসায়নিক ফর্মুলাকে আরও উন্নত করেন। 

আজও কর্ণাটকের সেই কারখানাতেই তৈরি হয় কোটি কোটি ভোটারের আস্থার এই কালি। গত এক সাধারণ নির্বাচনেই প্রায় ৯৭ কোটি ভোটারের জন্য ২৭ লাখের বেশি ‘ভায়াল’ বা কালির শিশি সরবরাহ করা হয়েছে সেখান থেকে। প্রতি শিশির দাম রাখা হয়েছিল ১৭৪ রুপি। রং তৈরি তাদের মূল কাজ হলেও, এই নির্বাচনী কালিই প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বজুড়ে এক অনন্য পরিচিতি এনে দিয়েছে।

এই কালির জাদুকরী ক্ষমতার পেছনে রয়েছে ‘সিলভার নাইট্রেট’। ত্বকে লাগানোর পর সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসামাত্রই এটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে গাঢ় বেগুনি রঙে স্থায়ী হয়ে বসে যায়। এই দাগ নখ ও চামড়ায় অন্তত দুই সপ্তাহ পর্যন্ত টিকে থাকে। 

অনেকে লেবুর রস, ‘মাইসেলার ওয়াটার’ বা কাঁচা পেঁপের আঠা দিয়ে এই দাগ তোলার কসরত করেন, কিন্তু ফলাফল সাধারণত শূন্য। তাই বুথে ভোট দেওয়ার ঠিক আগে পোলিং অফিসাররা আঙুল ভালো করে মুছে পরিষ্কার করে নেন, যাতে কালির দাগটি চামড়ার গভীরে বসতে পারে।

ভারত থেকে শুরু হওয়া এই প্রযুক্তি এখন সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচনেও এই কালি ব্যবহার করা হয়। কোথাও স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়, আবার অনেক দেশ ভারত থেকে এটি আমদানি করে।

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও এই বেগুনি দাগ গণতন্ত্রের এক অবিচ্ছেদ্য চিহ্ন। তবে মেক্সিকোতে গল্পটা একটু ভিন্ন। সেখানকার গবেষক ফিলিবার্তো ভাসকুয়েজ দাভিলা নব্বইয়ের দশকে এক বিশেষ তরল উদ্ভাবন করেন। তিনি প্রচলিত সিলভার নাইট্রেটের বদলে এমন এক গোপন ফর্মুলা ব্যবহার করেন, যা দ্রুত ত্বকের মৃত কোষের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক মিনিটেরও কম সময়ে সেপিয়া রঙের স্থায়ী স্তর তৈরি করে। মেক্সিকো ছাড়াও হাইতি ও মধ্য আমেরিকার বেশ কিছু দেশে এই প্রযুক্তি জনপ্রিয়।

প্রযুক্তি যতই মহাকাশ ছুঁইক, কালির এই দাওয়াই কিন্তু অতি সাধারণ বিজ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে। মানুষের শরীরের ওপরের ত্বক বা চামড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়ে। এই কালি সেই ত্বকের প্রোটিনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে, তা ঘষে তোলা প্রায় অসম্ভব। জোর করে তুলতে গেলে চামড়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয় থাকে। তাই ডিজিটাল ভোটার লিস্ট বা ইভিএম-এর যুগেও এই সহজ ও সাশ্রয়ী পদ্ধতিটি এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

বাংলাদেশেও নির্বাচন মানেই ভোটারদের আঙুলে এই অমোচনীয় কালির ছোঁয়া। এটি কেবল কারিগরি কোনো ব্যবস্থা নয়, বরং ভোটের মাঠে এক ধরনের সামাজিক আস্থার প্রতীক। ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যখন একজন ভোটার তার দাগযুক্ত আঙুলটি দেখান, তখন সেখানে ব্যক্তিগত নাগরিক দায়িত্ব পালনের এক অন্যরকম গর্ব ফুটে ওঠে। ইন্টারনেটের জটিলতা বা বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা, কোনো কিছুই এই পদ্ধতির কার্যকারিতা কমাতে পারে না।

আজকের দুনিয়ায় গণতন্ত্র যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, যখন ভুয়া ভোট বা কারচুপির আশঙ্কা নিয়ে বিতর্ক চলে, তখন আঙুলের এই ছোট্ট দাগটিই প্রমাণ হিসেবে কাজে দেয়। এটিই নিশ্চিত করে যে, অন্তত এই মানুষটি তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। 

রসায়নের এক সাধারণ প্রয়োগ কীভাবে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ এই বেগুনি দাগ। এটি কেবল এক ফোঁটা কালি নয়, প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর আর গণতন্ত্রের এক দৃশ্যমান বিজয় তিলক।

সূত্র: রয়টার্স ও এনডিটিভি