Published : 18 Nov 2025, 04:15 PM
টম ক্রুজের আসলে অনেক গল্প বলার ছিল।
অনেকটা অলিভার স্টোনের পরিচালনায় ১৯৮৯ সালের সিনেমা ‘বর্ন অন দ্য ফোর্থ অফ জুলাই’য়ের তরুণ রন কোভিকের মত। সিনেমার রন কোভিকের মতই টম ক্রুজ সোমবার নিজেকে ঢেলে দিলেন অস্কারের গভর্নর্স অ্যাওয়ার্ডের আয়োজনে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অস্কারের ট্রফি হাতে নিয়ে।
শুরুতে একটু পুরোনো দিনের কথা বলা যাক।
১৯৮৯ সাল ছিল টম ক্রুজের অভিনয় ক্যারিয়ারে বাঁক পরিবর্তনের বছর। এর আগে তার আলোচিত সিনেমা ছিল ‘রিস্কি বিজনেস’ (১৯৮৩) আর তারপর বক্স অফিসে ‘ফাটাফাটি হিট’ সিনেমা টপ গান (১৯৮৬)।
রিস্কি বিজনেস-এর গল্পে দেখা যায় টিনএজ জোল গুডসান (ক্রুজ) বাড়িতে বেশ কয়েকদিনের জন্য একা। কারণ, গোটা পরিবার তাকে রেখে গেছে হলিডে কাটাতে। সেই সুযোগে জোল বাসায় নিয়ে আসে এক যৌনকর্মীকে। পরের ঘটনা রুপলি পর্দায় দেখাই ভালো।
আর, টপ গান-এর গল্পে টম ক্রুজ হচ্ছেন একজন নেভি পাইলট, পোস্টিং মার্কিন রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ-এ। অসম্ভব দক্ষ এ তরুণকে তার বিভাগ বাছাই করে পাঠায় মার্কিন ফাইটার পাইলটদের জন্য সেরা ট্রেইনিং স্কুল টপ গান-এ। সেখানে গিয়ে প্রথম সন্ধ্যাতেই সে পানশালায় গলা ভেজানোর ফাঁকে প্রেমে পড়ে তার চেয়ে বয়সে বড় এক নারী কেলি ম্যাকগিলিস-এর।
পরদিন ক্লাসে গিয়ে দেখা গেল, এই নারী আসলে টপ গানে তাদের সিভিলিয়ান শিক্ষক!
অসম বয়সী প্রেম, তার সঙ্গে পরিচালক টোনি স্কটের ক্যামেরায় মুন্সিয়ানা।
অনেকেই হয়ত এখুনি তেড়ে আসবেন এই বলে যে, ক্যামেরা তো চালায় ডিওপি–মানে ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি, পরিচালক তো না!
আজ্ঞে! টোনি স্কটের বেলায় ডিওপি যিনিই থাকুন, দু-চার মিনিট সিনেমা দেখলেই বোঝা যায়, পরিচালনায় স্কট মশাই আছেন। বড় ভাই স্যার রিডলি স্কটের সঙ্গে যৌথ পরিচালনাতেও টোনির ওই সিগনেচার মেলে পর্দায়। বিশ্বাস না হয়, তো টোনির ২০০১ সালের ‘স্পাই গেইম’ বা ২০০৪ সালের ‘ম্যান অন ফায়ার’ দেখে নিন।
যাই হোক, এই দুই সিনেমোর কল্যাণে ততদিনে টম ক্রুজ হলিউডে তরুণ ‘সেক্স সিম্বল’। এই সময়েই এল বাঁক পরিবর্তন।
অলিভার স্টোন ডেকে পাঠালেন টম ক্রুজকে। যদিও রন কোভিকের চরিত্রের জন্য এরইমধ্যে তিনি বিবেচনা করে রেখেছেন চার্লি শিন, শন পেন আর নিকোলাস কেজকে।
যারা বছর কয়েক আগের ‘টু অ্যান্ড এ হাফ মেন’ সিরিজের চার্লি শিনের সঙ্গে মেলাতে যাবেন, তারা বেশ বড় রকমের হোঁচট খাবেন সম্ভবত। সে সময়ের চার্লি শিনের পরিচয় মিলবে এই অলিভার স্টোনেরই ১৯৮৬ আর ৮৭ সালের পরপর দুটি সিনেমা ‘প্লাটুন’ আর ‘ওয়াল স্ট্রিট’-এ।
যাই হোক, প্লাটুন দেখে টম ক্রুজের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল অলিভার স্টোনের সিনেমায় কাজ করার; আর অলিভার স্টোন টপ গান দেখে বলেছিলেন ‘ফ্যাসিস্ট মুভি’।
তবে স্টোনের পছন্দ হয়েছিল ক্রুজের ‘গোল্ডেন বয়’ ইমেজ।
ক্রুজের সেই ইমেজ নিয়েই দুশ্চিন্তা ছিল প্রযোজকদের। সেক্স সিম্বল এই ছোকড়া কি ড্রামা ধাঁচের মুভিকে আদৌ টেনে নিতে পারবে?
“আমি এমন একটা ছেলেকে দেখলাম যার সব আছে। ভাবছি, যদি তার জীবনে হঠাৎ বিপর্যয় নামে, ভাগ্য যদি তাকে থামিয়ে দেয়, তাহলে কী হবে? টম ক্রুজের জীবনে এমন কিছু ভুল পথে গেলে কী হতে পারে, সেটা আমার কাছে একটা আকর্ষণীয় প্রশ্ন মনে হয়েছে,” বলেছিলেন অলিভার স্টোন।
দ্যুম করেই তিনি যেন এক চ্যালেঞ্জ ঠেলে দিলেন ক্রুজের সামনে।
সেই চ্যালেঞ্জ যে এই গোল্ডেন বয়ের সত্যিকারের জীবনেই ঘটবে, তা কে ভেবেছিল?
একের পর এক ড্রামা, চ্যালেঞ্জিং চরিত্র, বছরের পর বছর গেল, অথচ অস্কার আসরে শিকে ছিঁড়ল না।

বর্ন অন দ্য ফোর্থ অফ জুলাইয়ের পর ১৯৮৮ সালের ‘রেইন ম্যান’। পরিচালক ব্যারি লেভিনসন। অসম্ভব স্বার্থপর ছোট ভাই টম ক্রুজ বাবার উইলে বঞ্চিত। কারণ, বাবা সব সম্পদ দিয়ে গেছেন এক হাসপাতালে যেখানে অটিজম আছে এমন লোকদের চিকিৎসা হয়। কেন? কারণ, ওই হাসপাতালেই আছে তার আপন বড় ভাই ডাস্টিন হফম্যান, যার কথা জীবনেও শোনেনি টম।
চরিত্রে বরবারই থাকল অস্থির ইমেজ, তবে স্বার্থপরতার জায়গায় একটু একটু করে জায়গা করে নিল ভাতৃভক্তি। এই যে চরিত্রে ধীর পরিবর্তন আনার মুন্সিয়ানা দেখালেন ক্রুজ, তারপরও সেরা অভিনেতার অস্কার নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন ডাস্টিন হফম্যান।
চার বছর পরই আরেক ড্রামা। ১৯৯২ সালের সিনেমা ‘এ ফিউ গুড মেন’।
সারা দুনিয়া নাইন ইলাভেনের পর জেনেছে গুয়ান্তানামো বে’র কথা। পরিচালক রব রেইনার তার এই সিনেমায় সেই মার্কিন ঘাঁটির গল্প শুনিয়েছেন তারও আট বছর আগেই। এই সিনেমাই টম ক্রুজকে দাঁড় করিয়ে দেয় ভীষণরকম কর্তৃত্বপরায়ণ কর্নেল নেথান জোসাপ রূপী জ্যাক নিকলসনের মুখোমুখি।
কেবল জ্যাক নিকলসন! ক্রুজ এ সিনেমায় পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন ডেমি মুর, কেভিন বেকন আর কিউবা গুডিং জুনিয়রের সঙ্গে। অস্কারে সেরা সিনেমাসহ চার নামিনেশন। ফলাফল কী? সিনেমায় জ্যাক নিকলসনের ভাষায় বলতে হয়–‘ইউ কান্ট হ্যান্ডল দ্য ট্রুথ!’
তাতে অবশ্য দমেননি কিউবা গুডিং জুনিয়র। ৯৬ সালের সিনেমা জেরি ম্যাগওয়্যারে জোট বাঁধলেন টম ক্রুজের সঙ্গে। সিনেমায় কিউবা গুডিং হচ্ছেন একজন স্পোর্টস তারকা আর তার ম্যানেজার টম ক্রুজ। এ সিনেমায় কিউবা গুডিং একাধিকবার ম্যানেজার টম ক্রুজকে বলেন–‘শো মি মানি!’
অস্কারে সেরা অভিনেতার অস্কার নমিনেশন টম ক্রুজের। অথচ, টমকে টাকার কথা শুনিয়ে কিউবা সে বছর পার্শ্ব চরিত্রে সেরা অভিনেতার অস্কার বগলদাবা করে চলে গেলেন।
যাই হোক, এই ’৯৬ সালেই দ্বিতীয় বাঁক পরিবর্তন এল টমের সামনে। এ বছর থেকেই শুরু হল ‘মিশন: ইম্পসিবল’ ফ্র্যাঞ্চাইজ। হলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অর্থ আয় করা চলচ্চিত্র সিরিজগুলোর অন্যতম।
এরপরও টম কাজ করেছেন স্ট্যানলি কুবরিকের ‘আইজ ওয়াইড শাট’ (১৯৯৯), পল টমাস এন্ডারসনের ‘ম্যাগনোলিয়া’ (১৯৯৯) বা স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘মাইনরিটি রিপোর্ট’ (২০০২)-এ।
কেউ কেউ বলেন, এর পর থেকেই টম খুব ধীরে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন অর্থ আয় করা স্পাই থ্রিলারে। আর এই আপদমস্তক বাণিজ্যিক সিনেমা দিয়েই টম ২০২২ সালে সম্ভবত একক সিদ্ধান্তে খাদের কিনার থেকে ফিরিয়ে আনলেন হলিউডের চলচ্চিত্রকে।
সে সময় কোভিডকাল শেষ হচ্ছে মাত্র। গোটা পৃথিবীতে চলছে হোম অফিস। আর ফুলে ফেঁপে উঠছে স্ট্রিমিং ব্যবসা। সবার হাতে যেসব সিনেমা ছিল, স্রোতের মত সব যেতে থাকল নেটফ্লিক্সের মত স্ট্রিমিং সেবায়। একমাত্র বেঁকে বসলেন টম ক্রুজ।
সেই ৮৬ সালের টপ গানের সিক্যুয়েল ‘টপ গান: ম্যভেরিক’ তখন প্রায় দেড় বছর ধরে আটকে রেখেছেন তিনি। প্রযোজক, স্টুডিও সবাই যখন বলছে, সিনেমা স্ট্রিমিং সার্ভিসে দিয়ে দিতে, তখন তার জবাব, “আমি সিনেমা বানাই হলে চালানোর জন্য। আমার সিনেমা স্ট্রিমিংয়ে যাবে না।”
২০২২ সালেই কোভিড লকডাউনের পর আমেরিকায় লোকজন ফের সিনেমা হলে গেল টম ক্রুজের সিনেমা দেখতে।
সোমবারের বিশেষ অস্কার সন্ধ্যায় অবশ্য এসবের কিছুই বলেননি টম।
বর্ন অন দ্য ফোর্থ অফ জুলাইয়ের রন কোভিক যেমনটা স্বপ্ন দেখত, একদিন সে স্টেজে উঠবে, সে অসম্ভব দরকারি কিছু কথা বলবে। আর সবাই তার কথা মন দিয়ে শুনবে। নিজেকে সে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে, কারণ তার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে।
বিশেষ অস্কারের মঞ্চে যখন টম ক্রুজ, সবাই তখন দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছেন। ক্রুজ বললেন, “এই মঞ্চ থেকে তোমাদের সবাইকে যে কি সুন্দর দেখাচ্ছে, তোমরা যদি জানতে!”
সিনেমায় যাদের আড়ালে থেকে কাজ করতে হয়, তাদের কথা বললেন অভিনেতা।
“সিনেমা কারো একক মাধ্যম নয়। একজনের অভিনয়ে, একজনের কণ্ঠে এখানে কিছু হয় না। এখানে আমরা সবাই মিলে কাজ করি। এখানে আমি সবার কাছ থেকে শিখেছি।
“কাজেই আজকের সন্ধ্যায় আমি আসলে সবার নাম বলতে পারব না। আপনারা জানেন কারা আমার জীবনে দাগ কেটেছেন, প্রভাব ফেলেছেন, শিখিয়েছেন। নাম বলতে গেলে আমি নিশ্চিত কারো না কারো নাম বাদ পড়ে যাবে।”
এর পরই ক্রুজ বললেন, “পরিচিত, অপরিচিত, কিংবদন্তী- যে কেউ কোনো না কোনোভাবে আমার সঙ্গে কাজ করেছেন, স্টুডিওতে হোক, এডিট রুমে হোক, রেড কার্পেটে বা যে কোনোভাবে- আপনারা কি দয়া করে একটু দাঁড়াবেন? আমি আপনাদের একটু দেখতে চাই।”
সস্নেহ হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। তারপর একে একে অনেকেই।
মঞ্চে অস্কার ট্রফি হাতে তিনি সম্মান তুলে দিলেন সহকর্মীদেরই হাতে।
এই ৬৩ বছর বয়সে এসে সম্ভবত টম ক্রুজ আর অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের আশায় বসে ছিলেন না।
সম্প্রতি তার যত ইন্টারভিউ প্রচারিত হয়েছে, তার সবগুলোতেই তিনি শেয়ার করেছেন সিনেমা বানানোর রোমাঞ্চের কথা, অর্জনের কথা নয়।
আর যাদের মনে হয়েছে, তারা নিজেদের মত করে ক্রুজকে কাছে টেনে নিয়েছেন। মার্কিন নেভি দিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ সিভিলিয়ান অ্যাওয়ার্ড।
সোমবার সন্ধ্যায় কি তিনি মনে করছিলেন সিনেমায় তার পাওয়া প্রথম স্বীকৃতির কথা?
১৯৮৯ সালে টম ক্রুজের হাতে প্রথম ‘পুরস্কার’ তুলে দিয়েছিলেন ভিয়েতনাম ফেরত রন কোভিক, তার যুদ্ধের কৃতিত্ব হিসাবে পাওয়া মেডাল।