১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সঞ্চয়পত্র বিক্রি ৩ বছর পর ইতিবাচক ধারায়

গত অর্থবছরের আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর সরকারের কোষাগারে জমা ছিল ৪৩৬ কোটি টাকা।

আবদুর রহিম হারমাছি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Aug 2026, 12:56 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

তিন অর্থবছর পর ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি। 

৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বা প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪৩৬ কোটি টাকা। 

এর মানে হচ্ছে, গত অর্থবছরের আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পরও এই পরিমাণ অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা ছিল, যা সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য খাতে খরচ করেছে।

এর আগের তিন অর্থবছরেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা; ২০২৩-২৪ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ২১ হাজার ১২৪ কোটি ও ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা ঋণাত্মক।

অর্থাৎ ওই তিন বছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার যে অর্থ পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি টাকা চলে গেছে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধে।

আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল গ্রাহকদের পরিশোধের পর যেটা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর রোববার সঞ্চয়পত্র বিক্রির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, সব মিলিয়ে গত জুন শেষে সরকারের এ বাবদ ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

২০২২ সালের জুন শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ স্থিতি ছিল তিন লাখ ৬৪ হাজার ১০ কোটি টাকা।

টানা তিন বছর পর সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ পাওয়া প্রসঙ্গে অর্থনীতির বিশ্লেষক ও বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকের চেয়ে বেশি মুনাফা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের কারণে একটি সময় বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হত। সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণের বোঝা কমাতে কয়েক দফায় সুদহার কমানো হয়। সে কারণে গত তিন অর্থবছর সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে; ঋণ পায়নি সরকার।”

ইতিবাচক ধারায় ফেরার কারণ হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এখন দেশের ব্যাংকিং খাতে একেবারে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা দিয়েছে। মানুষ আর ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। শেয়ার বাজারেও মন্দা। সে কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বাড়তি খরচ মিটিয়ে যার কাছে যতটুকু সঞ্চয় থাকছে, তা দিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্র কিনছে।

“সঞ্চয়পত্রে কোনো ঝুঁকি নেই; টাকা মার যাওয়ার শঙ্কা নেই। জরুরি প্রয়োজনে যখন খুশি তখন ভাঙানো যায়। তুলনামূলকভাবে মুনাফার হার এখনও ভালো। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রের দিকেই মানুষ ঝুঁকছে। সে কারণেই গত অর্থবছরে বিক্রি বেড়েছে; অল্প হলেও ঋণ পেয়েছে সরকার।” 

প্রতিবছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে জাতীয় বাজেট পাস করে সরকার। এই ঘাটতি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে মেটানো হয়। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে আছে ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ করার লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার। বিএনপি সরকার সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনে।

১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়েছে বিএনপি সরকার। এই আর্থিক বছরে এ খাত থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছিল তৎকালীন সরকার। নানা ধরনের কড়াকড়ি, সুদের হার কমানো এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ায় মানুষের সঞ্চয়ে টান পড়ায় বিক্রি কমে যাওয়ায় এই খাত থেকে কাঙ্খিত ঋণ পাচ্ছিল না সরকার। সে কারণে ওই বছরের সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্য কমিয়ে ২০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

কিন্তু অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র বিক্রির কোনো টাকা সরকারের হাতে থাকেনি; উল্টো আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের সুদ-আসল পরিশোধ এবং ভাঙ্গানো বাবদ ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা কোষাগার থেকে পরিশোধ করতে হয়।

২০২২-২৩ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৮০ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এর বিপরীতে সুদ-আসল পরিশোধে যায় ৮৪ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এমন ঘটনা ঘটে। এর আগে প্রতি অর্থবছরই সঞ্চয়পত্র বিক্রির ঋণ ছিল ইতিবাচক ধারায়। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৮ হাজার কোটি টাকা। বিক্রি ধারাবাহিক কমতে থাকায় সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

ওই আর্থিক বছরে সব মিলিয়ে ৭৮ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। তার বিপরীতে সুদ-আসল পরিশোধে চলে যায় ৯৯ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বিক্রি করে যে অর্থ আসে, তার চেয়ে ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায় আগের সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। বিক্রি নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। শেষ পর্যন্ত নতুন বিক্রির চেয়ে পুরনো সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধে ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা বেশি চলে যায়। 

অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল আরও বেশি, ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।

আরো পড়ুন

সঞ্চয়পত্রে আগ্রহ আবার বাড়ছে?

সঞ্চয়পত্রের সুদহার অপরিবর্তিত থাকছে