‘হাওয়া’ সিনেমা দেখতে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট

হাওয়ার নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন দাবি করছেন, বন্যপ্রাণী আইন লঙ্ঘন করেননি তিনি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 August 2022, 06:20 PM
Updated : 10 August 2022, 06:20 PM

দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলা ‘হাওয়া’ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে বন্যপ্রাণী আইন লঙ্ঘনের, আর তাই সিনেমাটি দেখতে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট।

সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী ‘শালিক পাখি’ ও ‘শাপলাপাতা’ মাছ খাঁচায় বন্দি, নিধন ও হত্যার দৃশ্য প্রদর্শন করে সিনেমাটি আইন লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ প্রাণী অধিকারকর্মীদের।

বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোটের আহ্বায়ক অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার বলছেন, এমন দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ চিত্রায়নের কারণে সাধারণ মানুষ সংরক্ষিত প্রাখিদের খাঁচায় পোষা, হত্যা করে খাওয়া ও মাছ শিকারে উৎসাহিত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার এ সিনেমার একটি শো’ দেখে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন বন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ইউনিটের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস।

তবে চলচ্চিত্রটির নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন বলছেন, চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়নে সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী অপরাধের বিষয়ে কোনো ধরনের অভিযোগ পাননি তারা। কোনো ধরনের আইন লঙ্ঘনও করা হয়‍নি।

সিনেমাটি দেখলে এ ধরনের অভিযোগ আসার কথা নয় বলে মনে করেন সাড়া ফেলা এই চলচ্চিত্র পরিচালক।

দেখেননি তারাও

বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোটের আহ্বাবায়ক কামরুজ্জামান মজুমদার এবং সেইভ আওয়ার সি’র মহাসচিব মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক ‘হাওয়া’ নিয়ে অভিযোগ করলেও সিনেমাটি দেখেননি বলে স্বীকার করেছেন।

কামরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিনেমাটি এখনও দেখিনি। আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি দেখেছি, জেনেছি। এর প্ররিপেক্ষিতে ৩৩টি পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছি।”

তার ভিত্তিতেই তিনি বলছেন, আইনের ৩৮ ধারা ১ ও ২ উপধারা লঙ্ঘিত হয়েছে এ সিনেমায়।

আনোয়ারুল হক বলেন, “আমি সিনেমাটি না দেখলেও পত্রিকায় এ নিয়ে বক্তব্য পেয়েছি। আমরা বন অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। দ্রুত এ চিত্র দেখানো বন্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।”

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সিনেমাটির এ দৃশ্য নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে ইতোমধ্যে লেখা হয়েছে, যা তাদের গোচরে এসেছে।

তিনি জানান, শালিক আইন অনুযায়ী তফসিল-২ ভুক্ত সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী। শাপলাপাতা মাছও তফসিল-১ ভুক্ত বন্যপ্রাণী। এ দুটি বন্যপ্রাণী বন্দি করা, হত্যা, ধরা অপরাধ। সিনেমাটিতে এ বিষয়ে আইন লঙ্ঘন হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

“আমরা বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের একটি টিম কাল সিনেমাটি দেখব। তারপর এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবো আগে সিনেমাটি দেখি, তারপর করণীয় বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেন তিনি।

আইনে কী রয়েছে আর কী করতে পারে

বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোটের আহ্বায়ক অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, “হাওয়া বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের এ সুদিনকে স্বাগত জানাই।

“কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিভিউ ও হল ফেরত দর্শকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি-শালিক পাখিকে খাঁচায় বন্দি প্রদর্শন ও এক পর্যায়ে হত্যা করে খাওয়ার দৃশ্য রয়েছে এবং বিহাইন্ড দ্য সিন শাপলাপাতা মাছও তুলে আনতে দেখা গেছে। এটা আইনের ৩৮ ধারার সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে অন্যরা বন্যপ্রাণী হত্যায় উৎসাহিত হবে, অপরাধ ভুলে যেতে পারে। শিশুসহ অনেকে বিপথগামী হতে পারে।”

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর ৩৮ ধারায় বলা বয়েছে-। (১) কোনো ব্যক্তি তফসিল ১ ও ২ এ উল্লিখিত কোন পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ১ (এক) বৎসর পর্যন্ত কারাদন্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ (এক) লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ২ (দুই) বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ (দুই) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস আগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, গত বছর একটি মোবাইল ফোন কোম্পানি খাঁচাবন্দি টিয়া পাখির দৃশ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি করায় এ নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তারা।

“পিবিআই তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দৃশ্যটি বাদ দিতে হয়েছে। এছাড়া আদালতের কাছে যাওয়ার পর বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।”

‘হাওয়া’ সিনেমায় আইন লঙ্ঘনের কিছু পেলে তাও আইনিভাবে দেখা হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের এ কর্মকর্তা বলেন, “যদি প্রদর্শিত হয়-শালিক মেরে খাওয়া হচ্ছে; খাঁচাবন্দি প্রাণী প্রদর্শন করা হয়েছে। এগুলো বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের পরিপন্থি। সিনেমা দেখার পর আইন লঙ্ঘন মনে করলে আমাদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।”

Also Read: শিকারির চোখ হাঙ্গর ও শাপলাপাতা মাছে

আইন লঙ্ঘিত হয়নি, দাবি পরিচালকের

হাওয়ার পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, সিনেমার শুরুতে এ নিয়ে বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পুরোটা কীভাবে চিত্রায়নটা হয়েছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। বন্যাপ্রাণী আইনের লঙ্ঘনের মতো কিছু নেই।

তিনি বলেন, “এটা একটা ফিকশনাল ওয়ার্ক। এখানে কোনো বন্যপ্রাণী হত্যা করা হয়নি। দৃশ্যায়নের প্রয়োজনে এখানে বিকল্প ব্যবহার করা হয়েছে।”

সুমন বলেন, সিনেমা শুরুর আগেই ‘ডিসক্লেইমারে’ বিষয়টি বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কীভাবে এ দৃশ্য শুটিং করা হয়েছে। এখানে কোনো বন্যপ্রাণী হত্যা করা হয়নি।

তিনি মনে করেন, যারা আলোচনা করছে, তারা সিনেমার শুরুটা হয়ত ‘মিস’ করেছেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক