Published : 24 Nov 2025, 09:34 PM
ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সোশাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার মধ্যে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
রোববার ফেইসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি লিখেছেন, বাউলদের ওপর অত্যাচারের ইতিহাস ‘পুরোনো’। আর আবুল সরকারের গ্রেপ্তারের খবর শুনে যা করার কথা তা তিনি করেছেন।
“আমাদের কাজ তো কাজটা করা। সরকারে বসে বিবৃতি দেওয়া নয়,” বলেন উপদেষ্টা।
গত ২০ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় এক গানের আসরে ‘আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তি’ করার অভিযোগে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লী ইউনিয়নের পারতিল্লী এলাকার বাসিন্দা আবুল সরকার এলাকায় বাউল শিল্পী ছোট আবুল সরকার নামে পরিচিত। তিনি কোক স্টুডিও বাংলার ‘কথা কইয়ো না’ গানের শিল্পী আলেয়া বেগমের স্বামী।
তাদের মেয়ে ইন্নিমা রশ্মিও গানে করেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন তিনি।
তিন বছর আগে রশ্মির গান শুনে ভালো লাগায় ফেইসবুকে প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তার সেই পোস্টের স্ক্রিনশট শেয়ার করে সুজন দেওয়ান নামের একজন বাউলভক্ত বেহালাবাদক রোববার একটি পোস্ট দেন।
সেখানে উপদেষ্টাকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, “আপনি এবং আপনার কালচারাল মিনিস্ট্রি একদিকে লালন সাঁইজির তিরোধান দিবসকে জাতীয় পর্যায়ে পালন করছেন, অন্যদিকে বাউলদের পালাগানের আসর থেকে তুলে নিয়ে জেলে পুড়ছেন।
“একদল উগ্র ধর্মান্ধের অবুঝ নালিশে একজন সূফী বাউলের সাথে যেই অন্যায়টা আপনার সরকার করলো তা নিয়ে আর কিছু বলার নাই।”
এরপর উপদেষ্টা ফারুকী এক ফেইসবুক পোস্টে বলেন, আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানতে পেরেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।
“স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে একটা ভিডিও ক্লিপ পাঠানো হয় এবং পরিস্থিতির উত্তাপ এবং ঝুঁকির দিকগুলো ব্যাখ্যা করা হয়। আমি বুঝতে পারি একটা সংকটের দিকে যাচ্ছে পুরা ব্যাপারটা। আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে আমার বা আমার মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই। এখতিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।”
ফারুকী বলেন, বিষয়টি ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায়’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজ দায়িত্বেই পরিস্থিতি সামলাচ্ছে এবং তিনি সার্বক্ষণিক যোগাযোগে রয়েছেন।
সবাইকে ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনেরও অনুরোধ করেন উপদেষ্টা।
সমালোচনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, সমাজের একটি অংশ ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ তাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এছাড়া কিছু সমালোচনা তার মন্ত্রণালয়ের তৈরি ‘ইনক্লুসিভ ডকুমেন্টারি নিয়ে গাত্রদাহ থেকে’ এসেছে।
“বাউলদের ওপর অত্যাচারের ইতিহাস পুরোনো। এমনকি আওয়ামী লীগের আমলটা ঘেঁটে দেখেন, কত জায়গায় বাউলদের উপর আক্রমণ হয়েছে, চুল কেটে দিয়েছে, বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলেছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে পালাকার গ্রেপ্তার হয়েছে।
“এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ যেটা করা সম্ভব সেটাই করেছি, লালনকে জাতীয়ভাবে সেলিব্রেট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
এসব অনুষ্ঠান দিয়ে তাদের ‘পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন’ দাবি করে ফারুকী লিখেছেন, "লালন শাহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক-কবি-দার্শনিকদের একজন। এর পাশাপাশি সারাদেশে আমরা অনেকগুলো সাধুসঙ্গ করেছি।
“আমরা পরিষ্কার বহুত্বের পক্ষে সাংস্কৃতিকভাবে অবস্থান নিয়েছি। ৫৪ বছরে প্রথমবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঈদ, বৌদ্ধ পূর্নিমা, দুর্গাপূজা সেলিব্রেট করেছি। নববর্ষে সকল জাতিগোষ্ঠিকে নিয়ে একসাথে উৎসব করেছি। আমাদের এই অবস্থানটাই নতুন বাংলাদেশ।"
ফারুকীর এই ব্যাখ্যার পর বেহালাবাদক সুজন দেওয়ান পাল্টা পোস্টে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, ফারুকী মূল বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
সুজন লিখেছেন, “আমরা সাধারণ মানুষ জানি না আপনি কোন মন্ত্রণালয় সামলান। আমরা দেখি সরকার একদিকে লালন মেলা করে, অন্যদিকে বাউলদের গ্রেপ্তার করে। আপনি সেই সরকারেরই অংশ, দায় আপনারও।”
তার দাবি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে ভিডিও ক্লিপ ফারুকীকে দিয়েছে, সেটা ছিল পালাগানের ‘একটি ছোট অংশ’।
“আবুল সরকার পালাগানের শুরুতেই সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন যাতে তার কথায় কেউ কষ্ট না পায়। আপনার সরকারের পুলিশ বাহিনী অন্য একটা জেলায় গিয়ে মধ্যরাতে পালাগানের আসর থেকে যেভাবে তাকে গ্রেপ্তার করল, যেন অনেক বড় কোনো টেরোরিস্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”