Published : 03 May 2026, 01:57 PM
কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, আঁকিয়ে সত্যজিত রায় তার ‘অপু ট্রিলজি’র জন্য জগৎজোড়া খ্যাতি পাওয়ার পর চেষ্টা করেছিলেন সায়েন্স ফিকশন সিনেমা তৈরি করার। এ নিয়ে কিংবদন্তি সায়েন্স ফিকশন লেখক ও কাছের বন্ধু আর্থার সি. ক্লার্কের সঙ্গে আলোচনাও করেছিলেন তিনি।
ক্লার্ককে সত্যজিত রায় বলেছিলেন, এলিয়েনের সঙ্গে এক ছোট ছেলের বন্ধুত্ব নিয়ে সিনেমা বানাতে চান তিনি। সত্যজিৎ রায়ের ১০৫তম জন্মবার্ষিকী শনিবার। বেশ কবছর আগে এই তথ্য সামনে আনে ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস। সত্যজিতের জন্মবার্ষিকী ঘিরে ফের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
ক্লার্কের উৎসাহেই সত্যজিৎ রায় ‘এলিয়েন’ নামের একটি সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরি করেন ও হলিউডের স্টুডিওগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। সে সময় তার যোগাযোগ হয় মাইক উইলসন নামের এক প্রযোজকের সঙ্গে। কলাম্বিয়ার মত বড় হলিউড স্টুডিও রাজিও হয় প্রযোজনা করতে।
উইলিসন সে সময় চিত্রনাট্যের সহ-লেখক হিসেবে নিজের নাম এই সিনেমার সঙ্গে জুড়ে দিতে চেয়েছিলেন। আদতে তিনি সংলাপে কয়েকটি ছোটখাট পরিবর্তন ও সিনেমায় বর্ণিত স্পেইসশিপের রঙ বদলে সোনালি করা ছাড়া আর কোনো অবদান রাখেননি।
সত্যজিৎ রায় চেয়েছিলেন, ষাটের দশকের খ্যাতনামা ব্রিটিশ অভিনেতা পিটার সেলার্স যেন তার সিনেমায় ছোট কিন্তু গুরত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। কলাম্বিয়া এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার পর মারলোন ব্র্যান্ডো ও স্টিভি ম্যাককুইনের মত বড় তারকারাও যুক্ত হন।
শেষ পর্যন্ত ‘এলিয়েন’ আর তৈরি হয়নি। প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয় কলাম্বিয়া। সত্যজিত রায় পরে জানতে পারেন, কলাম্বিয়া তার চিত্রনাট্যের অনেকগুলো কপি করেছে এবং অনেকেই সেটা পড়েছেন।
এর প্রায় দুই দশক পর হলিউডের নামজাদা পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ তৈরি করেন ‘ই.টি.- দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ নামের একটি সায়েন্স ফিকশন সিনেমা। বক্স অফিসে দারুণ সফল ছিল ই.টি.। প্রায় এক দশক হলিউডের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা হিসেবে রেকর্ড ধরে রেখেছিল ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা।
ক্লার্ক সে সময় লন্ডনে সিনেমাটি দেখেন ও ‘এলিয়েন’ এর সঙ্গে ‘ই.টি.’র মিল খুঁজে পেয়ে সত্যজিৎ রায়কে ফোন করে এ ঘটনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেন।
১৯৮৩ সালে ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিত রায় দুই নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গ ও জর্জ লুকাসকে নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেছিলেন, “অ্যামেরিকায় আমার ‘এলিয়েন’ এর চিত্রনাট্যের কপি সহজলভ্য না হলে অন্তত স্পিলবার্গ-লুকাসের তৈরি শেষ দুটো সিনেমা ‘ক্লোজ এনকাউন্টার্স অব দ্য থার্ড কাইন্ড’ ও ‘ই.টি.’ তৈরি করা সম্ভব হত না। কিছুদিন আগে আর্থার আমাকে লন্ডন থেকে ফোন করে একটা কপিরাইট মামলা করার অনুরোধ করেছিল ও বলেছিল ব্যাপারটাকে যেন আমি হালকাভাবে না নেই।
“এই ব্যক্তিগত অভিযোগ ছাড়া সায়েন্স ও স্পেইস ফ্যান্টাসি নির্ভর সিনেমার সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। সিনেমার এই শাখা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, স্পিলবার্গ ও লুকাস অযথাই সিনেমার কাহিনীগুলোকে জটিল করে ফেলেছেন। কাহিনী হতে হবে সহজ, সাধারণ ও বাহুল্যবর্জিত।”
স্টিভেন স্পিলবার্গ সবসময়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “তার চিত্রনাট্য যখন হলিউডে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমি হাই স্কুলে পড়ি।”
তবে অনেক চলচ্চিত্র বোদ্ধার ধারণা, সত্যজিত রায়ের অভিযোগের কারণেই ই.টি. সেবার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে বড় কোনো পুরস্কার জেতেনি। চারটি অস্কার জিতেছিল সিনেমাটি, চারটিই ছিল টেকনিক্যাল ক্যাটাগরিতে। ই.টি.কে হারিয়ে সেরা সিনেমার অস্কার জিতে নেয় ‘গান্ধী’, একই সিনেমার জন্য সেরা পরিচালক ও সেরা অভিনেতার অস্কার জেতেন যথাক্রমে স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরো ও বেন কিংসলে।
স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরো পুরস্কার পাওয়ার পর বলেছিলেন, “আমি নিশ্চিত ছিলাম যে ই.টি. শুধু জিতবেই না, বরং এর জেতা উচিত। সিনেমায় নতুন উদ্ভাবনী ধারণার প্রয়োগ ছিল। এটি ছিল প্রভাবশালী ও চমৎকার। আমি তার তুলনায় অনেক সাদামাটা সিনেমা বানাই।”