Published : 16 Aug 2025, 08:58 PM
মগবাজারের এক গলির ভেতর ছিল ছোট্ট এক স্টুডিও, যার নাম ছিল ‘এবি কিচেন’। বাদ্যযন্ত্র, দেয়ালজুড়ে ফ্রেমবন্দি বহু ছবি, আর ভেতরে গিটারের টুং টাং বা ঝংকারে ভরা সেই জায়গা একসময় ছিল আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে প্রিয় আস্তানা।
১৯৬২ সালের ১৬ অগাস্টে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চুর ৬৩তম জন্মবার্ষিকী শনিবার। সাত বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া এই শিল্পী একাধারে ছিলেন গায়ক, গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। ভক্তকূল এবং দলের সদস্যদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘এবি’ নামে।
গানকে রন্ধনিশল্পের সঙ্গে তুলনা করে নিজেই স্টুডিওর নাম রেখেছিলেন ‘এবি কিচেন’। এখানেই তিনি সময় কাটাতেন, সুর-সংগীতে মগ্ন থাকতেন; আর জন্মদিন এলে বাচ্চুর সেই কিচেন হয়ে উঠত উৎসবের ঘর।
বন্ধু, সহশিল্পী, সাংবাদিক ও কাছের মানুষের আনাগোনায় কাটত দিনটি। কেক কেটে, খাওয়া দাওয়া, গান, গল্পে কেটে যেত পুরোটা দিন।
বাচ্চু জানতেন এলআরবির ছেলেরা তার জন্মদিন ঘিরে কেক কেটে হইচই বাঁধিয়ে দেবে। তাই আগের দিন তিনি অফিস সহকারীকে টাকা দিতেন বাজার করার জন্য। যাতে সবা ইমিলে ভালোমন্দ খেয়ে গান গেয়ে দিনটি উদযাপন করা যায়।

এবি কিচেনে বাচ্চুর জন্মদিন কেমন কাটত তা জানতে গ্লিটজের কথা হয় এলআরবি ব্যান্ডের দুই সদস্য গোলাম রহমান রোমেল ও আবদুল্লাহ আল মাসুদের সঙ্গে। তারা বাচ্চুকে সম্বোধন করতেন ‘বস’ বলে।
ড্রামার রোমেল গ্লিটজকে বলেন, “এবি কিচেন ছিল বসের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। সারাদিন এখানে বিভিন্ন মানুষ আসতেন, সংগীতশিল্পী থেকে সাংবাদিক, উনার কাছের মানুষজনে ভরপুর হয়ে যেত জন্মদিনে। সবাই মিলে কেক কেটে, খাওয়া-দাওয়া করে দিনটা উদযাপন করতাম।”
এবি কিচেনের দেখাশোনা করা কর্মী দেলোয়ার হোসেন দুলুর হাতে টাকা দিয়ে বাজার করে রাখতে বলতেন বাচ্চু।
সেই স্মৃতি মনে করে রোমেল বলেন, "দেলোয়ার হোসেন দুলু নামের একজন ভাই ছিলেন, উনি তো এখন বেঁচে নেই। এবি কিচেন তিনি দেখাশোনা করতেন। জন্মদিনের আগের দিন বস (আইয়ুব বাচ্চু) উনাকে টাকা দিয়ে বলে যেতেন, 'এই ছেলেপুলে তো কালকে আবার কেক টেক নিয়ে এসে হট্টগোল বাঁধাবে, বাজার করে এনে ভালো করে রান্না করিস'।"
"সেদিন পোলাও, মাংস রান্না হত। আমরা আনন্দ করে সন্ধ্যার দিকে কেক কাটতাম। আনন্দ, হইহুল্লোড় করেই দিনটি কাটত।'"

বাচ্চুর সাদাসিধে যাপিত জীবনের কথা তুলে ধরে রোমেল বলেন, বাচ্চু একজন সাদামাটা মানুষ ছিলেন। ফাইভ স্টারে খেতে যেতে হবে, বাইরে থেকে খাবার আনতে হবে এমন কোনো কিছুতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না।
“এবি কিচেনেই রান্না হত, সবাই মিলে দুপুরে খেতাম। বস সবার সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে কথা বলতেন। একসাথে নিয়ে খেতেন। উনার সবচেয়ে প্রিয় খাবার ছিল টমেটো দিয়ে মাখামাখা ডিমের তরকারি। এছাড়াও স্ট্রিট ফুড সিঙ্গারা, পুড়ি, আচার খুব পছন্দ করতেন। দেশের বাইরে গেলে সেই দেশের জনপ্রিয় খাবার চেখে দেখতেন। অনেক উদার মনের এক মানুষ ছিলেন তিনি।"
বাচ্চুর অনুপস্থিতি এখনো মেনে নিতে কষ্ট হয় এই শিল্পীর।
রোমেলের ভাষ্য, “বস এমন এক মিথ, যার মৃত্যু নেই। মনে হয়, উনি আছেন, আমি শুধু কিছুটা দূরে আছি। আবার দেখা হবে। কনসার্টে দূরে গেলে আমার পাশে বসে গল্প করতে করতে যেতেন। এসব কথা মনে হলে খুব খারাপ লাগে।"
রোমেলের কথায়, বাচ্চুর গাওয়া 'সেই তুমি', 'রুপালি গিটার', 'কষ্ট', 'হাসতে দেখো গাইতে দেখো', 'প্রেম তুমি কী', 'পালাতে চাই', 'এখন অনেক রাত', 'ভাঙা মন নিয়ে' এসব গান এখনও অনুরাগীদের হৃদয়ে একইভাবে বাজে, প্রমাণ করে যে ‘বসের’ সুরের জীবন এখনো থেমে যায়নি।
একই ধরনের আবেগ প্রকাশ পেয়েছে ব্যান্ডের আরেক সদস্য আবদুল্লাহ আল মাসুদের কথনেও্।
তিনি বলেন, “জন্মদিন এবি কিচেনে উৎসবমুখরভাবে উদযাপন হত।"
শেষ জন্মদিনটা কেমন ছিল প্রশ্নে মাসুদ বলেন, "যে বছর মারা যায় সেই বছরও একই ভাবে ঘরোয়া আয়োজনে জন্মদিন পালন হয়েছে। সাংবাদিক, তারকারা এসেছেন, শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কাছের মানুষদের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছিল সে আয়োজন।"

জন্মদিনে কোনো নতুন গান করার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন কী না জানতে চাইলে মাসুদ বলেন, "না, উনি শুধু বলতেন এমন কিছু গান করতে চাই, যা আগে কখনো করিনি।"
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গীত ভাণ্ডারে আছে বহু গান। অ্যালবামের মধ্যে এলআরবি থেকে প্রকাশ পেয়েছে এলআরবি (১৯৯২), সুখ (১৯৯৩), তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫), ফেরারী মন (১৯৯৬), স্বপ্ন (১৯৯৬), আমাদের বিস্ময় (১৯৯৮), মন চাইলে মন পাবে (২০০০), অচেনা জীবন (২০০৩), মনে আছে নাকি নেই (২০০৫), স্পর্শ (২০০৮), যুদ্ধ (২০১২)।
একক অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে রক্তগোলাপ (১৯৮৬), ময়না (১৯৮৮), কষ্ট (১৯৯৫), সময় (১৯৯৮), একা (১৯৯৯), প্রেম তুমি কি! (২০০২), দুটি মন (২০০২), কাফেলা (২০০২), প্রেম প্রেমের মতো (২০০৩), পথের গান (২০০৪), ভাটির টানে মাটির গানে (২০০৬), জীবন (২০০৬), সাউন্ড অব সাইলেন্স (২০০৭, ইন্সট্রুমেন্টাল), রিমঝিম বৃষ্টি (২০০৮), বলিনি কখনো (২০০৯), জীবনের গল্প (২০১৫)।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান বাচ্চু। তার প্রয়াণের পর সক্রিয়তা হারিয়েছে এলআরবি।