গবেষকরা বলছেন, মিলেমিশে থাকার সামাজিক কৌশলটিই হতে পারে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের একটু ভালো থাকার, আনন্দ নিয়ে বাঁচার চাবিকাঠি।
Published : 19 Jan 2024, 07:38 AM
গ্রামের কেন্দ্রে যে মুদি দোকানটা, সেখানে রুটি থেকে শুরু করে দরকারি সবই পাওয়া যায়। এ দোকানের বিশেষত্ব হল, কেনাকাটা করে কাউকে টাকা দিতে হয় না। তাই মানিব্যাগ সঙ্গে রাখার কথাও মনে রাখতে হয় না।
দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের এ গ্রামের নাম ল্যান্ডাইস আলঝেইমার। বিশেষত্ব হল, এখানে সবাই ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন; অর্থাৎ, তাদের স্মৃতি লোপ পাচ্ছে।
ল্যান্ডাইস আলঝেইমার সাধারণ কোনো গ্রাম নয়। আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের সেবায় গড়ে তোলা হয়েছে এই গ্রাম। সাধারণ বৃদ্ধনিবাস বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ধারণা এখানে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
সেই গ্রামে ঘুরে বাসিন্দা আর সেবাদাতাদের সঙ্গে কথা বলে বিবিসির প্রতিবেদক সোফি হাচিনসন বোঝার চেষ্টা করেছেন, নতুন ধারণার এই সেবাকেন্দ্রে কতটা ভালো আছেন আলঝেইমারে আক্রান্তরা।
গ্রামের ওই মুদি দোকান থেকে প্রতিদিনের পত্রিকা সংগ্রহ করেন ফ্রান্সিস নামের একজন, একসময় তিনি ছিলেন একজন খামারি। মুদি দোকানের পাশে যে ছোট্ট রেস্তোরাঁ, সেখানে বসে কফি খেতে খেতে ফ্রান্সিসের সঙ্গে কথা হয় সোফি হাচিনসনের। বলা যায়, এ রেস্তোরাঁ হল এ গ্রামের সামাজিক মেলামেশার মূল কেন্দ্র।
ফ্রান্সিসের কাছে হাচিনসনের প্রশ্ন ছিল, ডাক্তার যখন জানালেন যে তিনি আলঝেইমারে আক্রান্ত, কেমন লেগেছিল তখন?
উত্তর দিতে গিয়ে ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকালেন, যেন নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন সেই সময়টায়। একটু থেমে বললেন, “মেনে নেওয়া খুব কঠিন ছিল।”
আলঝেইমার রোগটা ফ্রান্সিসের বাবারও ছিল। নিজেও সে রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি ভয়কে জায়গা দেননি মনে। ভেবেছেন, সবাইকে তো একদিন মরতে হবেই।
“আমি এখানে এসেছি বেঁচে থাকার জন্য। আমি জানি, এখন বেঁচে থাকাটা আগের মত হবে না। আপনি যদি হাল ছেড়ে দেন, তাহলে ওখানেই সব শেষ। সেজন্যই আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে, সামর্থ্যে যতটা কুলায়, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।”
মুদি দোকান আর রোস্তারাঁর মত একটি থিয়েটারও আছে এ গ্রামে। বাসিন্দাদের সেখানে যেতে, নাটকে বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়।
বিবিসির সাংবাদিক হাচিনসনের কথা হয় এ গ্রামের বাসিন্দা এক দম্পতির সঙ্গে। ফিলিপ ও ভিভিয়েন দুজনেই ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন, তারপরও যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন এ গ্রামে।
একটু দূরে দৃষ্টি মেলে ফিলিপ বলেন, “আমরা হাঁটতে বের হই; হাঁটি।”
এখানে ভালো আছেন? প্রশ্ন শুনে ফিলিপের মুখে খেলে যায় উজ্জ্বল হাসি। মাথা ঘুরিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, সত্যি ভালো আছি।”
কথা শেষ হলে গায়ে গরম কাপড় চাপিয়ে পার্কের দিকে চলে যান দুজন।
এ গ্রামের জীবন ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা নয়। দেখাসাক্ষাৎ, কেনাকাটা করা কিংবা ঘরের কাজের জন্য কোনো সময় নির্ধারণ করে দেওয়া নেই। বসিন্দাদের যতটা সম্ভব স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নিজেদের সুবিধামত জীবনের ছন্দ খুঁজে নিতে পারেন।
এই স্বাধীনতার মধ্যেই ল্যান্ডাইস আলঝেইমার গ্রামের বাসিন্দাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। যারা এই কাজটি করেন, তাদের একজন অধ্যাপক হেলেন অ্যামিয়েভা।
তিনি বলছেন, গ্রামের এই পরিবেশ ও জীবনধারা আলঝেইমার রোগের গতিপথে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেই প্রাথমিক ফলাফল থেকে তারা ধারণা পাচ্ছেন।
“আমরা দেখেছি, এ ধরনের রোগীকে যখন কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়, তার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। কিন্তু এই গ্রামে আমরা সেরকম প্রতিক্রিয়া দেখিনি। খুব মসৃণ এক ধরনের পরিবর্তন আমরা দেখতে পেয়েছি।
“ফলে এ ধরনের খোলামেলা ব্যবস্থাপনা যে রোগের গতিধারাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে, তা বিশ্বাস করার কিছু কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
আলঝেইমার রোগীদের যারা স্বজন, তাদের মধ্যে মধ্যেও সারাক্ষণ উদ্বেগ আর এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। ল্যান্ডাইস আলঝেইমার গ্রামে যারা থাকছেন, তাদের স্বজনরা সেই উদ্বেগ অনেকটা কমে আসার কথা বললেন।
এ গ্রামের বাসিন্দা মরিসেটের বয়স ৮৯ বছর। তার ঘরের দেয়াল সাজানো পারিবারিক ছবি আর পেইনটিংয়ে। আসবাবপত্রগুলোও পারিবারিক। ঘরের বড় জানালাটা দিয়ে বাইরের বাগান দেখা যায়।
সেই ঘরে বসেই মরিসেটের মেয়ে ডমিনিক বললেন, “এখন আমারও একটু স্বস্তিতে আছি। কারণ আমি জানি, আমার মা এখানে শান্তিতে আছেন, নিরাপদে আছেন।”
মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য হাসপাতালের মত কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নিয়ম মানতে হয় না ডমিনিকের। নিজেদের সুবিধামত সময়ে এসে মাকে দেখে যান ডমিনিক আর তার বোন। এ গ্রামে বাসিন্দাদের যেরকম যত্ন নেওয়া হয়, ততটা তারা আশাও করেননি।
ডমিনিক বলেন, “আমি যখন মাকে দেখে যাই, মনে একটা স্বস্তি নিয়ে যাই। যখন দেখতে আসি, মনে হয় আমি আমার মায়ের সঙ্গে বাসাতেই আছি।”
ল্যান্ডাইস আলঝেইমার গ্রামে কাঠের তৈরি একতলা বাড়িগুলোতে আটজন করে থাকন। প্রতিটি বাড়িতে একটি রান্নাঘর, বসার ও খাবার ঘর রয়েছে।
ফ্রান্স সরকার এ গ্রাম তৈরিতে খরচ করেছে ১৭ লাখ ইউরো। আর এখানে যারা থাকেন, তাদের পরিবারকে বার্ষিক একটি খরচ দিতে হয়, সেটা অন্য সাধারণ কেয়ার হোমের মতই।
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের কীভাবে সাহায্য করা যায়, সেই গবেষণা করতেই ২০২০ সালে এ গ্রাম গড়ে তোলা হয়। বিশ্বব্যাপী যারা স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া রোগের সমাধান খুঁজছেন, তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে এ গ্রাম।
৬৫ বছর বয়সী প্যাট্রিসিয়া একজন হেয়ারড্রেসার। তার ভাষায়, ল্যান্ডাইস আলঝেইমার তাকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।
“বাড়িতে আমি সবসময় বিরক্ত হয়ে থাকতাম। আমার রান্না করার জন্য একজন রাঁধুনী ছিলেন। তারপরও আমার খুব ক্লান্ত লাগত; কিছু ভালো লাগত না। আমি জানতাম আলঝেইমার রোগটা ভালো নয়, সে কারণে আতঙ্কও ছিল।”
প্যাট্রিসিয়া এমন কোথাও থাকতে চেয়েছিলেন, যেখানে তিনি নিজেও অন্যদের সাহায্য করতে পারেন। তার মতে, অন্য কেয়ারহোমগুলো অনেক কিছু বলে, কিন্তু তারা আসলে কিছুই করে না।
“কিন্তু এখানে, এটা একেবারেই বাস্তব জীবন। আমি বাস্তব বলতে সত্যিকারের বাস্তব জীবন বোঝাচ্ছি।”
ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ মানুষকে তার বাস্তব জীবন থেকে, অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কিন্তু এ গ্রামের বাসিন্দারা একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা উপভোগ করছেন।
গবেষকরা বলছেন, মিলেমিশে থাকার এই সামাজিক কৌশলটিই হতে পারে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের একটু ভালো থাকার, আনন্দ নিয়ে বাঁচার চাবিকাঠি।
এ গ্রামের ১২০ জন বাসিন্দার জন্য সমান সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। পাশাপাশি আছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।
আলঝেইমার রোগটির কোনো প্রতিকার নেই, এটা বাস্তবতা। তবে রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি গ্রামবাসীকে এখানে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়।
কর্মীদের বিশ্বাস, স্মৃতি হারাতে থাকার অমোঘ পরিণতি হয়ত কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব, আর সম্ভব এ গ্রামের বাসিন্দাদের জীবনকে আরেকটু আনন্দময় করে তোলা।