Published : 13 Feb 2026, 08:55 PM
ঋণ মামলায় কারাগারে থাকা বলিউডের কৌতুক অভিনেতা রাজপাল যাদবের জামিন মেলেনি।
অভিনেতার জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন দিল্লি হাই কোর্ট। পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত তিহাড় জেলেই থাকতে হবে যাদবকে।
রাজপালের ম্যানেজার গোল্ডি জানিয়েছিলেন, যাদবের জামিনের জন্য আবেদন করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দিল্লি হাই কোর্টের শুনানিতে তার জামিন হয়ে যেতে পারে। তবে ঘটনা ঘটল উল্টো। আদালত আগামী সোমবার পর্যন্ত যাদবের জামিন আবেদন মুলতবি করেন এবং যাদবের আচরণে 'তীব্র অসন্তোষ' প্রকাশ করে।
হিন্দুস্থান টাইমস লিখেছে, পরিবারের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য সাজা স্থগিত চেয়ে জামিন আবেদন করেন যাদবের আইনজীবী।
সেই শুনানিতে বিচারপতি স্বর্ণা কান্ত শর্মা বলেন, “আদালতের আদেশের কারণে যাদব জেলে যায়নি। জেলে গেছেন, কারণ নিজের প্রতিশ্রুতি পালন করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।”
শুনানিতে আদালত বলেছে, যাদব নিজেই অভিযোগকারী পক্ষের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছেছিলেন। পরে সেই চুক্তির শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হন।
অভিনেতার আইনজীবী দাবি করেন, মামলার কার্যক্রম চলাকালে যাদব ‘ভুল পথে পরিচালিত’ হয়েছিলেন এবং এখন বিষয়টি মিটমাট করতে প্রস্তুত। তবে আদালত এই যুক্তি নাকচ করে দেন।
সেসময় বিচারপতি বলেন, "যাদব ২০ থেকে ৩০ বার আদালতে হাজির হয়েছেন। অন্তত পাঁচবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উপস্থিত হয়ে তিনি নিজেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার আশ্বাস দিয়েছেন। তার পক্ষে একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীও ছিলেন। ফলে এখন ‘ভুল বোঝানো হয়েছিল’, এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।"
আদালতের তরফে আরও বলা হয়, “যাদব বলেছিলেন মীমাংসার পথ খুঁজবেন, মধ্যস্থতায় গিয়েছিলেন এবং অর্থ পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছিলেন। বছরের পর বছর অর্থ পরিশোধ করেননি।”
বিচারপতি শর্মা বলেন, "আদালতের সহানুভূতি থাকতে পারে, তবে তা আইনি কাঠামোর ঊর্ধ্বে নয়।"
‘যাদব তার ঋণের অর্ধেক পরিশোধ করেছেন’
শুনানি শেষে আদালতের বাইরে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন রাজপালের আইনজীবী ভাস্কর উপাধ্যায়।
তিনি বলেন, একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নেওয়া ৫ কোটি রুপি ঋণের মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কেবল প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি, এই ভিত্তিতে কারাদণ্ড হওয়া উচিত নয়।
ভাস্কর বলেন, "আমরা আদালতকে জানিয়েছি, যদি বিষয়টি পুরোপুরি আর্থিক হয়, তাহলে আমরা জেলে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নেব। জেলে যাদবের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সম্ভব হয়নি। আগের অঙ্গীকার নিয়ে আদালতের অবস্থান জানতে আমরা ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে দেখা করব। যদি আমরা টাকা পরিশোধ করি, তাহলে বিষয়টি মীমাংসা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং মামলাটি মূল যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে আর চলবে না।”
আইনজীবী আরও বলেছেন, “মূল ৫ কোটি রুপি বেড়ে ১১ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যন্ত আমরা ২ কোটি ৫০ লাখ রুপি পরিশোধ করেছি। এর আগে প্রায় ১ কোটি টাকা রেজিস্ট্রিতে জমা দেওয়া হয়েছিল এবং আমরা ২৫ লাখ টাকার একটি চেকও এনেছিলাম। যে পরিমাণ সহায়তা পাচ্ছি, তা আদালতে জমা দিতে প্রস্তুত আছি। এ নিয়ে বড় কোনো সমস্যা নেই। এখন দেখার বিষয় সোমবার আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়।”
মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী সোমবার অনুষ্ঠিত হবে।
এই আর্থিক সংকটের সূত্রপাত ২০১০ সালে। যাদব তার পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র ‘আতা পাতা লাপাতা’ নির্মাণের জন্য দিল্লিভিত্তিক কোম্পানি 'মুরালি প্রজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেড' থেকে পাঁচ কোটি রুপি ঋণ নিয়েছিলেন। দুই বছর পর ২০১২ সালে সিনেমাটি মুক্তির পর তেমন ব্যবসা করতে পারেনি। তখন সেই ঋণ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় এবং বিষয়টি আদালতে গড়ায়।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৮ সালের এপ্রিলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রাজপাল যাদব ও তার স্ত্রী রাধাকে 'নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের' ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে।
পরে ২০১৯ সালে সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে রাজপাল দায়রা আদালতে রিভিশন আবেদন করেন, যা পরে গড়ায় দিল্লির হাই কোর্টে।
দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি চলার পর ২০২৪ সালের জুনে হাই কোর্ট সাময়িকভাবে অভিনেতার সাজা স্থগিত করে এবং স্পষ্টভাবে জানায় যে বকেয়া পরিশোধে ‘সৎ ও আন্তরিক’ উদ্যোগ দেখাতে হবে।
এই সময়ের মধ্যে সুদ-জরিমানা যোগ হয়ে ৫ কোটি রুপি থেকে ঋণের অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটিতে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যাদব দুই দফায় ডিমান্ড ড্রাফটের মাধ্যমে ৭৫ লাখ রুপি জমা দেন। সেসময় আদালত লক্ষ্য করে, বকেয়ার বড় অংশ তখনও অপরিশোধিত রয়েছে।
এরপর গত বছরের ডিসেম্বরে ৪০ লাখ এবং জানুয়ারিতে ২ কোটি রুপি দেওয়ার কথা থাকলেও যাদব তা দেননি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে মামলাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি যাদব এক সপ্তাহের সময় চেয়ে ‘মার্সি প্লি’ বা শেষ মুহূর্তের সাজা মওকুফের আবেদন করেন, আদালত তা খারিজ করে দেন।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে শেষবার হাজির হয়ে রাজপাল যাদবের আইনজীবী নতুন করে ২৫ লাখ রুপির একটি চেক ও নতুন পরিশোধের সময় তুলে ধরেন। তবে আদালত আত্মসমর্পণের আদেশ প্রত্যাহার করেননি।
এরপর ওই দিন বিকাল ৪টার দিকে যাদব তিহার জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
তিহার জেলে আত্মসমর্পণের আগে আবেগাপ্লুত রাজপাল আদালতে বলেন, “স্যার, আমি কী করব? আমার কাছে টাকা নেই। আর কোনো উপায় দেখছি না।"
সহকর্মীদের কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সবাই যার যার মতই আছে। এখানে আমরা সবাই একা। কোনো বন্ধু নেই। এই সংকট আমাকে একাই সামলাতে হবে।”
সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন যাদবের সহকর্মীরা
অভিনেতা ও তার পরিবারের আর্থিক এবং আইনি সংকটের বিষয়টি জানার পর একজোট হয়ে বলিউডের অনেকে অর্থসাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
যাদবকে ১১ লাখ রুপি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জনশক্তি জনতা দলের (জেজেডি) প্রধান তেজ প্রতাপ যাদব। এছাড়াও অভিনেতা সোনু সুদ, সালমান খান, অজয় দেবগণ, নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি আর্থিক সাহায্য করার কথা দিয়েছেন।
আরও পড়ুন