Published : 20 Mar 2026, 10:11 PM
সাবেক কারাতে চ্যাম্পিয়ন, আশির দশকের কম বাজেটের হলিউডি অ্যাকশন সিনেমার তারকা অভিনেতা চাক নরিস ৮৬ বছর বয়সে মারা গেছেন।
‘কোড অব সাইলেন্স’, ‘মিসিং ইন অ্যাকশন’ আর ‘ডেল্টা ফোর্স’ সিনেমায় চাক নরিসকে দেখা যায় খারাপ লোকদের পিটিয়ে তিনি সোজা করে দিচ্ছেন। আর টেলিভিশন সিরিজ ‘ওয়াকার, টেক্সাস রেঞ্জার’-এ তিনি আইনের শাসনকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন।
শুক্রবার তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার চিরবিদায় নিয়েছেন এই অভিনেতা।
“ঘটনার বিস্তারিত আমরা ব্যক্তিগতই রাখতে চাই, তবে তিনি পরিবারের সদস্যদের মাঝে শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন,” বলা হয় বিবৃতিতে।
রয়টার্স লিখেছে, ছয় বারের অপরাজিত ওয়ার্ল্ড প্রফেশনাল মিডলওয়েট কারাতে চ্যাম্পিয়ন নরিসের কঠিন ব্যক্তিত্ব ঘিরে তৈরি হওয়া নানা কৌতুক তাকে শেষ বয়সেও ইন্টারনেট জগতে জনপ্রিয় করে তোলে। বৃহস্পতিবার হাওয়াইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি।
দুই ডজনের বেশি সিনেমায় নরিসকে দেখা গেছে ওয়ান ম্যান আর্মি, সৈনিক, আইনরক্ষক, যুদ্ধ-ফেরত যোদ্ধা এবং আদর্শ আমেরিকানের চরিত্রে, যারা অপরাধীদের ধরেন, যুদ্ধবন্দিদের মুক্ত করেন, জিম্মিদের উদ্ধার করেন এবং সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করেন।
১৯৭৩ সালে প্রথম চলচ্চিত্র ‘দ্য ওয়ে অব দ্য ড্রাগন’-এ রোমের কলোসিয়ামে মার্শাল আর্টস কিংবদন্তি ব্রুস লির সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন নরিস।
২০১২ সালের ব্লকবাস্টার ‘দ্য এক্সপেনডেবলস ২’ সিনেমায় অভিনেতা সিলভেস্টার স্ট্যালোন, আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার ও ব্রুস উইলিসের সঙ্গে খলনায়ক জ্যঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যামকে পরাস্ত করতে দেখা যায় তাকে।
টাইম ম্যাগাজিন তাকে চিত্রিত করেছিল ‘দ্য আলটিমেট টাফ গাই’ হিসেবে। ১৯৮৫ সালে পত্রিকাটি লিখেছিল, “বি-গ্রেড অ্যাকশন সিনেমার জগতে সাবেক কারাতে চ্যাম্পিয়ন নরিস নিঃসন্দেহে সুপারস্টার হয়ে উঠেছেন।”

অ্যাকশনভরা সিনেমাগুলোতে তাকে গুলি এড়িয়ে যেতে, মারাত্মক সব ফ্লাইং কিক মারতে এবং একসঙ্গে একাধিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে দেখা যেত।
‘মাচো ম্যান’ ভাবমূর্তি তাকে বক্স অফিস ও টেলিভিশনে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ওয়াকার, টেক্সাস রেঞ্জার’ সিরিজে সার্জেন্ট করডেল ওয়াকার চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি একজন ন্যায়নিষ্ঠ আইনরক্ষক এবং মার্শাল আর্ট বিশেষজ্ঞ সাবেক মেরিন।
২০০৫ সালে এক মার্কিন শিক্ষার্থী তার শারীরিক ক্ষমতা ও পৌরুষ নিয়ে তৈরি ‘চাক নরিস ফ্যাক্টস’ নামের কৌতুকগুলো ছড়িয়ে দিলে শ্মশ্রুমণ্ডিত এই অভিনেতা, লেখক ও প্রযোজক অনলাইনে কাল্ট হিরো হয়ে ওঠেন। সেগুলো ভাইরাল হয়ে বেশ কয়েকটি বইয়ের অনুপ্রেরণা জোগায়।
সেসব কৌতুকের একটিতে বলা হয়, চাক নরিস সকালে কফির বদলে এক মগ পেরেক খান! আরেকটি কৌতুক হল, চাক নরিস পুশ-আপ করেন না; তিনি আসলে পৃথিবীকে নিচে ঠেলে দেন।
অন্তর্মুখী শক্তিমান এক মানুষ
কার্লোস রে নরিস ১৯৪০ সালের ১০ মার্চ ওকলাহোমার রায়ান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর তাদের পরিবার ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যায়।
ব্যক্তিজীবনে খুবই চুপচাপ ও অন্তর্মুখী ছিলেন নরিস। বলা হয়, বাবার মদ্যপানের বদ অভ্যাস আর পরিবারের দারিদ্র্যই নরিসকে ওইরকম করে তুলেছিল।
২০০৪ সালের আত্মজীবনী ‘এগেইনস্ট অল অডস: মাই স্টোরি’তে তিনি লিখেছেন, “স্কুলে আমি লাজুক ছিলাম। শিক্ষক যদি ক্লাসের সামনে কিছু বলতে বলতেন, আমি শুধু মাথা নাড়তাম।”
নরিস সহজাত ক্রীড়াবিদও ছিলেন না। মার্শাল আর্টসে চ্যাম্পিয়ন হতে তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।

স্কুল শেষ করে ১৯৫৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় দায়িত্বরত অবস্থায় তিনি তাং সু ডোসহ বিভিন্ন মার্শাল আর্ট শেখেন।
বিমান বাহিনীর চাকরি ছাড়ার পর ক্যালিফোর্নিয়ায় মার্শাল আর্ট শেখানো শুরু করেন নরিস। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে থাকেন।
তার ছাত্রদের একজন ছিলেন অভিনেতা স্টিভ ম্যাককুইন, যিনি তাকে অভিনয়ে আসতে উৎসাহ দেন।
১৯৮৫ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নরিস বলেন, “সে (ম্যাককুইন) আমাকে পরামর্শ দিয়েছিল, উপস্থিতি দিয়ে যেন দর্শকদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করি। আর বেশি সংলাপের চরিত্র যেন আমি না নিই।”
“সে বলেছিল, ‘সিনেমা হল দেখার জিনিস। আপনি বেশি কথা বললে দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।’”
নরিসের অভিনীত সিনেমাগুলো কোটি কোটি ডলার আয় করে। মার্কিন সেনাদের মধ্যেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০০৬ ও ২০০৭ সালে ইরাকে গিয়ে তিনি মার্কিন সেনাদের উৎসাহ যোগান।
১৯৯০ সালে নিজস্ব মার্শাল আর্ট শাখা ‘চুন কুক ডো’ প্রতিষ্ঠা করেন নরিস। শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ও মার্শাল আর্ট শেখাতে ‘কিকস্টার্ট কিডস’ নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
দেশপ্রেমিক, রক্ষণশীল ও ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান নরিস ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং ডানপন্থি ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডনেটডেইলিতে লেখালেখি করেছেন।
আত্মজীবনী ছাড়াও আত্মউন্নয়নমূলক এবং ফিটনেস ও মার্শাল আর্ট বিষয়ক বই তিনি ‘দ্য সিক্রেট অব ইনার স্ট্রেংথ – মাই স্টোরি’ লিখে গেছেন তিনি। এছাড়া লিখেছেন দুটো উপন্যাস ‘দ্য জাস্টিস রাইডার্স’ ও ‘এ থ্রেট টু জাস্টিস’।
চাক নরিস দুইবার বিয়ে করেছেন; পাঁচ সন্তানকে রেখে গেছেন।
তার সিনেমা সহিংসতা উসকে দেয়—এমন সমালোচনার জবাবে নরিস বলেছিলেন, ভালোভাবে নির্মিত হলে অ্যাকশন সিনেমাও অন্য যে কোনো নাটক বা রোমান্টিক ছবির মতই গল্প বলতে পারে।
১৯৯৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসকে তিনি বলেন, “কীভাবে করা হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি সহিংসতার জন্য সহিংসতা সমর্থন করি না। আমার সিনেমায় মানুষ শেষ পর্যন্ত দেখে যে ‘ভালো মানুষই জয়ী হয়’।”