“জীবনে অপ্রাপ্তি আছে কিনা, সেটা ভেবে আর কি লাভ? যা পেলাম না, তা ভেবে তো এই বয়সে লাভ নেই। যা পেয়েছি তা নিয়েই খুশি।”
Published : 26 Jan 2024, 10:44 PM
প্রথম যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন, তখন কেবল কৈশোরের শুরু। পরিবার কখনও চায়নি, শর্মিলা ঠাকুর নিজেও কখনও সিনেমার নায়িকা হওয়ার কথা ভাবেননি।
জীবনের আশিটি বসন্ত পেরিয়ে আসা এই অভিনেত্রী আজ পেছনের দিকে তাকিয়ে ভাবেন, কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিত রায়ের সঙ্গে সে সময় যদি দেখা না হত, ঠাকুর বাড়ির মেয়ে শর্মিলার জীবন হয়ত এগিয়ে যেত অন্য কোনো পথ ধরে।
হালের তরুণরা তাকে চেনে বলিউডের নায়ক সাইফ আলী খানের মা আর অভিনেত্রী কারিনা কাপুরের শাশুড়ি হিসেবে। কিন্তু অপুর সংসারের অপর্ণাকে যারা দেখেছেন, ষাট আর সত্তরের দশকে যারা ছিলেন কলকাতার বাংলা কিংবা বলিউডের ছবির দর্শক, তাদের বুকে এখনও কাঁপন জাগায় শর্মিলার অভিনয়।
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন নন্দিত অভিনয়শিল্পী শর্মিলা ঠাকুর। উৎসবের এশিয়ান কম্পিটিশন সেকশনের জুরি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুক্রবার বিকেলে ঢাকা ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডায় তিনি খুলে বসেন স্মৃতির ঝাঁপি।
আড্ডার সঞ্চালক অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর শুরুতেই সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন, তারা যেন কেবল শর্মিলার সৃজনশীল কাজ নিয়েই প্রশ্ন করেন। কিন্তু কথায় কথায় চলে আসে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ, শর্মিলাও উত্তর দেন। সোয়া এক ঘণ্টার আড্ডায় তিনি শোনান তার সিনেমা আর ক্যারিয়ায় নিয়ে নানা গল্প।
শুরুটা বাংলা সিনেমা দিয়ে হলেও পরে হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পান শর্মিলা। তবে তিনি মনে করেন, সত্যজিৎ রায় যদি তাকে 'অপুর সংসার' সিনেমায় না নিতেন, তবে হয়ত তার সিনেমার ক্যারিয়ার হত না।
শর্মিলা ঠাকুর বলেন, "আমার প্রথম ছবি তো মানিক দার সঙ্গে, মানে সত্যজিৎ রায়। অপুর সংসার সিনেমাটা যখন আমি করি, তখন স্কুলে পড়ি, আমার বয়স ১৩ বছর। মানিক দা আমাকে সিনেমায় নিলেন, সেই সিনেমায় আমার চরিত্রটা পপুলার হল। এজন্য আমাকে সিনেমায় খুব একটা স্ট্রাগল করতে হয়নি।
"আমি বা আমার ফ্যামিলি চাইনি সিনেমায় কাজ করতে। যদি মানিক দা আমাকে সিনেমায় না নিতেন, আমি হয়ত শান্তি নিকেতনে যেতাম, সেখানে পড়তাম। আমার জীবন আরেক রকম হত। কিন্তু সেটা হয়নি। আমার ভাগ্যে যেটা ছিল- মানিক দার সঙ্গে কাজ করা, ফিল্মে আসা। সেটাই হয়েছে।"
আড্ডার শুরুতেই শর্মিলা বলেন, এখন ওটিটি বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থাকায় পুরনো অনেক সিনেমাও নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোভিড মহামারীর ঘরবন্দি থাকার সময়টায় অনেক পুরনো সিনেমা তিনি নতুন করে দেখেছেন।
সেন্সর বোর্ডের নিয়মের কড়াকড়িতে সব ধরনের সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয় না। ওটিটিতে নানা রকম গল্পের সিনেমা মুক্তি পাওয়াকে ইতিবাচক মনে করেন তিনি।
ঢাকার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হওয়ার কথা জানিয়ে শর্মিলা বলেন, “খুব ভালো লাগছে। এখানে যে হোটেলে উঠেছি, আমার মনে হচ্ছে আমি নিজের বাড়িতেই আছি। এখানে এসে যা আবদার করছি, তা পাচ্ছি। মাছের ঝোল খেতে চেয়েছি। তারা সেটা হাজির করছে। এয়ারপোর্টে নামার পর থেকেই সবাই যেরকম খাতির-যত্ন করছে, আমার খুব ভালো লেগেছে। তবে ট্রাফিকের কারণে অনেক জায়গায় যেতে পারিনি।”
বেড়ে উঠার গল্প
শর্মিলা ঠাকুর বলেন, “আমি একটা যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি। কাকা-কাকীমাসহ অনেকে আমরা একসঙ্গে থাকতাম, তার একটা ইনফ্লুয়েন্স আমার ওপর আছে। এখন যেমন জামাকাপড় কেনা হয়, ছোটবেলায় বাড়িতে তৈরি কাপড়ই পড়েছি আমরা। আমার ঠাকুমা আমাকে খুব প্রভাবিত করেছেন।”
সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' সিনেমায় সাংবাদিকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শর্মিলা। এখন যদি সাংবাদিক হয়ে ইন্টারভিউ করতে বলা হয়, কাকে ইন্টারভিউ করবেন?
শর্মিলা জানালেন, পঙ্গজ ত্রিপাঠির সাক্ষাৎকার নেওয়ার ইচ্ছা আছে তার।
এর আগে সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতাও যে হয়েছে, সে কথাও শর্মিলা বলেন।
“তখন তো এত টিভি চ্যানেল ছিল না। আমাদের এখানে কেবল 'দূরদর্শন' ছিল। তখন একটা শো হত। আমি মানিক দার ইন্টারভিউ করতে কলকাতা এসেছিলাম।”
প্রায় ১৪ বছর পর নতুন সিনেমায় অভিনয় করছেন শর্মিলা ঠাকুর। 'পুরাতন' নামের সিনেমাটির শুটিংও শুরু হয়েছে। অনেক বছর পর পর্দায় আসার এ বিষয়টিকে শর্মিলা ‘কামব্যাক’ বলতে নারাজ।
তিনি বলেন, “আমি কামব্যাক কথাটা পছন্দ করি না। আমি তো কোথাও হারিয়ে যাইনি যে কামব্যাক করব।”
শেখ হাসিনায় মুগ্ধ শর্মিলা
গত বুধবার গণভবনে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন শর্মিলা। ভারতের খ্যাতিমান অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মমতা শঙ্কর, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখার্জি, চলচ্চিত্র পরিচালক সোহিনী ঘোষও ছিলেন তার সঙ্গে।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহারে মুগ্ধ হওয়ার কথা জানিয়ে শর্মিলা বলেন, “উনি খুব ব্যস্ততার মাঝেও সময় দিলেন। ছবিও তুললাম, পরদিন সেই ছবিটা পেয়েছি। খুব ভালো লেগেছে। প্রণব বাবুর (ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী) সঙ্গে অনেক আগে এখানে এসেছিলাম, উনার (শেখ হাসিনা) সেটা মনে ছিল- সেটা মনে করিয়ে দিলেন। তখন আবৃত্তি করতে এসেছিলাম।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘আপনজনের মত’ লেগেছে শর্মিলার। তিনি বলেন, “খুব সাধারণ শাড়ি পড়ে এসে আমাদের সঙ্গে বসে কথা বললেন। খুব অমায়িক ব্যবহার। মনে হয়নি যে বিরাট বড় কারো সঙ্গে বসে কথা বলছি। উনার সাধারণ ব্যবহার ভালো লেগেছে, আপনজনের মত লেগেছে। মনে হয়েছে উনি সিনেমার ব্যাপারে খুব আন্তরিক।”
ক্যান্সার থেকে ফেরা
কোভিড মহামারীর আগে আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন শর্মিলা ঠাকুর; সেই ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হয়ে ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে।
সম্প্রতি বলিউড নির্মাতা করণ জোহরের চ্যাট শো 'কফি উইথ করণ'-এ অতিথি হয়ে এসে সেই অজানা খবরটি জানিয়েছেন অভিনেত্রী নিজেই।
ছেলে সাইফ আলী খানকে সঙ্গে নিয়ে জনপ্রিয় ওই চ্যাট শোর অষ্টম সিজনে গিয়েছিলেন শর্মিলা। সেখানেই তিনি প্রথমবারের মত ক্যান্সারের কথা জানান।
শুক্রবার ঢাকা ক্লাবের আড্ডায় ক্যান্সাররের মত মরণব্যাধি জয় করার অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে শর্মিলা বলেন, “ক্যান্সার তো এখন আর মরণব্যাধি নয়। যে কোনো রোগই যদি শুরুতে ধরা পড়ে, সেটি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমারটা শুরুর দিকেই ধরা পড়েছে। যার জন্য আমাকে কেমোথেরাপি নিতে হয়নি। দ্রুতই সেরে উঠেছি।”
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে নানা ধরনের চরিত্র করেছেন শর্মিলা, প্রথা ভেঙে শাড়ি ছেড়ে পর্দায় এসেছেন বিকিনিতে। কোনো নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রে ডাক না পাওয়ার আক্ষেপ কি আছে?
শর্মিলা বলেন, “আমাকে কেউ কমিক চরিত্রে কাজ করতে বলেনি। আমাকে কান্নাকাটির চরিত্রেই বেশি করতে হয়েছে।”
ভবিষ্যতে আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছার কথাও জানালেন এক সময়ের ‘স্বপ্নের নায়িকা’ শর্মিলা। বললেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অপ্রাপ্তি নিয়ে খুব একটা ভাবেন না।
“জীবনে অপ্রাপ্তি আছে কিনা, সেটা ভেবে আর কি লাভ? যা পেলাম না, তা ভেবে তো এই বয়সে লাভ নেই। যা পেয়েছি তা নিয়েই খুশি।”