মিতা যুবরাজ উৎসবে অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা

প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব খালেদ খান যুবরাজ ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হককে স্মরণ করে প্রথমবারের মত আয়োজন করা হয় এ অনুষ্ঠান।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Sept 2022, 05:32 PM
Updated : 16 Sept 2022, 05:32 PM

গান, নাটক, নাচ আর স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে আয়োজিত মিতা-যুবরাজ উৎসবে অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান উঠে এসেছে এই শিল্পী যুগলের স্মৃতিচারণায়।

শুক্রবার বিকালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে প্রথমবারের এ উৎসব পরিণত হয় শিল্পী সংস্কৃতিপ্রমীদের মিলন মেলায়।

'বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান অসাম্প্রদায়িকতা ও মিতা-যুবরাজ' স্লোগানে প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব খালেদ খান যুবরাজ ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক স্মরণ করে উৎসবটির আয়োজন করে যুবরাজ সংঘ।

এদিন সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই বিকাল থেকে শুরু হওয়া উৎসবে একাডেমির নিশাত চত্বরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে পরিবেশিত হয় বাউল গান। পরিবেশনায় অংশ নেন আরিফ বাউল ও তার দল।

এরপর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে উৎসব উদ্বোধন করেন বরেণ্য অভিনয়শিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার।

এসময় মঞ্চে ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফু, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, অভিনয়শিল্পী সারা যাকের, নাট্যকার ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী।

এর আগে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন মিতা হকের গড়া সঙ্গীতদল সুরতীর্থের শিল্পীরা।

উদ্বোধনী বক্তব্যে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, "মিতা হকের গান ও খালেদ খানের অভিনয় ভীষণ মুগ্ধ করেছে আমাদের। আমার ব্যক্তিগতভাবে আফসোস হয় কেন গান শিখলাম না? এখনও ইচ্ছা হয় গান শিখব। ওপারে এই দুটি মানুষের ভালোবাসা অটুট থাকুক।"

মফিদুল হক বলেন, "খালেদ খান ও মিতা হক শিউলী ফুলের মত ঝরে গেলেও রেখে গেছেন সৌরভ। মিতা হক ও খালেদ খান সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অভয় বাণী ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এই উৎসবের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মাঝে এই শিল্পী-যুগলের প্রতিবাদী চেতনাটি ছড়িয়ে যাবে।"

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, "অভিনয়শৈলীর গুণে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে খালেদ খান। অন্যদিকে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হিসেবে মিতা হক সকল বাংলা ভাষাভাষীর কাছে সমাদৃত হয়েছেন। পরিবেশনার মাঝে তার সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও দেশের প্রতি যে নিবেদন তা নতুন প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয়।"

সারা যাকের বলেন, "অসাম্প্রদায়িক সমাজ মানে তো ধর্মহীন সমাজ নয়। বরং ধর্মকে রেখে অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করার সমাজ। মিতা ব্যক্তিজীবনে ভীষণ ধর্ম পরায়ণ ছিল। মিতা যে সমাজকে চিন্তা করত সেই সমাজে সব ধর্মকে শ্রদ্ধা জানাবে সবাই।"

অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী বলেন, "শিল্পীর দেহাবসান হয়, কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হয় না। খালেদ খান আমাদের মঞ্চের যুবরাজ, রক্তকরবীর যুবরাজ, অচলায়তনের যুবরাজ। তার অভিনয় মুগ্ধ করেছে আমাদের। মিতার গান মুগ্ধ করেছে আমাদের। তারা বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।"

এছাড়া স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য দেন বুলবুল ইসলাম ও লাইসা আহমেদ লিসা।

আলোচনা পর্বের পর নাচ পরিবেশন করেন র‍্যাচেল প্রিয়াংকা ও তার দল, সামিনা হোসেন প্রেমা, কস্তুরী মুখার্জি ও তার দল।

আবৃত্তি পরিবেশন করেন আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তাফা ও জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়।

এছাড়া মাসুম রেজার লেখা 'আবছায়ায় যুবরাজ' নাটক মঞ্চস্থ হয়। অভিনয় করেন ইস্তেখাব দিনার, রওনক হাসান, ত্রপা মজুমদার ও জ্যেতি সিনহা। নির্দেশনায় ছিলেন মোস্তাফিজ শাহীন।

সবশেষে অনুষ্ঠানে গান শোনান ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্য। গানের ফাঁকে মিতা হককে নিয়েও স্মৃতিচারণ করেন এই শিল্পী।

শ্রীকান্ত বলেন, "মিতাকে আমি ডাকতাম দোস্ত বলে। সেও আমাকে দোস্ত বলে ডাকত। কত কথা হয়েছে গান নিয়ে, সেই স্মৃতি ভীষণ মনে পড়ে।"

Also Read: মিতা-যুবরাজ উৎসবে যত আয়োজন

উৎসব প্রসঙ্গে খালেদ খান ও মিতা হকের মেয়ে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ফারহিন খান জয়িতা বলেন, "খালেদ খান-মিতা হক শিল্পচর্চার পাশাপাশি সমাজ নিয়ে ভেবেছেন, দেশ নিয়ে ভেবেছেন। তাদের সেই দর্শনকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সংস্কৃতি যতবার আক্রান্ত হয়েছে তারা তাদের জায়গা থেকে কখনও নীরবে, কখনও সরবে কাজ করে গেছেন। এজন্যই তাদের উদযাপন করতে এই উৎসব।"

নাট্যব্যক্তিত্ব খালেদ খান অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন যুবরাজ হিসেবে। ২০১৩ সালে এ অভিনেতার মৃত্যুর পর যুবরাজ উৎসব পালন করা হয়। তার জীবনসঙ্গী রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক মারা যান ২০২১ সালে। এই শিল্পী যুগলকে স্মরণ করতে এবার মিতা-যুবরাজ উৎসব ২০২২ পালন করা হয়।

উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল এইচএসবিসি এবং সহযোগিতায় ছিল আইএফআইসি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক