Published : 22 Aug 2026, 04:06 PM
ইতালির রোমে ব্যান্ড তারকা মাহফুজ আনাম জেমসের কনসার্টকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা এবার থানা পর্যন্ত গড়াল।
নগরবাউলের ওই কনসার্টে ৩৫ হাজার ইউরো নিয়ে ‘প্রতারণার’ অভিযোগ এনে রোমের একটি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন সেখানকার স্থানীয় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান এবিজেন এর প্রধান হোসাইন আহমেদ মোয়াজ।
রোমের রোমা-আচিলিয়া ক্যারাবিয়ান পুলিশ স্টেশনে স্থানীয় সময় শুক্রবার এ অভিযোগ করা হয়। ক্যারাবিনিয়ান থানায় ওই নথিতে অভিযোগটি ‘প্রতারণা’ হিসেবে বলা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জেমসের দলের ইতালিতে রোম ও ভেনিসে অনুষ্ঠান করার কথা ছিল। এসব অনুষ্ঠানের জন্য অভিযোগকারী মোট ৩৫ হাজার ইউরো অর্থ প্রদান করেন বলে দাবি করেছেন। এ বিষয়ে জেমসের মুখপাত্র ও ব্যবস্থাপক রুবাইয়াত ঠাকুর রবিনের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছিল বলেও অভিযোগে বলা হযেছে।
অভিযোগকারী বলেছেন, চলতি মাসের ৯ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে ‘প্রতারণার’ ঘটনাটি ঘটেছে। এ ঘটনায় নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরে তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও শাস্তির আবেদন করেছেন।
তার অভিযোগটি তদন্ত করছে পুলিশ।
এসব বিষয়ে একজন আইন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশি নাগরিক বলেন, “যেহেতু এটা মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। শুধু এসব অভিযোগই নয়, এই অর্থ কীভাবে লেনদেন হয়েছে, কীভাবে বাংলাদেশে পাঠানো হবে বা হয়েছে এবং এখানে কোনো অবৈধ পথ ব্যবহার করা হয়েছে কি-না, তা সব খতিয়ে দেখা হবে।”
জেমসের ব্যবস্থাপক রবিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন বলেন, "আয়োজক কমিটি সাধারণ ডায়েরিতে পুরো ঘটনার বিবরণ দেয়নি। তারা অনেক তথ্য লুকিয়েছে। তারা যেহেতু আইনি প্রক্রিয়ায় এটা সমাধান চাচ্ছে, তাই আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় এর সমাধানে প্রস্তুত। আমি অনেক আগে থেকেই আয়োজক কমিটিকে বলেছিলাম যে কাদা ছোড়াছুড়ি না করে আইনি প্রক্রিয়া এর সমাধান করা যেতে পারে।”
ইতালির রোমে জেমসের কনসার্টটি ছিল গেল ১৬ অগাস্টে। জেমস তার দলের লোকজনকে নিয়ে হোটেল ছাড়েন ১৯ অগাস্ট। কনসার্টের তিনদিন পর জেমস তার সঙ্গীদের নিয়ে অভিযোগ করেন কনসার্ট আয়োজক হোসাইন আহমেদ মোয়াজ। ফেইসবুক ভিডিও পোস্ট দিয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন মোয়াজ।
তিনি বলেন, কনসার্টের জন্য চুক্তির ৩০ হাজার ইউরোর মধ্যে জেমসের দল ২৪ হাজার ইউরো বুঝে পেয়েছিল। বাকি ৬ হাজার ইউরো টিকেট বিক্রির ক্যাশ কাউন্টার থেকে সংগ্রহের কথা ছিল।
তার অভিযোগ হল, রাত ৯টায় জেমসের স্টেজে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু তার আগে ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে তার ম্যানেজার ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে জোর জবরদস্তি করে ‘২৪ হাজার ইউরো বুঝে নেওয়ার পর আরও অর্থ দাবি করেন’। সাড়ে ৯টা পর্যন্ত জেমসকে ‘আটকে রেখে স্টেজে উঠতে দেওয়া হয়নি’। একপর্যায়ে দর্শক হট্টগোল শুরু করলে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে ক্যাশ কাউন্টার থেকে তাদের লোকের হাতে টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার পর রাত প্রায় ১০টার দিকে জেমসকে মঞ্চে তোলা হয়।”
স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নৈশভোজসহ চুক্তির একাধিক শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তুলে মোয়াজ বলেন, টিকেট বিক্রির সঠিক হিসাব পাননি তিনি।
“পুলিশি ঝামেলা এড়াতে সকালে সব সমাধান করার কথা বললেও, সকালে হোটেলের চাবি না বুঝিয়ে ও হোটেল কর্তৃপক্ষের পাওনা না মিটিয়ে তারা গোপনে পালিয়ে যান।”
জেমস ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে হোটেল কক্ষ নোংরা করে রেখে যাওয়ারও অভিযোগ করেন মোয়াজ।
তিনি বলেন, হোটেলে গিয়ে তিনি দেখতে পান জেমস ও তার ম্যানেজারসহ সফরসঙ্গীরা হোটেল ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু যাবার আগে হোটেলের কক্ষ নোংরা করে রেখে গেছেন। এর জন্য হোটেল কর্তৃপক্ষ ২০০ ইউরো জরিমানা দাবি করে আয়োজক কমিটির কাছে।
ফেইসবুকে ছড়ানো ছবিতে দেখা যায়, মেঝেতে প্লাস্টিকের পানির বোতল ও আবর্জনা পড়ে আছে। খাবারের টেবিলে ব্যবহার করা প্লেট, উচ্ছিষ্ট ও রান্নাঘরে ডিম ও নোংরা থালা-বাসন পড়ে আছে।
তবে এসব অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ও অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন জেমসের মুখপাত্র ও ব্যবস্থাপক রুবাইয়াত ঠাকুর রবিন।
জেমস ও তার সঙ্গীদের নিয়ে তোলা অভিযোগের সূত্রপাত হোটেলকে কেন্দ্র করে বলে দাবি করেন রবিন।
গ্লিটজকে তিনি বলেন, “সেখানে আমাদের ব্যান্ডের জন্য মোট চারটি রুম বরাদ্দ ছিল। জেমস ভাই ছিলেন ৩৪৫ নম্বর কক্ষে, আমি ছিলাম ২৪৬ নম্বর কক্ষে, আমাদের ব্যান্ডের নিয়মিত সদস্যরা ছিলেন ১৪৪ নম্বর কক্ষে এবং আমেরিকা থেকে আসা একজন অতিথি শিল্পী ছিলেন ৫৪৯ নম্বর কক্ষে।”
রোমে জেমসের কনসার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার মধ্যে, ভেনিসে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংবাদসম্মেলনে আসেন জেমস। সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এক তরুণ মিউজিশায়ান গিটার ও কীবোর্ড বাজাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। সেই তরুণ তার কক্ষ গোছগাছ করে যাননি বলে তার ধারণা।
জেমস মনে করছেন, যা ঘটেছে তা বড় করে দেখার কিছু নেই। তার কথায়, হোটেলে প্রায়ই এমন ঘটে।
হোটেল কর্তৃপক্ষের জরিমানা কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “যদি ওরা ২০০ ইউরোর মত ফাইন (জরিমানা) করেও থাকে, তবে সেটাও নতুন কিছু না। অনেকেই রুমে সিগারেট খেলে বা নিয়ম ভাঙলে ১০০, ২০০ বা ৫০০ ডলার ফাইন দিয়ে চলে যায়। একেক দেশের নিয়ম একেক রকম। এ নিয়ে যেভাবে কথা হচ্ছে, সত্যি বলতে এটা তেমন কোনো বড় ঘটনা বা ইস্যু হওয়ার মত বিষয়ই না।”
সোশাল মিডিয়ায় তার বিরুদ্ধে ছড়ানো অভিযোগ নিয়ে জেমস বলেন, “আমরা যখন ভেনিসে চলে এসেছি, তখন এই কথাগুলো উঠছে। এখন শুধু সোশাল মিডিয়ার যুগ, সবারই স্বাধীনতা আছে সেখানে বিভিন্ন কিছু লেখার। মানুষ যা মন চায় লিখতে পারে, এমনকি বড় বড় রাজনীতিবিদদের নিয়েও তো কত কিছু লেখা হয়! কিন্তু তথ্য প্রমাণ ছাড়া এসব কথার কোনো ভিত্তি থাকে না।”
জেমস আরও জানিয়েছেন, তারা স্বাভাবিক নিয়মেই হোটেলের চাবি জমা দিয়ে বের হয়েছেন। তার দাবি, জরিমানার বিষয়টি হোটেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে করা একটি অভিযোগ মাত্র।
জেমসের ব্যবস্থাপক রবিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জেমস মঞ্চে ওঠার আগে তিনি আয়োজকদের কাছে বকেয়া অর্থ পরিশোধের দাবি জানিয়েছিলেন। তখন তাকে ‘হয়রানির মুখে পড়তে হয়’।
কনসার্টের ভেন্যুতে তখন প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন বলেও দাবি করা হয়। জেমসের মঞ্চে উঠতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ ছাড়াই তিনি মঞ্চে ওঠেন বলেও জানিয়েছেন রবিন।