১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আল-কারাউইন: পৃথিবীর প্রাচীনতম সচল পাঠাগার

এই পাঠাগারের জন্ম এক নারীর হাত ধরে।

আল-কারাউইন: পৃথিবীর প্রাচীনতম সচল পাঠাগার
প্রায় ৯০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই জ্ঞানভাণ্ডার, ছবি: কোয়ার্টজ ডটকম।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 31 Jul 2026, 01:09 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

মরক্কোর প্রাচীন শহর ফেজ। সেখানকার সরু অলিগলি, মশলার কড়া ঘ্রাণ আর ট্যানারির চামড়া শুকানোর গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। রোদ যখন সেই শহরের কারুকাজ করা দেয়াল আর নীল টাইলসের ওপর এসে পড়ে, তখন মনে হয় সময় যেন এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। 

এই শহরেরই এক প্রান্তে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে আল-কারাউইন পাঠাগার। সাধারণ কোনো পাঠাগার নয় এটি, বিশ্বের প্রাচীনতম সচল পাঠাগার। প্রায় ৯০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই জ্ঞানভাণ্ডার। বছর দশেক আগে দীর্ঘ সংস্কারের পর এটি যখন পুনরায় পাঠকদের জন্য খুলে দেওয়া হলো, তখন যেন পুরনো ক্ষত সেরে ওঠার আনন্দ বয়ে গেল শহরজুড়ে।

কারাউইন পাঠাগারের দরজায় যখন চার জোড়া তালা ঝোলানো থাকত, তখন তার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অসামান্য ইতিহাস। এই পাঠাগারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলো যে ঘরে রাখা হতো, তার দরজায় থাকত চারটি আলাদা তালা। আর সেই তালাগুলোর চারটি চাবি থাকত চারজন আলাদা ব্যক্তির কাছে। অর্থাৎ, সেই ঘরটি খুলতে হলে ওই চারজনকেই একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে হতো। কী অদ্ভুত আর নিপুণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা!

এখানে আছে প্রায় ৪ হাজার বিরল পাণ্ডুলিপি। তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবানটি হলো নবম শতাব্দীর একটি কোরআন শরীফ, ছবি: কোয়ার্টজ ডটকম।

এখানে আছে প্রায় ৪ হাজার বিরল পাণ্ডুলিপি। তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবানটি হলো নবম শতাব্দীর একটি কোরআন শরীফ,

আজ হয়তো সেই তালার জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল কোড, কিন্তু বইগুলোর প্রতি সেই আদিম মমত্ববোধ আজও অমলিন। পাঠাগারের একজন রক্ষক তো বলেই ফেললেন, “আপনারা আমাদের আঘাত করতে পারেন, কিন্তু বইগুলোর কোনো ক্ষতি করবেন না।” বইয়ের প্রতি এমন একনিষ্ঠ ভালোবাসা আর মমত্ববোধই হয়তো এই পাঠাগারটিকে হাজার বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে।

এই পাঠাগারের জন্মের ইতিহাস এক মহীয়সী নারীর হাত ধরে। নবম শতাব্দীতে তিউনিসিয়ার কাইরাউয়ান থেকে আসা এক ধনী ব্যবসায়ীর মেয়ে ফাতিমা আল-ফিহরি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি কেবল পাঠাগার নয়, বরং মসজিদ এবং শিক্ষা কমপ্লেক্সও তৈরি করেছিলেন। সেই সময় থেকেই এটি হয়ে ওঠে জ্ঞানপিপাসুদের তীর্থস্থান। 

এই আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পড়াশোনা করেছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন, ইহুদি দার্শনিক মোজেস মাইমোনাইডস এবং আন্দালুসীয় কূটনীতিক লিও আফ্রিকানাসের মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিরা। অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় যখন চিন্তার স্তরেও আসেনি, তখন মরক্কোর এই ধুলোমাখা গলির ভেতর থেকে বিকিরিত হতো জ্ঞানের আলো।

এই পাঠাগারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলো যে ঘরে রাখা হতো, তার দরজায় থাকত চারটি আলাদা তালা, ছবি: কোয়ার্টজ ডটকম।

এই পাঠাগারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলো যে ঘরে রাখা হতো, তার দরজায় থাকত চারটি আলাদা তালা,

দীর্ঘকাল অযত্ন আর অবহেলায় এই প্রাচীন ইমারতটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। ছাদ ফেটে বৃষ্টির পানি পড়ত, দেয়ালে লোনা ধরেছিল, আর আর্দ্রতায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল অমূল্য সব পাণ্ডুলিপি। ২০১২ সালে মরক্কোর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যখন এর সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তখন দায়িত্বটি পান আজিজা চাউনি নামের একজন স্থপতি। 

মজার ব্যাপার হলো, ফাতিমা আল-ফিহরি যেমন এক নারী হিসেবে এই পাঠাগারটি গড়েছিলেন, কয়েকশ বছর পর আজিজা চাউনি নামের আরেকজন নারীই একে নতুনের সাজে সাজানোর দায়িত্ব পেলেন। আজিজা ফেজ শহরেরই সন্তান। ছোটবেলায় যখন তিনি দাদুর সঙ্গে এই পাঠাগারের পাশ দিয়ে যেতেন, তখন সেই বিশাল বন্ধ দরজাগুলোর পেছনে কী আছে, তা জানার কৌতূহল তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। 

সংস্কারের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার প্রধান লক্ষ্য ছিল কেবল পাথর বা টাইলস মেরামত করা নয়, বরং একে ‘জীবন্ত’ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া। সংস্কার কাজ মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ চার বছর ধরে প্রকৌশলী আর কারিগররা ঘাম ঝরিয়েছেন। মাটির নিচে তৈরি করা হয়েছে ড্রেনেজ সিস্টেম বা নালা ব্যবস্থা, যাতে আর্দ্রতা বইগুলোর ধারেকাছেও না পৌঁছাতে পারে।

আছে মসজিদ এবং শিক্ষা কমপ্লেক্সও, ছবি: কোয়ার্টজ ডটকম।

আছে মসজিদ এবং শিক্ষা কমপ্লেক্সও,

পুরোনো কাঠের কাজগুলোকে যত্ন সহকারে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যুক্ত করা হয়েছে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের আধুনিক ল্যাবরেটরি। সেখানে ডিজিটাল স্ক্যানার দিয়ে প্রাচীন কাগজের অণুবীক্ষণিক ছিদ্রগুলো শনাক্ত করা হয় এবং বিশেষ তরল দিয়ে বইয়ের পাতাগুলোকে সজীব করা হয়, যাতে সেগুলো ভেঙে না যায়।

এই পাঠাগারের সংগ্রহশালা দেখলে যেকোনো জ্ঞানপিপাসুর চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। এখানে আছে প্রায় ৪ হাজার বিরল পাণ্ডুলিপি। তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবানটি হলো নবম শতাব্দীর একটি কোরআন শরীফ। উটের চামড়ার ওপর কুফিক হরফে লেখা সেই প্রত্নতত্ত্বটি যেন ইসলামের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। এছাড়া আছে ইবনে খালদুনের মূল লেখা ‘আল মুকাদ্দিমা’র কপি। যখন কেউ এই পাঠকক্ষে বসবে, তখন চারপাশের বইয়ের সেই পুরনো সোঁদা গন্ধ তাকে কয়েকশ বছর আগের কোনো এক তলোয়ার আর কলমের যুগে নিয়ে যাবে।

বর্তমানে যখন পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রাচীন ঐতিহ্যগুলো যুদ্ধের কবলে পড়ে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে, যখন পালমিরা বা মসুলের লাইব্রেরিগুলো পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে উগ্রবাদীরা, তখন মরক্কোর এই শান্ত শহরটি এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। মরক্কোর রাজতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এই প্রাচীন সম্পদগুলোকে রক্ষা করার সুযোগ দিয়েছে। পাঠাগারের সংস্কারের কাজ তদারকি করেছিলেন স্বয়ং রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। তার লক্ষ্য ছিল ফেজ শহরকে আবারও তার হারানো গৌরব বা আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

এখন সুফি সংগীতের উৎসব থেকে শুরু করে এই পাঠাগার সংস্কার, সব মিলিয়ে শহরটি আবারও জেগে উঠছে, ছবি: কোয়ার্টজ ডটকম।

এখন সুফি সংগীতের উৎসব থেকে শুরু করে এই পাঠাগার সংস্কার, সব মিলিয়ে শহরটি আবারও জেগে উঠছে,

ফেজের পুরনো মদিনা এলাকাটি এমনিতেই ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এখানকার সরু গলিগুলোতে আজও মালবাহী গাধার দেখা মেলে, কামাররা আজও হাতুড়ি পেটায় লোহা তপ্ত করে, আর চামড়াশিল্পীরা বংশপরম্পরায় কাজ করে চলেছেন। এই পরিবেশের সঙ্গে কারাউইন পাঠাগারের অস্তিত্ব এক সুতোয় গাঁথা। আজিজা চাউনি মনে করেন, এই পাঠাগারটি কেবল পর্যটকদের জন্য নয়, বরং স্থানীয় মানুষের ব্যবহারের জন্য হওয়া উচিত। তার স্বপ্ন হলো, ফেজের মানুষগুলো যেন এই পাঠাগারকে তাদের ‘সেকেন্ড হোম’ বা দ্বিতীয় ঘর হিসেবে ভাবে।

পাঠাগারের পাঠকক্ষের সেই পালিশ করা কাঠের টেবিল, নকশা করা কলাম আর উঁচু সিলিং যেন স্বর্গীয় প্রশান্তি দেয়। সংস্কারের সময় পুরনো নকশার সঙ্গে আধুনিকতার সূক্ষ্ম মিশেল দেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে কেবল গবেষক ও ছাত্ররা ঢুকতে পারত, এখন সেখানে সাধারণ পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য একটি বিশেষ প্রদর্শনী কক্ষ রাখা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তার আড়ালে আধুনিক চার ডিজিটের কোড থাকলেও, মানুষের সেই হাজার বছরের পুরনো শ্রদ্ধা আর ভক্তি আজও অটুট।

ফেজ শহরটি একসময় মরক্কোর রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল, কিন্তু ফরাসি শাসনের সময় রাজধানী রাবাতে সরিয়ে নেওয়া হলে শহরটি কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। তবে ফেজের প্রাণভোমরা ছিল এর জ্ঞানচর্চা। এখন সুফি সংগীতের উৎসব থেকে শুরু করে এই পাঠাগার সংস্কার, সব মিলিয়ে শহরটি আবারও জেগে উঠছে। ফেজের সেই বিখ্যাত ‘জুয়েলস রিভার’ বা মণি-মুক্তার নদীটি, যা একসময় আবর্জনায় ঢেকে গিয়েছিল, তাও এখন পরিষ্কার করে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আসলে একটি জাতির পরিচয় তার দালানকোঠায় নয়, বরং তার চিন্তায় আর ইতিহাসে থাকে। কারাউইন পাঠাগার সেই ইতিহাসেরই অতন্দ্র প্রহরী। আজিজা চাউনি যখন ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে শহরের দিগন্তজোড়া দৃশ্য দেখেন, তখন তিনি কেবল পাথর দেখেন না, দেখেন আগামীর স্বপ্ন। তিনি চান তার সন্তানরা যেন এই ঐতিহ্যকে কেবল বইয়ে না পড়ে নিজের চোখে দেখতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, নিউ ইয়র্ক টাইমস।