০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

গ্রহের বুকে বন্ধুতা

মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রের গল্প।

বিডিনিউজ২৪

শ্রেয়ান চৌধুরী, অষ্টম শ্রেণি, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল

Published : 02 Aug 2026, 01:02 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:24 PM

মাহিন, এই মাহিন, আর কত পড়বি? স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে তো! মা যেন মাহিনকে তাড়া দিলেন। আর পাঁচ মিনিট মা। পড়া না শিখলে স্যার শাস্তি দেবেন, মাহিন মাকে বোঝানোর স্বরে বলল।

মাহিন প্রাইমারিতে পড়ে। পড়াশোনায় ভীষণ সিরিয়াস। ওর স্বপ্ন বড় হয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হবে। মাহিনের দিন-রাত ইচ্ছে করে এই রহস্যভরা মহাকাশ নিয়ে ভাবতে। মহাকাশের নানা রহস্য ভেদ করে অজানা তথ্য তুলে এনে চমকে দিতে চায় বিশ্বকে। মাহিনের বিশ্বাস, তার মতো বাংলাদেশের কোনো এক ছাত্র নতুন কোনো রহস্য উদঘাটন করে বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে।

তড়িঘড়ি করে ব্যাগ গুছিয়ে বাবার মোটরসাইকেলে চেপে যথাসময়ে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে গেল সে। প্রতিদিনের মতো বাবা আজও বললেন, মাহিন, টিচারদের কথা শুনবে, বন্ধুদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে, বুঝেছ? মাহিন স্বভাবসুলভ হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে দৌড়ে ক্লাসে চলে গেল।

বিদ্যালয়ের মূল প্রবেশদ্বারে কৃষ্ণচূড়া ও জারুল গাছ উপরের দিকে মিলেমিশে একাকার। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে বিশাল মাঠ পেরিয়ে জাতীয় পতাকার খুঁটিটি পার করে নিচতলায় ছোট্ট একটি শ্রেণিকক্ষ। সকালবেলার মৃদু-মন্দ বাতাস যেন করিডোর ছাপিয়ে শ্রেণিকক্ষে তার পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে।

মাহিন ক্লাসে ঢুকতে না ঢুকতেই ফাহমিদ তাকে টেনে পাশে বসাল। ফাহমিদ নম্র, ভদ্র ও হাসিখুশি একটি ছেলে, যার স্বপ্ন বড় হয়ে পাইলট হবে। মাহিন ভালোবেসে ফাহমিদকে ডাকে ‘ফাহাম’। কখনো স্কুল-ক্লাস-পড়া, কখনওবা খেলাধুলা-মুভি-মহাকাশ, কিছুই বাদ যায় না তাদের গল্পের আসর থেকে। 

বন্ধু মাহিনের মহাকাশ-নক্ষত্র নিয়ে গল্প শুনতে ফাহমিদের বেশ ভালো লাগে। আবার কখনো ফাহমিদ তার পাইলট হওয়ার গল্প বলে। কেমন করে আকাশে উড়বে, নিরাপদে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেবে, সে গল্পও বলে। প্রায় প্রতিদিনের মতো আজও দুই বন্ধু মিলে ঠিক করল, স্কুল শেষে তারা মাঠে খেলতে নামবে।

দেখতে দেখতে ক্লাস শেষ হলো, ছুটির ঘণ্টাও বাজল। কেউ কেউ খেলতে নেমে গেছে মাঠে। মাহিন, ফাহমিদ ও আরও কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে টিফিন শেষ করে অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করছে। এমন সময় গগনবিদারী শব্দে কানের পর্দা যেন ফেটে যাচ্ছিল! আকাশ-বাতাস যেন প্রকম্পিত হলো প্রচণ্ডভাবে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সব ছাত্ররা, শিক্ষকেরা হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। ফাহমিদ জানতে চাইল, মাহিন, এটা কিসের শব্দ?

জানি না, বলতে না বলতেই বিস্ফোরণের বিকট শব্দে চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। চারদিকে পোড়া গন্ধ আর কালো ধোঁয়া। মুহূর্তেই দগ্ধ হয়ে গেল ছোট ছোট কত প্রাণ! কয়েক মিনিটেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল তাজা দেহ, কোনো না কোনো পিতা-মাতার নয়নের মণি। শোকে মুহ্যমান হলো পুরো বিদ্যালয়, দেশ ও জাতি।

মাহিন ও ফাহমিদের মতো আরও অনেকেই দগ্ধ হয়েছে। কেউবা অর্ধদগ্ধ অবস্থায় বাঁচার জন্য দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। যে যেভাবে পারছে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসছে। মাহিনের আর কিছুই মনে পড়ে না।

জ্ঞান ফিরলে মাহিন নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করল। পাশে মা উদ্বেগভরা দৃষ্টিতে সন্তানের দিকে তাকিয়ে আছেন। মা, আমার বন্ধুরা কেমন আছে? ওটা কিসের শব্দ ছিল মা? ফাহমিদ কেমন আছে? ও কোথায়? মাহিনের এত প্রশ্নের উত্তরে মা শুধু বললেন, ঘুমা বাবা, বিশ্রাম নে। মাহিন আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

পরদিন সকালবেলা মাহিনের ঘুম ভাঙল। দগ্ধ শরীরের যন্ত্রণা ব্যান্ডেজের আড়ালেও যেন শতগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। চারদিকে তাকিয়ে দেখল, ওর মতো আরও অনেক ছাত্র-ছাত্রী বিধ্বস্ত বিমানের আগুনে দগ্ধ হয়ে বেডে শুয়ে আছে। কিন্তু ফাহমিদকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মা, ফাহমিদ কেমন আছে? ও আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল আর বলছিল, আমাকে রেখে যাসনে, মাহিন। মা, ফাহমিদ কোথায়?

মা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। চোখভরা পানি গড়িয়ে নেমে গেল, ফুঁপিয়ে উঠল মায়ের মন। মাহিন মাকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে পারল না। দড়ি দিয়ে টানানো ব্যান্ডেজে আবৃত পা দুটোর শিরায় শিরায় যন্ত্রণা অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু সব যন্ত্রণার বাইরে বড় যন্ত্রণা হলো- ফাহমিদের সেই নম্র, মিষ্টি, হাসিমাখা মুখটা এত লোকের ভিড়ে খুঁজে না পাওয়া।

ফাহমিদ পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখত, আর মাহিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ওরা আকাশ ছোঁয়ার গল্প করত। এক দানবীয় দুর্ঘটনা তাদের জীবনে এঁকে দিল এক বড় বিচ্ছিন্নতা। বুকের মাঝখান থেকে জমানো বেদনা কষ্টের নীল রঙ হয়ে মাহিনের দু’চোখ বেয়ে নেমে এল।

হাসপাতালে বেশ কিছুদিনের দুর্বিষহ সময়ের পাঠ চুকিয়ে মাহিন সবার মুখে হাসি ফুটিয়ে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেল; স্কুল এবং স্বাভাবিক জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু মনের গভীরে এক দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেল।

বছর ত্রিশেক পর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডি.সিতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পক্ষ হতে ঘোষণা এসেছে, পৃথিবী-সদৃশ নতুন একটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৭০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত গ্রহটি আবিষ্কার করেছেন নাসার মহাকাশবিজ্ঞানী মাহিন চৌধুরী। প্রাণের অন্যতম উপাদান পানি থাকার সম্ভাবনাযুক্ত এই গ্রহটির নাম দেওয়া হলো ‘ফাহাম-২০২৫ এম’।

শক্তিশালী টেলিস্কোপের মাধ্যমে ‘ফাহাম-২০২৫ এম’ গ্রহটির দিকে তাকিয়ে কল্পনার চোখে ফাহমিদকে বিমান চালিয়ে অবতরণ করতে দেখে মাহিন। আর ফাহমিদ মাহিনের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে।