১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ওজি অসবোর্ন: চেয়েছিলেন গানে ‘অবসর’, চললেন অন্য ভূবনে

ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে বসবাস করা অসবোর্নের পরিবার বলেছে, “শোকের এই খবর জানানোর ভাষা তাদের নেই। তিনি ছিলেন ভালোবাসায় ঘেরা।”

ওজি অসবোর্ন: চেয়েছিলেন গানে ‘অবসর’, চললেন অন্য ভূবনে
ওজি অসবর্ন। ছবি: রয়টার্স

গ্লিটজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Jul 2025, 02:16 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:26 PM

মাত্র তিন সপ্তাহ আগে মঞ্চে সুরের আলো ছড়িয়েছিলেন তিনি, একা নয়, দলে টেনেছিলেন আরো কয়েক শিল্পীকে। সেই কনসার্ট থেকে গান থেকে অবসরেরও ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কনসার্টের সেই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে, বহু ভক্ত শ্রোতা বলেছিলেন ‘হারিয়ে যেও না প্রিয় প্রিন্স অব ডার্কনেস, বেঁচে থেক সুরে-গানে, পাগলামিতে’। 

কিন্তু ভক্তদের ভালোবাসা-আকুলতা এবং গান ফেলে অনন্তলোকে যাত্রা শুরু করলেন হেভি মেটাল কিংবদন্তি ওজি অসবোর্ন। সাড়া তোলা ব্যান্ড ‘ব্ল্যাক সাবাথ’ এর ফ্রন্টম্যানের বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স থেকে শুরু করে বহু সংবাদমাধ্যম ও সংস্থার পাতায় বিশ্ব সংগীতের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত এই শিল্পীর মৃত্যুর খবর এসেছে বুধবার।

বিবিসি লিখেছে, রকসংগীতের জগতে ‘গডফাদার অব হেভি মেটাল’ হিসেবে পরিচিতি অসবোর্নের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে তার পরিবার।

এক বিবৃতিতে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে বসবাস করা অসবোর্নের পরিবার বলেছে, শোকের এই খবর প্রকাশের ভাষা তাদের নেই।

“মঙ্গলবার সকালে ওজি অসবোর্ন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি ছিলেন ভালোবাসায় ঘেরা।”

মৃত্যুর কারণ না জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গায়কের চলে যাওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা তাকে ঘিরে ছিলেন। 

স্কাই নিউজ ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ২০২০ সাল থেকে পারকিনসন’স রোগে ভুগছিলেন। সম্প্রতি আরো কিছু রোগব্যধিতে কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। 

এক কনসার্টে পর্দায় দেখা যাচ্ছে অসবর্নকে। ছবি: রয়টার্স

এক কনসার্টে পর্দায় দেখা যাচ্ছে অসবর্নকে

এখন আমি তোমাকে কোথায় পাব?

অসবোর্নের মৃত্যুতে সোশাল মিডিয়া যেন শোকবই। সতীর্থ, সহশিল্পী থেকে শুরু করে দলের সদস্যরা তাদের প্রিয় মানুষকে হানারোর ব্যথা লিখেছেন কত কথায়। 

ব্যান্ড ‘ব্ল্যাক সাবাথ’ এক্সে লিখেছে, “কি বলা যায়! এক নায়ক, আইকন, পথিকৃৎ, অনুপ্রেরণা এবং পরামর্শদাতা। এককথায় ওজি অসবোর্ন নামটি উঠলে মনে হয় তিনি আসলে ‘বন্ধু’।

হার্ডকোর ব্যান্ড ব্ল্যাক ফ্ল্যাগের সাবেক ফ্রন্টম্যান হেনরি রোলিন্স লিখেছে, "একটি নির্দিষ্ট ধারার সংগীতের সঙ্গে কেউ নিজেকে এতটা সমার্থক করে তুলতে পারেন কেউ, এটা বিরল।

"যদি আপনি হেভি মেটাল সম্পর্কে কথা বলতে চান, তাহলে প্রথমেই ওজি অসবোর্ন এবং ব্ল্যাক সাবাথের কথা আসবে। বাকি সবাই পরে আসে।"

আমেরিকান রক ব্যান্ড ‘অ্যারোস্মিথ’ তাকে "আমাদের রক ভাই" বলে সম্বোধন করে লিখেছেন, "বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ যারা তার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেছেন।"

তারকাশিল্পী এলটন জন বলেছেন, “ওজি ছিলেন আমার প্রিয় বন্ধু এবং রক সংগীতের পথিকৃৎ। তিনি থাকবেন গানের দেবতাদের অমর তালিকায়।”

‘ব্ল্যাক সাবাথের’ অসবোর্নের সহশিল্পীরা প্রত্যেকে আলাদা করে সোশাল মিডিয়ায় শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। 

ড্রামার বিল ওয়ার্ড তাদের একসাথে কাটানো সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, “এখন আমি তোমাকে কোথায় পাব? স্মৃতিতে, আমাদের অব্যক্ত আলিঙ্গনে, আমাদের ফোন কলগুলিতে?  তুমি চিরকাল আমার হৃদয়ে থাকছ।"

গিটারিস্ট টনি ইওমি বলেছিলেন "তার মত আর কেউ হবে না"। 

গীতিকার গিজার বাটলার লিখেছেন, "বিদায় প্রিয় বন্ধু। এত বছর ধরে আমরা কত না মজা করেছি, সব মনে রাখবে তো?” 

অনবদ্য বিদায় সন্ধ্যা

বার্মিংহামের ‘ভিলা পার্কে’ গেল ৫ জুলাই আয়োজিত ‘ব্যাক টু দ্যা বিগিনিং’ কনসার্টে ৪২ হাজার শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে গানের জগৎ থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন অসবোর্ন। 

বলেই মঞ্চ ছাড়েন গায়ক। দর্শক সাড়িতে প্রথমে হতবিহ্বলতা তারপর শিল্পীকে অবসর না নেওয়ার অনুরোধ বাণীর ঝড় ওঠে। 

সেদিন মঞ্চে ছিলেন তার অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা মেটালিকা, স্লেয়ার, গানস এন’রোজেসসহ আরও অনেকে রক ব্যান্ডের নামি শিল্পীরা। 

অসবোর্ন সেদিন দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, “আমি ছয় বছর ধরে শয্যাশায়ী ছিলাম। আমার কেমন লাগছে, সেটা আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না। হৃদয়ের গভীর থেকে ধন্যবাদ জানাই।”

বাদুড় আকৃতির কালো রঙা সিংহাসনে বসে অসবোর্ন দারুণ সব গান করেছিলেন সেদিন। শুরুতে বলেছিলেন, সব প্রিয় গান শোনাতে চান তিনি। প্রথমে একক পাঁচটি গান গেয়ে শোনান। 

ব্ল্যাক সাবাথের গিজার বাটলার, টনি আয়োমি ও বিল ওয়ার্ডের সঙ্গে চারটি গান পরিবেশন করেন তিনি।

একপর্যায়ে শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, 'আই অ্যাম আয়রন ম্যান, তোমরা এবার পাগল হয়ে যাও!'

কখনো চোখ বন্ধ করে, চোখ খুলে, দুহাত নেড়ে, দর্শককে অভিবাদন জানিয়েন। এক অনবদ্য বিদায় সন্ধ্যা সেদিন দেখেছে দর্শকরা। 

জন্ম-উত্থান, কৈশরেই সুরের সন্ধান

১৯৪৮ সালে ৩ ডিসেম্বর বার্মিংহামের অ্যাস্টোনে জন্ম নেন অসবোর্ন, পুরো নাম জন মাইকেল অসবোর্ন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ অসবোর্ন স্কুল ছাড়েন ১৫ বয়সে। নানা ধরনের অস্থায়ী কাজ করতেন। একবার চুরির অপরাধে অল্প সময়ের জন্য কারাবাসও হয় তার। কৈশর উতরে ঝুঁকে পড়েন গানে। 

তিনি নিজেই নিজের নাম দিয়েছিলেন ‘প্রিন্স অফ ডার্কনেস’। সংগীতের জগতে তার যাত্রা শুরু ইংলিশ রক ব্যান্ড ‘ব্ল্যাক সাবাথের’ হাত ধরে।

অসবোর্নকে বলা হত হেভি মেটাল ঘরানার পথপ্রদর্শক। যার গা ছমছম করা কণ্ঠের ভৌতিক সুর এই ধারার বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৭০ সালে ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পর ইউকে টপচার্টে দশম স্থান দখল করে নেয়। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি ওজিকে। একে এক জনপ্রিয়তা পায় ‘আয়রন ম্যান’, ‘প্যারানয়েড’, ‘ওয়ার পিগস’, ক্রেইজি ট্রেইন’ এবং ‘চেইঞ্জেস’ গানগুলো।

সারা বিশ্বে ৭ কোটি ৫০ লাখ অ্যালবাম বিক্রির মাধ্যমে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সাফল্যময় ব্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ‘ব্ল্যাক সাবাথ’। তবে এক সময় খ্যাতির অহংকার গ্রাস করে অজি অসবোর্নকে।

ব্যান্ডের অনুশীলনে সময় মত না আসাসহ নানা অনিয়ম ও উচ্ছৃঙ্খলায় জড়ান তিনি। ফলাফল হল, বিরক্ত হয়ে তাকে ব্যান্ড থেকে বের করে দেওয়া হয় ১৯৭৯ সালে।

পরের বছরই নিজের একক অ্যালবাম ‘ব্লিজার্ড অফ ওজ’ প্রকাশ করেন অন্ধকারের এই রাজপুত্র। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় একক ‘ডায়েরি অফ এ ম্যাডাম’।

এই দুই হার্ড রক ক্লাসিক অ্যালবাম ‘মাল্টিপ্লাটিনাম’ রেকর্ড গড়ে। সংগীত জীবনে তিনি বেশ কয়েকটি সম্মানে অলংকৃত হন। এরমধ্যে রয়েছে ‘আই ডোন’ট ওয়ান্ট টু চেইঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড’ গানের জন্য ১৯৯৪ সালের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড।

২০০৪ সালে এনএমই অ্যাওয়ার্ডয়ে ‘গডলাইক জিনিয়াস’ এ ভূষিত হন তিনি।

এছাড়া ‘ইউকে মিউজিক হল অফ ফেইম’ এ তারকা খচিত পথে তিনি জায়গা করে নেন একক শিল্পী এবং ‘ব্ল্যাক সাবাথের’ সদস্য হিসেবে। এছাড়া ‘হলিউড ওয়াক অফ ফেইময়েও’ রয়েছে তার তারকা চিহ্ন।

ক্যালিফোর্নিয়ায় অসবর্নে প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন ভক্তরা। ছবি: রয়টার্স

ক্যালিফোর্নিয়ায় অসবর্নে প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন ভক্তরা

পাগলামি-বিতর্ক

মঞ্চে অসবোর্নের আচরণ ছিল পাগলামিতে ভরপুর। ১৯৮২ সালে একবার এক কনসার্টে অসবোর্নের দিকে এক ভক্ত ছুড়ে দেন একটি জীবন্ত বাদুড়। তিনিও সেই বাদুড় হাতে নিয়ে সেটার মাথা কামড়ে দেন। ওই একটি ঘটনা অসবর্নকে আলোচিত করে তোলে। 

ঘটনাটি নিয়ে নানা সময়ে অসর্বনের ভাষ্য ছিল, ‘এটি নিছকই খেলা’। 

বাদুড় কামড়ানোর পর তিনি অবশ্য ভুল বুঝতে পারেন এবং দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে র‌েবিসের ইনজেকশন নেন। পরে তিনি বাদুড় আকৃতির নরম খেলনা বিক্রি করতেন, যার মাথা খোলা যেত।

অতিরিক্ত মদ্যপানের দুর্নাম জড়িয়েছিল গায়কের নামের সঙ্গে। মাদকাসক্তির কারণে একসময় নিজের স্ত্রীকে খুনের চেষ্টাও করেছিলেন। সেবার গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান অসবোর্ন।

পরে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো 'দ্য অসবোর্নস’ পরিবারের সঙ্গে তার সহজসরল উপস্থিতির জন্য দর্শকদের ভালোবাসা কুড়ান। তবে নিজের নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপনের কথা অবলীলায় বলে গেছেন সবখানে।

রক সঙ্গীতের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এক সময়ে উদ্বিগ্ন রক্ষণশীল ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কড়া কথার নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত হন অসবোর্ন। 

২০১০ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীতে অসবোর্ন বলেছেন, “আমি জীবনে কিছু বাজে কাজ করেছি। কিন্তু আমি শয়তান নই। আমি কেবল জন ওসবোর্ন: অ্যাস্টনের একটি শ্রমজীবী পরিবারের ছেলে, যে কারখানার চাকরি ছেড়ে জীবন উপভোগ করতে বেরিয়েছিল।”

স্মৃতিকথায় বলেন, “ছোটবেলায় যদি আমাকে রাস্তার অন্য ছেলেদের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে কেউ জিজ্ঞেস করত যে কে ৬০ বছর পর্যন্ত বাঁচবে? পাঁচটা সন্তান, চারটা নাতি-নাতনি আর বাকিংহ্যামশায়ার ও ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ি থাকবে; আমি নিজের ওপর এক পয়সাও বাজি ধরতাম না, কোনোভাবেই না।”

২০১৯ সালে 'নো মোর ট্যুরস টু' নামের শেষ বিশ্বভ্রমণে বের হয়েছিলেন অসবোর্ন, তবে অসুস্থতার কারণে ইউরোপ সফর বাতিল করতে হয় তাকে।

২০২৫ সালের মে মাসে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওজি অসবোর্ন বলেছিলেন, দীর্ঘ চিকিৎসাজনিত কষ্টে তিনি হতাশায় ভুগছেন।

“প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি, শরীরের আরও কিছু খারাপ হয়েছে। মনে হত, এর আর কোনো শেষ নেই।”

অসবোর্ন তার পরিবারে রেখে গেছেন স্ত্রী ও ম্যানেজার শ্যারন; জ্যাক, কেলি, পাঁচ সন্তান এবং বেশ কয়েকজন নাতি-নাতনি।