'নীতির ভুলে' একই গ্রুপের কাছে অনেক ব্যাংক: ওয়াহিদ উদ্দিন

ব্যাংক একীভূত করার পদক্ষেপও ‘বোঝা হয়ে’ দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Feb 2024, 03:58 PM
Updated : 10 Feb 2024, 03:58 PM

নীতির ভুলের কারণে একই পরিবার ও গ্রুপের কাছে কয়েকটি ব্যাংকের মালিকানা চলে গিয়েছে মন্তব্য করে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, “ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। অর্থনীতির সঙ্গে এটি জড়িত। এটি এমন জিনিস না যে ভুল করে শিখতে থাকব।’’ 

শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ব্যাংকিং অ্যালমানাক’ এর পঞ্চম প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এমন মন্তব্য করেন। 

আলোচনায় থাকা দুর্বল ব্যাংকের মার্জার বা একীভূতের পদক্ষেপও অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদের পর্যবেক্ষণ ব্যাংকের একীভূতকরণ কোনো সমাধান নয়। 

আলোচনা অনুষ্ঠানে ওয়াহিদ উদ্দিন বলেন, বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে বেসরকারি খাতে ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হয় আশির দশকে। 

তিনি বলেন, ‘‘এই সময়ে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে কেমন ধরনের নীতি কাঠামো করা প্রয়োজন তা ঠিক করা হয়নি। পরবর্তীতে ব্যাংকের পরিচালক কতজন হবেন, মেয়াদ কত, এক পরিবার থেকে কতজন হবেন তা ঠিক করা হয়।’’

ব্যাংক খাতের সংস্কারে ১৯৯৭ সালে গঠিত প্রথম ‘ব্যাংক রিফর্ম কমিটি’ এবং এক দশক পরে গঠিত দ্বিতীয় কমিটিতে থাকা এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘‘১৯৯৭ সালে ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সঙ্গে একটি মিটিং করেছিলাম। সেই সময় তারা নিজেদের ব্যাংক থেকে ৩০ শতাংশের বেশি ঋণ নিয়েছিল। এসব ঋণের অধিকাংশ ছিল খেলাপি। তখন এসব ব্যাংক মালিকেরা বলেছিল-অনেক কষ্ট করে ও অর্থ ব্যয় করে ব্যাংক চালু করেছি, এখন আমরা ঋণ নিতেও পারব না। কষ্ট করেছি তাই ঋণ নিচ্ছি আমরা।” 

তবে সেখান থেকে ব্যাংক খাত বেরিয়ে আসতে পেরেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এখন ৩ শতাংশ ঋণ নিতে পারছেন ব্যাংক মালিকেরা। তাও দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। 

এই ইতিহাস জানা দরকার মনে করিয়ে দিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘‘২০০৩ সালে কয়েকজন বিচারকের সক্রিয় সহযোগিতায় এসব প্রভাবশালী ৬০ পরিচালককে ব্যাংকিং খাত থেকে অপসারণ করা সম্ভব হয়েছিল। ৫-৭ জন পরিচালক ঋণ ফেরত দিয়ে ব্যাংক ছেড়েছিলেন।’’ 

এরপর খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা, ঋণ শ্রেণিকরণ করার সময়, পরিচালকদের মেয়াদ সংক্রান্ত বিধিবিধান আন্তর্জাতিক মানের করা হয় ‘ব্যাংক রিফর্ম কমিটি’র সুপারিশে। তবে গত কয়েক বছরে কিছু ক্ষেত্রে আবার পরিবর্তন আনা হয় ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও পরিচালক এবং বড় ব্যবসায়ীদের চাপে। পরিচালকদের মেয়াদ ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে ৯ বছরে উন্নীত করা হয়। ঋণ শ্রেণিকরণেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়। 

ওয়াহিদ উদ্দিন বলেন, ‘‘ঋণখেলাপির সংজ্ঞা আরও আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে নিয়ে আসার কথা বলা হচ্ছে? ব্যাংকিং বিধিবিধান আন্তর্জাতিক মানের করা হবে। এগুলো তো আগে ছিল, সেগুলো বাদ দেয়া হল। কিন্তু কেন বাদ দেওয়া হল এর ইতিহাসগুলো জানা দরকার।’’ 

ব্যাংকিং খাতে একই ভুল বারবার হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘মুক্ত অর্থনীতির যুগে যেকোন ব্যাংকের শেয়ার কিনে মালিকানা দখল করা যায়। আমরা যে ভুলটি করে ফেলেছি, ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল বা আর্থিক খাতে অ্যান্টিমনোপলি নীতিমালা করিনি। এ কারণে একটি পরিবার শেয়ার কিনে অনেকগুলো ব্যাংকের মালিক হয়ে গিয়েছে। 

‘‘আমরা আর কত ভুল করে করে শিখব, তা জানি না। আগে যে ভুল করা হয়েছিল, যা সংশোধন করা হয়েছিল, সেই ভুল আবার করব?’’ 

চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে আগামী ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলা হয়। 

এ রোডম্যাপ কোনো কাজে আসবে না মন্তব্য করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘‘ব্যাংক খাত অর্থনীতির হৃদপিণ্ডের মতো কাজ করে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। তবে এর আগেও এরকম রোডম্যাপ ছিল। সেই রোডম্যাপ দিয়ে আমরা কতদূর আসলাম, কী কারণে সেখান থেকে বিচ্যুত হলাম, কখন হলাম তার যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। তার যৌক্তিক কারণ না বুঝে আবারও রোডম্যাপ করলে কোনো কাজ হবে না।’’ 

‘মার্জার’ সমাধান নয় 

ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয় ওয়াহিদ উদ্দিন বলেন, ‘‘বড় ব্যাংকে কেলেঙ্কারি হলেও আমানত বাড়ছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকও বুঝতে পারছে-ছোট ছোট ব্যাংকের আর প্রয়োজন নেই। কারণ অর্থনীতিতে এত ব্যাংকের দরকার নেই। 

‘‘বর্তমানে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সাথে মার্জ করে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর দায় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক নেবে না। যদি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটি সম্ভব, কিন্তু তাহলে তো শেষ পর্যন্ত তো ক্ষতির বোঝাটা পুরো অর্থনীতির হবে।’’ 

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখছে। তাতে তো ক্ষতিটা সারাদেশকে নিতে হয়, অর্থনীতিকে নিতে হয়। 

লোকসানে থাকা ব্যাংক কেন অন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক নেবে এমন প্রশ্ন রাখেন সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদও। বলেন, ‘‘একীভূত বা মার্জার যাই বলেন তা সমাধান নয়। এতে ছোটো ব্যাংক আরও উৎসাহিত হবে। তারা ভাববে বড়রা আছে-তারা দায়িত্ব নেবে। আমাদের বেতন-ভাতা, চাকুরি ঠিকই থাকবে।’’ 

তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংক দেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তা অর্থনীতির আলোকে হওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকের মূল কাজ হলো কমপ্লায়েন্স বা নীতিমালা পরিপালন করা। সোজাসাপ্টা বললে হয়-দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নীতিতে চলতে হবে।” 

ব্যাংক সাধারণ কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংক খাতে আগে ঋণ অবলোপন করা হত তিন বছরে। এখন সময় আরও কমিয়ে দুই বছর করা হয়েছে। সুযোগ থাকলে ৬ মাসের মধ্যে ঋণ অবলোপন করে ফেলবে।’’ 

রেমিটেন্স নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যও ভিন্ন হওয়ার কথা তুলে ধরে সাবেক গভর্নর বলেন, ‘‘তথ্যের সঠিকতা থাকতে হবে। তথ্য ম্যানিপুলেট করা ঠিক হবে না। তাতে আর্থিক খাতের বিষয়গুলো এনালাইজ করলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না-তথ্যে ভুল থাকলে। এত বিভ্রাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে ভবিষ্যতে।’’ 

সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘শিক্ষাবিচিত্রা’ ২০১৬ সাল থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বার্ষিক তথ্য নিয়ে ‘ব্যাংকিং অ্যালমানাক’ নামের এ প্রকাশনা প্রকাশ করে আসছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ব্যাংকিং অ্যালমানাক এর পরিচালক আবদার রহমান।