আদরের 'সুখী' হল লালসার বলি

“আমার মেয়েকে যেভাবে মারছে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি তারে দিতে হবে,” বলেন মা।

উত্তম সেন গুপ্তবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 April 2024, 05:26 PM
Updated : 2 April 2024, 05:26 PM

রিকশাচালক বাবা ও ভাঙ্গারি কুড়ানো মায়ের পাঁচ মেয়ের সবার ছোট ছিল মেয়েটি। আদুরে বাচ্চাটিকে সবাই ‘সুখী’ নামে ডাকত। অভাবী দম্পতির সংসারে সাত বছরের নাসরিন ‘সুখী’ হয়ে উঠলেও তার প্রাণ গেল লালসার বলি হয়ে।

স্বামীর রিকশা চালানোর টাকায় ঘরের খরচ না চলায় মা দিনের বেলায় কাজ করেন মানুষের বাসায়। বাড়তি রোজগারের আশায় বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তা ও ডাস্টবিনে কাগজ-বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করেন।

মা যখন রাস্তায় কাগজ-বোতল কুড়াতে থাকেন, তখন সুখী মানুষের কাছে টাকার জন্য আবদার করত। মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানো ছোট্ট শিশুটি প্রাণ হারিয়েছে নির্মম নির্যাতনে।

সোমবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর বিআরটিসি ফলমন্ডি এলাকার ডাস্টবিন থেকে সুখীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ জানিয়েছিল, শিশুটির পায়ু ও যোনিপথে রক্তক্ষরণের চিহ্ন আছে। তাকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা ছিল।

মঙ্গলবার সকালে সুখীর নিথর দেহ যখন পড়ে ছিল হাসপাতালের মর্গে, তখন মা কোলে তিন বছরের আরেকটি শিশু সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল থানায়। নিজের আদরের মেয়ের হত্যাকারীর বিচারের আশায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি জানান, পাঁচ মেয়ে, দুই ছেলের মধ্যে এক মেয়ে ও এক ছেলে যমজ। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, যমজ ছেলে-মেয়ের ছেলেটি প্রায় আড়াই বছর ধরে নিখোঁজ। মেয়েটি কুমিল্লায় নানির কাছে থাকে। সুখী আর তিন বছরের ছোট শিশু সন্তান নিয়ে তিনি থাকেন চট্টগ্রামে।

নিহত শিশুটির ভিন্ন নাম থাকলেও সবাই থাকে ‘সুখী’ নামে ডাকত বলে জানান তার মা।

Also Read: ডাস্টবিনে শিশুর লাশ: ধর্ষণের পর খুন করে পূর্বপরিচিত মীর

Also Read: চট্টগ্রামে শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার মেয়েটা খুব আদুরে। তাই আদর করে তাকে সুখী নামে ডাকি। সবসময় আমার সাথেই থাকত। যতক্ষণ আমি ভাঙ্গারি কুড়িয়ে ফিরে আসব না, ততোক্ষণ আমার জন্য অপেক্ষায় থাকে আমার মেয়েটি। আমি আসার পরই রাতে আমার সাথে বাসায় ফেরে।

“সাধারণ সময়ে আমি রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত রাস্তায় ভাঙ্গারি কুড়াই। এখন রোজার সময় অনেক রাত পর্যন্ত মার্কেট খোলা এবং রাস্তাঘাটে লোকজন থাকে। তাই রাত ২টা/৩টা পর্যন্ত রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভাঙ্গারি খুঁজি।”

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “প্রতিদিনের মত রোববার বিকালে বাসা থেকে বের হয়ে জেনারেল হাসপাতালের গেইটে আসি। আমি প্রতিদিন যা কুড়িয়ে পাই, সেগুলো গেইটের একপাশে রেখে রাতের বেলা বাসায় নিয়ে যাই। আমার সাথে আমার সুখীও সেখানে এসেছিল।

“আমাকে বলছে-‘তুমি এখানে থাইক, আমি মসজিদের দিকে যাচ্ছি টাকা পাই কি না দেখি।’ রাত ১২টার দিকে আমি একটি টংয়ে চা খেয়ে মসজিদের গেইটে গেলাম সুখীর কাছে। তারে বললাম চা খেয়েছি আমারতো টাকা নাই, তুমি আমারে টাকা দিবা? মেয়ে বলে, তার হাতে পাঁচ টাকা আছে, ‘তুমি হাসপাতালের ওখানে থাক। টাকা পাইলে আসতেছি’।”

সন্তান হারানো এই মা বলেন, “পরে আবার সেখানে গিয়ে সুখীকে না দেখে বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞাস করেছিলাম, কেউই তাকে দেখেনি বলছে। ভোর ৪টা পর্যন্ত তাকে খুঁজে কোথাও না পেয়ে বাসায় ফিরে গেছি, কিন্তু সেটি তার বাবাকেও বলিনি।

“সকালে একবার মেরেছিল, সুখীকে পাইনি বললে আবার মারবে, সেই ভয়ে বলিনি। কাল (সোমবার) সকাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় আবার তাকে খুঁজতে শুরু করি। রাতে শুনি আমার মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে ডাস্টবিনে।” 

বস্তাবন্দি লাশ মেলে ডাস্টবিনে

সুখীর প্রাণহানির ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মঙ্গলবার সকালে মীর হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার অতনু চক্রবর্ত্তী জানান, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে মীর হোসেনকে শনাক্ত করা হয়। শিশুটির মা পুলিশকে জানায়, মীর হোসেনও ভাঙ্গারি খোঁজার পেশায় ছিলেন এবং তাকে বিভিন্ন সময়ে বৌবাজার এলাকায় দেখেছেনও।

সেই তথ্যে সারারাত অভিযান চালিয়ে সকাল ৬টার দিকে বৌবাজার এলাকায় মীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সহকারী কমিশনার অতনু বলেন, “‍মীর হোসেন বিকৃত মানসিকতার মানুষ। ২০১২ সালে কুমিল্লার মুরাদনগর এলাকায়ও একই ধরনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। মামলাটিতে সে গ্রেপ্তারও হয়েছিল। মামলাটির বিষয়ে আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি।”

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অতনু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‍ “রোববার রাত ১টার পর মীর হোসেন শিশুটিকে চিপস ও চকলেট কিনে দেওয়ার কথা বলে রিকশা করে কদমতলী আটমাসিং মোড়ে নিয়ে যায়।

“সেখান থেকে তাকে নিয়ে হেঁটে টাইগার পাসের দিকে গিয়ে রাস্তার পাশে পাহাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণ করে। শিশুটি বাধা দেয়ার চেষ্টা করায় তাকে মুখ চেপে শ্বাসরোধ করে খুন করে। পরে একটি বস্তা কুড়িয়ে এনে সেখানে লাশটি রেখে চলে যায়।”

‘ঈদের জামা দিয়ে কী করব’

ঈদে গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা যাওয়ার কথা ছিল সুখীদের।

তার মা আক্ষেপ করে বলছিলেন, “সবার জন্য জামা কাপড় কিনছি, ‍সুখীও পছন্দ করে ঈদের বাজার করল। কিন্তু আমার মেয়ে নাই… এ জামা কী করব?”

ঘটনার রাতে আসামিকে দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “রাত ১২টার দিকে যখন আমি সুখীর কাছে যাই, ওই সসময় রাস্তার বিপরীতে সিটি করপোরেশনের অফিসের সামনে লোকটারেও (মীর হোসেন) আমি দেখছি।

“আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই। আমার মেয়েকে যেভাবে মারছে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি তারে দিতে হবে।”