ডলার সংকটের জন্য চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে না পারাকে কারণ দেখাচ্ছেন রিএজেন্ট আমদানিকারকরা।
Published : 24 Feb 2023, 12:04 AM
কোনো দাতার কাছ থেকে রক্ত নেওয়ার আগে তা রোগমুক্ত কি না, তা নিশ্চিত হতে পাঁচটি পরীক্ষা করা হয়। সেগুলো হল- হেপাইটাইটিস বি, হেপাইটাইটিস সি, এইচআইভি, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস।
এই পরীক্ষাগুলোর জন্য যে রিএজেন্ট দরকার, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। তবে এখন সেই সরবরাহ পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার ব্লাড ব্যাগ ছাড়া কিছুই দেওয়া হয়নি আমাদের। কখনও শুনি ইমপোর্টার (আমদানিকারক) আনতে পারেনি বা যে দামে টেন্ডার ড্রপ করেছিলেন, সেই দামে এখন দিতে পারবেন না বলে দিচ্ছেন না।”
একই পরিস্থিতির কথা জানালেন দেশের শীর্ষ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের ইনচার্জ রকিবুল ইসলাম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্লাড গ্রুপিংয়ের রিএজেন্টের সংকট তৈরি হয়েছে। আজ এক প্রোডাক্ট দিতে পারলে আরেকটা প্রোডাক্ট দিতে পারে না। জোড়াতালি দিয়ে চলছে। ভালো মানের রিএজেন্টেরও সংকট তৈরি হয়েছে।”
বেসরকারি স্কয়ার হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইউসুফ সিদ্দিকের কাছেও শোন গেল একই কথা। এই হাসপাতালে প্রায় ৭০০ ধরনের পরীক্ষা হয়। পরীক্ষা এবং অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন কাজে প্রায় ৯০০ ধরনের রিএজেন্ট লাগে। কিছু রিএজেন্ট তারা সরাসরি আমদানি করেন, বেশিরভাগই সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কেনেন।
ইউসুফ বলেন, “সম্প্রতি এই সঙ্কট শুরু হয়েছে। বড় আমদানিকারকরা কিছু রিএজেন্ট দিতে পারলেও ছোট ছোট আমদানিকারকরা সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে অনেক পরীক্ষা বন্ধ; টেস্ট বন্ধ রাখতে হচ্ছে।”
সমস্যার দিকটি তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্যাথলজিক্যাল টেস্ট একটা সমন্বিত ব্যাপার। একটা পরীক্ষা করতে যদি তিনটা রিএজেন্ট লাগে, কোনো একটা না হলে পারলে ওই পরীক্ষাটা হবে না।
“আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিভিন্ন ডিভাইস চালানোর ইনস্ট্রুমেন্ট, রক্ষণাবেক্ষণের পার্টস দরকার। এসব জিনিসও আনা যাচ্ছে না। ফলে ওই যন্ত্রটি বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এসব কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।”
ঢাকার কুড়িল এলাকার ডক্টরস ভিউ নামে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, গত কয়েকদিনে এক্সরে ফিল্মের দাম ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকা হয়েছে। ১১০ টাকা দামের ডেঙ্গুর কিট ১৩০ টাকা, ৫৫০ টাকার ইটিটি টিউব ৯৫০ টাকা, ৭৫০ টাকার আলট্রাসনোগ্রাম পেপার ৯৯০ টাকা, ৬০ টাকার ইসিজি পেপারের দাম ৯০ টাকা হয়েছে।
তিনি বলেন, “এসব কিট ছাড়াও সব ধরনের রিএজেন্টের দাম হু হু করে বাড়ছে। আবার অনেক প্রোডাক্ট পাওয়া যাচ্ছে না।”
সঙ্কটের কারণে নিম্ন মানের রিএজেন্টও ঢুকে পড়ছে বলে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যাতে রোগ নির্ণয়ে ভুলের শঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব চিকিৎসায়ও পড়বে।
বার্ন ইনস্টিটিউটের ডা. আশরাফুল বলেন, “এই সুযোগে বাজার নিম্ন মানের রিএজেন্ট দিয়ে সয়লাব। গেল সপ্তাহে বিএমএ ভবন থেকে ব্লাড গ্রুপ করার ২০ পিস রিএজেন্ট কিনেছিলাম, সবই খারাপ পড়েছে। বিষয়টা আমরা ল্যাবে দেখে ধরেছি, যাদের নজরদারি কম, সেখান থেকে ভুল ব্লাড গ্রুপই যাবে।”
কারণ কী?
আমদানিকারক এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রক্ত পরীক্ষাসহ নানা কাজে কয়েকশ ধরনের রিএজেন্ট প্রয়োজন। এর প্রায় সবই আমদানি করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তা আসে।
দেশের ১০০টির মতো প্রতিষ্ঠান এসব রিএজেন্ট আমদানি করে। তারা বর্তমান সংকটের জন্য এলসি খুলতে না পারাকে কারণ দেখিয়েছেন।
ডায়াগনস্টিক রিএজেন্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য সচিব আমিনুল ইসলাম খান আবু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এলসি করাতে না পারায় আমদানিকারকরা যতটুকু দরকার ততটুকু মাল আমদানি করতে পারছেন না। ফলে সঙ্কট তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেইন যুদ্ধের ধাক্কায় ডলার সংকট তৈরি হয় বাংলাদেশে, যার প্রভাব পড়ে সব ধরনের আমদানির উপরই, যখন আমদানি নিরুৎসাহিত করতে এলসি খোলার উপর কড়াকড়ি আসে।
তবে ওষুধ ও চিকিৎসার মতো জীবন রক্ষার উপকরণে এই কড়াকড়ি না থাকার কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বছরের ৪ জুলাইয়ের সার্কুলারে স্পষ্ট করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বীকৃত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও সরঞ্জামসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত দ্রব্য আমদানিতে এলসি মার্জিন সীমা বেঁধে দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।
সেই অনুযায়ী রিএজেন্ট আমদানিকারকদের প্রয়োজন অনুযায়ী এলসি খুলতে বাধা থাকার কথা না থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে দাবি আমদানিকারকদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আমদানিকারক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এলসিই তো করতে পারছি, ব্যাংকে গেলে ফিরিয়ে দিচ্ছে। যদি ২ লাখ ডলারের এলসি করতে যাই, তারা বলে এত ডলার নেই, ৫০ হাজার বা ৭০ হাজার করেন।
“২ লাখ ডলারে একটা এলসি করলে যে মাল আসত, এখন তা আসছে না। দেখা গেছে একটা এলসি করলাম ৫০ হাজারের, ১৫ দিন পর করলাম আরেকটা। ফলে শিপমেন্ট দেরি হচ্ছে।”
আবার ডলারের দাম বাড়ায় খরচ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “দুই মাস আগে যে পণ্যটি ৯৭ ডলার হিসাব করে কিনেছিলাম, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন তা কিনতে ১১৩ টাকা পড়ছে। অন্যান্য খরচও বেড়েছে ডলারের দামের অনুপাতে।”
ডায়াগনস্টিক রিএজেন্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য সচিব আমিনুল বলেন, “এলসি বন্ধ করা হয়নি, তবে যার দরকার ১ লাখ ডলার, তাকে দেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার ডলার। যার চারটি কোম্পানির এলসি করা দরকার, তাকে এক কোম্পানির এলসি দিচ্ছে, তিনটা আটকে দিচ্ছে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব তো পড়বেই।
“সঙ্কট ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, এটা সামনে আর ঘনীভূত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে রিজার্ভ ঠিক হয়ে যাবে, আদৌ হবে কিনা, কবে হবে তা বলতে পারছি না।”
উপায় কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের নেতৃবৃন্দ যা-ই বলুক, এখন বোঝা যাচ্ছে ডলার ক্রাইসিস আছে। কিন্তু এখনও বিদেশি বিস্কুট, চানাচুর, চকলেট, চিপস, তৈরি খাবার, ফলসহ নানা বিলাসদ্রব্য আমদানি করা হচ্ছে। এগুলোর আমদানি সীমিত করে জীবনরক্ষাকারী পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
“মেডিকেল রিএজেন্ট যদি আমরা না কিনতে পারি তাহলে হাসপাতালে রোগীর রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারের উচিৎ কিছু জায়গায় স্ট্রিক্ট হওয়া। কোন পণ্যটি আমাদের জন্য জরুরি, কোনটি জরুরি না।”
“এমনিতেই মানুষ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য, ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না, এখন আবার যদি এ ধরনের সংকট তৈরি হয়, তাহলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরেকটা সঙ্কট তৈরি হবে,” বলেন ড. হামিদ।
সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে প্রশ্ন করলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিলাসদ্রব্যের বিষয়ে কিছু বিধি-নিষেধ আছে, তবে জরুরি পণ্যের আমদানি থেমে নাই।
“রিএজেন্ট সঙ্কটের বিষয়টি আমাকে সেভাবে বলে নাই কেউ। হয়ত তারা তেমন ক্রাইসিসে পড়েনি। কিন্তু এ ধরনের বিষয় হলে দেখব।”