১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

৭২ বছরে সাবিনা ইয়াসমিন: ‘ঘটা করে জন্মদিন আমি কখনোই করি না’

সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, "পারিবারিক আয়োজনে খুব সাধারণভাবে দিনটি কাটাব। নিজেদের মত করে সময় কাটাব।"

৭২ বছরে সাবিনা ইয়াসমিন: ‘ঘটা করে জন্মদিন আমি কখনোই করি না’
সাবিনা ইয়াসমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Sep 2026, 03:39 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

জীবনের সাতটি দশক পেরিয়ে ৭২ বছর পূর্ণ করলেন কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন। রোগব্যাধি ও দীর্ঘ চিকিৎসার ধূসর সময় পেরিয়ে তিনি এখন গানে নিয়মিত। 

শুক্রবার এই শিল্পীর জন্মবার্ষিকী। বিশেষ দিনটি ঘিরে সকাল থেকেই তিনি ভক্ত আর সহকর্মীদের শুভেচ্ছায় ভাসছিলেন। বারকয়েক চেষ্টার পর অবশেষে ফোনে পাওয়া গেল বাংলা গানের প্রবাদপ্রতিম এই শিল্পীকে। 

ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত সেই কণ্ঠ। জন্মদিনের শুভেচ্ছা পেয়ে সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন বললেন, "ধন্যবাদ, আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন ভালো থাকি।"

শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এখন ভালো আছি, সুস্থ আছি।"

শিল্পী জানালেন, জন্মদিন ঘিরে তার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই। 

"আমি ঘটা করে জন্মদিনের আয়োজন কখনোই করি না। কাছের মানুষজন চলে যাওয়াতে জন্মদিন নিয়ে তেমন বিশেষ কিছু মনে হয় না। পারিবারিক আয়োজনে খুব সাধারণভাবে দিনটি কাটাব। নিজেদের মত করে সময় কাটাব।"

সাবিনা ইয়াসমিনের জন্ম ১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, ঢাকায়। পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে দশ হাজারের বেশি গান কণ্ঠে তুলেছেন তিনি; তার কণ্ঠ জায়গা করে নিয়েছে কোটি মানুষের হৃদয়ে।

স্টেজ থেকে প্লেব্যাক

মাত্র সাত বছর বয়সে প্রথমবার স্টেজে গান করেন সাবিনা। ১৯৬২ সালে এহতেশাম পরিচালিত 'নতুন সুর' সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম গান করেন।

১৯৬৭ সালে প্রথম প্লেব্যাক করেন আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত 'আগুন নিয়ে খেলা' সিনেমায়।

এরপর আর ডি বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সত্য সাহা, সুবল দাস, আলম খান, বাপ্পি লাহিড়ী, আলী হোসেন, খন্দকার নুরুল আলম, আলাউদ্দিন আলী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মত সুরকারদের সুরে অসংখ্য চলচ্চিত্রের গান কণ্ঠে তুলেছেন সাবিনা। সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছেন কুমার শানু, আশা ভোঁসলে, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীদের।

গীতিকার নয়ীম গহরের লেখা ও সুরকার আজাদ রহমানের সুরে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া দেশাত্মবোধক গান 'জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো' একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। 

নজরুল ইসলাম বাবুর কথায়, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে সাবিনার কণ্ঠে অমর হয়েছে 'সব কটা জানালা খুলে দাও না' গানটি।

কয়েক বছর আগে গ্লিটজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবিনা ইয়াসমিন বলেছিলেন, "ছোট থেকেই গান গাইছি। বাড়িতে একটা সংগীতের পরিবেশ দেখেছি। মা গান গাইছেন, বাবাও খুব ভালো গাইতেন। বোনেরা তো গাইছেন। আম্মার গানের গলা অসম্ভব সুন্দর ছিল এবং তিনি গাইতেনও খুব সুন্দর। এত সুন্দর হারমোনিয়াম বাজাতেন, আমি অবাক হয়ে দেখতাম এবং শুনতাম।

"আমার বড় বোন ফরিদা ইয়াসমীন, ফৌজিয়া খান উচ্চাঙ্গ শিখতেন ওস্তাদ দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে। আমরা তখন বাবার চাকরির সুবাদে নারায়ণগঞ্জ থাকতাম। আমি আর নীলুফার মাঝেমাঝে বসতাম তাদের পাশে। দেখতাম কী শিখছেন।"

সাবিনা ইয়াসমিন

সাবিনা ইয়াসমিন

শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে মায়ের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছিলেন সাবিনা। তিনি বলেন, "গানের ব্যাপারটা আমার ভেতরে ছিলই। আমার মা ও নানা একসঙ্গে গান শিখতেন মুর্শিদাবাদে, ওস্তাদ কাদের বক্সের কাছে। তিনি সে সময়ের নামকরা একজন সংগীতজ্ঞ ও ওস্তাদ ছিলেন। সেই সময় মুসলিম নারীদের জন্য গান-বাজনা চর্চা করা সহজ ছিল না। পরে অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সংসারে ঢুকে গান-বাজনা কিছুই হল না আম্মার।

"আমার মায়ের মনে জেদ ছিল এজন্য, আমাদের অর্থাৎ তার সন্তানদের গান শেখানোর বিষয়ে। আরেকটা ব্যাপার, আম্মা পড়াশোনাতেও অসম্ভব ভালো ছিলেন, সেটাও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। এজন্য আমাদের এ দুটি দিকেই সমান মনোযোগী করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি।"

শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন সাবিনা ইয়াসমিন।

সংগীতে অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে একুশে পদক, ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার এবং ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন এই শিল্পী।