হো চি মিনের দেশে, প্রথম কিস্তি

১৯৭১ সালে আমাদের যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে, তখন ভিয়েতনামেও যুদ্ধ চলছে। তাদের ইতিহাসের মধ্যেও বাংলাদেশ খানিকটা স্থান জুড়ে আছে।

মীর মোশাররফ হোসেনমীর মোশাররফ হোসেন
Published : 30 Nov 2022, 02:13 PM
Updated : 30 Nov 2022, 02:13 PM

সারা দুনিয়া যাকে হো চি মিন নামে চেনে, ভিয়েতনামে তিনি ‘আঙ্কেল হো’। কারণ, সব ভিয়েতনামিরা তাকে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য মনে করে, যিনি বটগাছের মতো তাদের ছায়া দেবেন।

বলতে বলতে দেখলাম গাইডের গলা ধরে এলো, গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে তার। সেটা দেখে আমাদেরও। বুঝতে পারলাম, হো চি মিন সত্যি কতখানি তাদের হৃদয়জুড়ে আছে। স্যরি, আঙ্কেল হো। ভিয়েতনামের কেউ তাকে পুরো নামে ডাকে না, তিনি তাদের আদরের, গর্বের ‘আঙ্কেল’।

বাংলাভাষীদের কাছে দেশটা অল্প-স্বল্প পরিচিত হলেও সেখানে যাওয়া লোকের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। ঘুরতে পছন্দ করা লোকজন আশপাশে থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া পর্যন্ত নিয়মিত গেলেও ভিয়েতনামে তেমন একটা যায় না। সম্ভবত সরাসরি বিমান যায় না বলেই।

আদিতে পরিকল্পনা ছিল আরেকটু দূরে যাবো। রাশিয়ায়। তা মহান ভ্লাদিমির পুতিন হতে দিলেন না এ যাত্রায়।

দূরত্ব কিন্তু বেশি নয়। মাঝখানে দুটি দেশ। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড। দুটি দেশই বিশাল। তারপরই ভিয়েতনাম। ১৯৭১ সালে আমাদের যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে, তখন ভিয়েতনামেও যুদ্ধ চলছে। তাদের ইতিহাসের মধ্যেও বাংলাদেশ খানিকটা স্থান জুড়ে আছে।

সেই ভিয়েতনাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যাকে ঘিরে স্লোগান ছিল- ‘তোমার নাম, আমার নাম, ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম। ভিয়েতনামের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ এর পহেলা জানুয়ারি, ভিয়েতনামের জন্য মতিউল-কাদেরের প্রাণ দেওয়া। সমাজতান্ত্রিক ব্লকে না থেকেও দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিপ্লবী সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।

যা হোক, মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ আর দক্ষিণ চীন সাগরঘেঁষা ভিয়েতনামের সমাজ, প্রকৃতি ও জীবনযাপন দেখা। এশিয়ায় পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য হালং বে-ও দেখতে হবে। আদিতে পরিকল্পনা ছিল আরেকটু দূরে যাবো। রাশিয়ায়। তা মহান ভ্লাদিমির পুতিন হতে দিলেন না এ যাত্রায়। অবশ্য তার একার দোষই বা দেই কী করে, অন্য পরাশক্তিগুলোও তো আর এক্ষেত্রে ধোয়া তুলসীপাতা নয়।

এ ক্লান্তিই পরে আমাদের আনন্দ দ্বিগুণ করে দিয়েছে। যা দেখেছি, অনুভব করেছি, তাকে আরও পোক্ত করেছে।

ভিয়েতনামে যাওয়ার ক্ষেত্রে দুটো মূল বাধা। সরাসরি বিমান নেই। আরেকটি হলো- ভিসা সহজলভ্য নয়। যাওয়ার আগে আবার ডলার পাওয়ার ঝক্কি, সব শেষে দিন গুণতে গুণতে চলে এলো নির্ধারিত দিন। আমাদের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স আছে, সেটা আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে বিমানবন্দর থেকেই ভিসার স্টিকার নিতে হবে।

ভিয়েতনামে নেমে পড়লাম খানিক বিপত্তিতে; ভিসা স্টিকার যেখানে দেয়, সেখানকার লোকজন ইংরেজি বোঝে না। কী মুসিবত! পরে অন্যদের দেখে, ইশারা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে, ফরম নিয়ে, সেটা পূরণ করে, আনুষঙ্গিক অন্যসব দিয়ে ভিসা পেতে ও ইমিগ্রেশন শেষ করতে পেরিয়ে গেল আড়াই ঘণ্টা।

বাইরে আমাদের নিতে আসা ড্রাইভার আর গাইডতো অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। দুইখান ৪ ঘণ্টার বিমান জার্নি, সঙ্গে সিঙ্গাপুরে ৪ ঘণ্টার যাত্রাবিরতি আর বিমানবন্দরে আরও আড়াই ঘণ্টা হুজ্জত করে আমাদের তখন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এ ক্লান্তিই পরে আমাদের আনন্দ দ্বিগুণ করে দিয়েছে। যা দেখেছি, অনুভব করেছি, তাকে আরও পোক্ত করেছে।

গাইড মজা করে বললেন, এদিন তুমি চাইলে যে কোনো নারীকে ফুল দিতে পারবে, কারও পছন্দ হলে তোমাকে চুমু খেয়েও বসতে পারে!

হ্যানয় আমাদের কাছে ধূসর লেগেছে। বাংলার সবুজ আর ওইখানকার সবুজে পার্থক্যের কারণে হতে পারে। আরেকটা কারণ হতে পারে- বৃষ্টি। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি হচ্ছিল। যে চারদিন ছিলাম, বৃষ্টি বাগড়া দিয়েছে বারবার, কখনো মুষলধারে, কখন ঝিরিঝিরি। ওরা বলছিল, এ বৃষ্টি শীত নিয়ে আসবে। আমাদের অপরিচিত কথা নয়, এমনটা আমরাও শুনি শীতের আগমনী জানান দেওয়া বৃষ্টির বেলায়।

সেই ধূসর হ্যানয়ে আমার চোখ চলে যাচ্ছিল ফুলে। রাস্তায় রাস্তায় ফুল বিক্রি হচ্ছে। মানুষের হাতে ফুল। অনেক রঙের ফুল। লাল, হলুদ, কমলা। শুনলাম, পরদিন (২০ অক্টোবর) ভিয়েতনামের নারী দিবস। এ দিবস এখানে খুবই ধুমধাম করে পালিত হয়। গাইড মজা করে বললেন, এদিন তুমি চাইলে যে কোনো নারীকে ফুল দিতে পারবে, কারও পছন্দ হলে তোমাকে চুমু খেয়েও বসতে পারে!

কথাটা বলা শেষ হয়নি, ড্রাইভার, গাইডের তুমুল হাসি। আমরাও হুল্লোড়ে মাতলাম। এভাবে রাস্তাঘাটে ভ্যানে করে ফুল বিক্রি ব্যাপারটা এতদিন কেবল হলিউডি আর জাপানি-কোরিয়ান চলচ্চিত্রে দেখেছি, এবার চাক্ষুষ।

ভিয়েতনামে যে কদিন ছিলাম, শহরের ভেতর আমি কোনো বড় রাস্তা দেখিনি, কোনো রাস্তাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক কিলোমিটার হবে না।

মেলাক্ষণের জার্নি। পেটে ছুঁচোও নাচছে। হোটেলে ব্যাগ রেখে, খানিকটা ফ্রেশ হয়ে নিচে খাবারের দোকানের খোঁজে ছুটলাম। জানি ওরা ভাত খায়, কিন্তু কেমন মসলা, সঙ্গে আর কী পাওয়া যাবে এগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা তো আছেই। ভিয়েতনামের সময়ে তখন বিকেল, লোকজন বাড়ি ফিরছে। বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে রাস্তায় স্কুটার দেখেছি। কিন্তু এখন অবাক হলাম। ভিয়েতনামে যে কদিন ছিলাম, শহরের ভেতর আমি কোনো বড় রাস্তা দেখিনি, কোনো রাস্তাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক কিলোমিটার হবে না; তার আগেই মোড় আছে, তিন রাস্তা, চৌরাস্তা বেশুমার।

আর আছে স্কুটার। সাইকেলও। একেকটা গাড়ির বিপরীতে কমসে কম দেড়শ-দুশো স্কুটির দেখা মিলবে এখানে। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, তরুণী সবাই স্কুটি চালাচ্ছে। গতি সীমিত। রাস্তাগুলোর প্রস্থও খুব বেশি নয়, এর মধ্য দিয়ে লোকজন হাঁটছে। হাত ইশারা করলে গাড়ি, স্কুটি গতি আরও কমিয়ে হয় থেমে যাচ্ছে, নয়তো কোনোমতে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।

ভালো কথা, আমি কোথাও কোনো গাড়িকে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করতে দেখিনি। একেতো যাচ্ছেও কম গতিতে, একই ছোট রাস্তায় গাড়ি, স্কুটি, সাইকেল, মানুষ দেখলে সাইডও দিচ্ছে, আবার লালবাতি দেখলেই ফুল স্টপ। বোঝাই যাচ্ছে, হ্যানয়ের মানুষগুলো এখনও অন্তত গতি জড়তায় নিজেদের সঁপে দেয়নি; তাদের ব্যস্ততা কম নয়, তবে তা অন্যের বিরক্তি উৎপাদন না করেও সম্পাদন করা সম্ভব।

হ্যানয়ে রেস্টুরেন্ট বা স্ট্রিটফুড যেখানেই আপনি খেতে বসেন না কেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনার নিজের খাবার আপনাকেই রান্না করে খেতে হবে। আমরা বসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের টেবিলে ছোট চুলা দিয়ে দিলো ছেলেটি।

একটু হাঁটাচলা শেষে হোটেলের উল্টোদিকেই একটি দোকান খোলা পেলাম। দোকানের বাইরের ফুটপাতে টেবিল, চেয়ার দেওয়া। কপাল ভালো, এ দোকানের ছেলেটা ইংরেজি খানিকটা পারে। সে আমাদের খাবার দিল। এবং দিয়েই বুঝলো, আমরা শহরটিতে প্রথমবার গিয়েছি। শুধু প্রথমবারই নয়, সম্ভবত ওই অঞ্চলের আর কোনো দেশ বা শহরে আমাদের পা পড়েনি।

ঘটনা হলো, হ্যানয়ে রেস্টুরেন্ট বা স্ট্রিটফুড যেখানেই আপনি খেতে বসেন না কেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনার নিজের খাবার আপনাকেই রান্না করে খেতে হবে। আমরা বসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের টেবিলে ছোট চুলা দিয়ে দিলো ছেলেটি। আমরা তো তাজ্জব, এ দিয়ে আমরা কী করবো! আর রান্না তো পারিও না। পরে ছেলেটিই আমাদের রান্না শেখালো।

মসলা কম ব্যবহার করে ওরা, বেশি দেয় নানান পদের পাতা, লেটুস, পেঁয়াজ। তারপর নিজের পছন্দমতো লবণ, ঝাল, সস দিয়ে নিজের মতো করে খাও। এখানে বলে রাখি, ভিয়েতনামে নামামাত্র আপনি লাখপতি হয়ে যাবেন। কেননা, সেখানে প্রতি ডলারে ২৫ হাজার ‘ডং’ মেলে। ‘ডং’ ওদের মুদ্রা। এই যে হাজার হাজার ডং, সেগুলো খরচও হবে ধুপধাপ। প্রতিবেলায় খেতে বসে একেকজন আমরা দেড় থেকে দুই লাখ ডং খরচ করেছি। হাত খুলে খরচ যাকে বলে।

আমরা যে দেড়দিন ক্রুজে হালং বে দেখেছি, তার বেশিরভাগ সময়ই ছিল বৃষ্টি। অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন, চারপাশে পানি, আশপাশে ছোটবড় পাহাড়, আর আমরা ক্রুজে।

এ যাত্রায় আমাদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ ছিল হালং বে। হ্যানয় থেকে ঘণ্টাকয়েকের দূরত্ব। সমুদ্রের কিনারে, ছোট বড় অনেক পাহাড় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওসব পাহাড়ের কোনো কোনোটির সঙ্গে বালুকাময় সৈকত, কোনো কোনোটিতে মিলবে গুহায় ঢোকার অপার চিত্তাকর্ষক অভিজ্ঞতা।

আমরা যে দেড়দিন ক্রুজে হালং বে দেখেছি, তার বেশিরভাগ সময়ই ছিল বৃষ্টি। অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন, চারপাশে পানি, আশপাশে ছোটবড় পাহাড়, আর আমরা ক্রুজে। পুরো পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান ফিলিংস। এর মধ্যেই গাইড আমাদেরকে ছোট নৌকায় করে একটি গুহায় নিয়ে গেছে; গুহা পর্যন্ত যাওয়ার আগের পথটুকুই অদ্ভুত, তার মধ্যে দেখে ফেলেছি প্যারট মাউন্ট, অবিকল পাখির মতো। কোনো কোনো পাহাড়ে মেঘ ধাক্কা খাচ্ছে, মনে হচ্ছে আগুন ধরেছে, ধোঁয়া উড়ছে।

এদিকে তুমুল বৃষ্টি। পাহাড়ের গায়ে সমুদ্রের পানি জোরে ধাক্কা খাচ্ছে…অন্যরকম সবকিছু। বৃষ্টি কমলে গিয়েছিলাম টিটভ আইল্যান্ডে। সোভিয়েত নভোচারী টিটভ ভিয়েতনামে সফরে গেলে হো চি মিন ওই দ্বীপটি টিটভের নামে নামকরণ করেছিলেন। একপাশে সৈকত, সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের মাথায়ও যাওয়া যায়। ছোট জায়গা, কিন্তু এত সুন্দর ব্যবস্থাপনা, দেখলে মনে হবে, আমরা আমাদের সৈকতটাকে কেমন শ্রীহীন করে ফেলে রেখেছি।

চলবে...

কিডজ ম্যাগাজিনে বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক