Published : 03 Aug 2026, 08:46 PM
অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা নিয়ে শুরু হলো নতুন অর্থবছর।
২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি করে ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ (৪.৭৩ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা।
এই অঙ্ক গত অর্থবছরের জুলাইয়ের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ কম। প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক থেকে আয় কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশে রপ্তানি আয় ছিল ৪৭৭ কোটি ৬ লাখ ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সোমবার রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানি আয় কমার কারণ জানতে চাইলে নিট পোশাক শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরিস্থিতি তো দেখতেই পারছেন। বিশ্ব পরিস্থিতি অনুকূলে নয়; অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ভালো নয়। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নানা সমস্যা। এ অবস্থায় নেতিবাচক হওয়াটাই স্বাভাবিক।”
তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের যে প্রকট সমস্যা, সেটা কিন্তু জুলাইয়ের আয়ে প্রভাব পড়েনি বলে মনে করেন তিনি।
আগামী মাসগুলোতে কী হবে, এ প্রশ্নের উত্তরে এহসান বলেন, “অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রপ্তানিতে নেতিবাচক ধারা থাকবে। অক্টোবর-নভেম্বর থেকে হয়ত ঘুরে দাঁড়াবে।”
তবে ওভেন পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেছেন ভিন্ন কথা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, গত বছরের জুলাইয়ে ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল; প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
তার মতে, সেই উচ্চ রপ্তানির তুলনায় এই জুলাইয়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার অর্জনকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
“পোশাক শিল্প যখন তীব্র গ্যাস সংকট এবং চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি, সেই সময়ে একক মাসে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার অর্জন একটি ভালো শুরু বলে আমি মনে করি।”
তিনি বলেন, গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে এই জুলাইয়ে বিজিএমইএ সম্পাদিত ইউডি ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এই তথ্য বলছে, রপ্তানিতে চলমান স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
“কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা, বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা দূর করতে পারলে এবং প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা পেলে আগামী মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরে আসবে বলে আমরা আত্মবিশ্বাসী।”
নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর। ৩০ জুন শেষ হওয়া ওই আর্থিক বছরে পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি ১৯ লাখ ডলার, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।
পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছিল ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সার্বিক হিসাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কমেছিল ১৩ শতাংশের মতো।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫ হাজার ৫২০ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে বিএনপি সরকার, যা শতাংশের হিসেবে গত অর্থবছরের মোট আয়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি।
গত বছরের ৭ অগাস্ট থেকে অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয় বাংলাদেশে।
পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য শুল্ক ঘোষণা করেন। তাতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হয় ২০ শতাংশ।
প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কাছাকাছি হওয়ায় দুশ্চিন্তামুক্ত হন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের পণ্যে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আশা করেছিলেন, এর সুফল বাংলাদেশ পাবে। তার লক্ষণও দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই বাড়তি ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছিল।
কিন্তু দেখা যায় উল্টো চিত্র। রপ্তানি না বেড়ে উল্টো কমতে থাকে।
এর মধ্যে ট্রাম্প শুল্ক নিয়ে নতুন জটিলতা দেখা দেয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ক দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন আইনে সব দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পরের দিনই (২১ ফেব্রুয়ারি) তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন।
এরই মধ্যে গত ২৫ জুলাই জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদন যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ১৭টি দেশের জন্য ১০ শতাংশ এবং বাকি দেশগুলোর জন্য সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
একক দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রপ্তানিতে আয়ের ২০ শতাংশের মত আসে এই দেশটি থেকে।
বাংলাদেশের জন্য এই শুল্ক ১০ শতাংশ হওয়ায় খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না জানিয়েছে সরকার।
শুল্ক ঘোষণার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে। ফলে এসব দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
৮২ শতাংশ এসেছে পোশাক থেকে
ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার আয় হয়েছে। এই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, জুলাই মাসে মোট রপ্তানি আয়ের ৮২ দশমিক ২১ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে।
এই মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২১৫ কোটি ৯১লাখ ডলার, যা গত বছরের জুলাই মাসের চেয়ে যা দশমিক ৯০ শতাংশ কম। আর ওভেন পোশাক থেকে আয় কমেছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। আয় এসেছে ১৭২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।
অন্যান্য খাত
অন্যান্য পণ্যের মধ্যে জুলাই মাসে কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ৯ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ। হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি থেকে কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৮১ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ। হোম টেক্সটাইল রপ্তানি থেকে বেড়েছে ১৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ১৯ শতাংশ।