Published : 21 Oct 2023, 11:58 PM
চট্টগ্রাম আউটার রিং রোডে গাড়ি চলাচল শুরুর প্রায় তিন বছর পর ফিডার রোড-৩ চালু হতে যাচ্ছে।
রোববার বিকেলে এ সড়কে যানবাহন চলাচলের উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ ডলফিন।
ফিডার রোডটি চালু হলে আউটার রিং রোডের সাথে মূল শহরের যোগাযোগ সহজ হবে। পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে চালু হতে যাওয়া বঙ্গবন্ধু টানেলের গাড়ির চাপও আউটার রিং রোডের ওপর কিছুটা কমবে বলে মনে করেন সিডিএ কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প শুরুর আগেই সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে জটিলতা নিরসন করা হলে ফিডার রোডটি চালু করতে এত সময় লাগত না। এতে সড়ক নির্মাণের সুফল মিলত বহু আগেই।
আউটার রিং রোড প্রকল্পে নানা জটিলতায় আরো দুটি ফিডার রোডের কাজই এখনো শুরু করা যায়নি। অন্য দুই সরকারি সংস্থার সাথে ভূমি জটিলতায় আটকে থাকা প্রথম ফিডার রোড এখন অন্য একটি প্রকল্পের অধীনে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সিডিএ।
ফিডার রোড-৩
পতেঙ্গা থেকে সাগরিকা পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধের ওপর চার লেনের ৮৪ ফুট চওড়া আউটার রিং রোডটি ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর পতেঙ্গা প্রান্ত যুক্ত হয়েছে কর্ণফুলীর তলদেশের বঙ্গবন্ধু টানেলের সঙ্গে।
আউটার রিং রোডের দক্ষিণ কাট্টলী রানী রাসমনি ঘাট সংলগ্ন অংশ থেকে সাগরিকার জহুর আহম্মদ চৌধুরী স্টেডিয়াম সংলগ্ন সড়ক পর্যন্ত অংশ ফিডার রোড-৩।
২০২০ সালের অক্টোবরে আউটার রিং রোড গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলেও সড়কটির সাথে নগরীর সংযোগকারী কোনো ফিডার রোড এতদিন ছিল না।
ফিডার রোড না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর ও নগরীর বিভিন্ন কন্টেইনার টার্মিনাল থেকে পণ্যবাহী ভারী যানবাহনকে পতেঙ্গা প্রান্ত হয়ে আউটার রিং রোডে উঠতে হত। পাশাপাশি নগরীতে প্রবেশের জন্য আউটার রিং রোডের শেষ প্রান্তের টোল রোড ধরে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট হয়ে ঘুরে আসতে হত।
দক্ষিণ কাট্টলীর খেজুরতলা ঘাট এলাকায় দুই লেনের টোল রোডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আউটার রিং রোড। তাই এখান থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত টোলে রোডে গাড়ির চাপ থাকে সবসময় বেশি।
ফিডার রোড-৩ এর কাজ শুরুর পর ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই সড়কের রেললাইন অংশে একটি ওভারপাসের (সাগরিকা জহুর আহম্মদ চৌধুরী স্টেডিয়াম সংলগ্ন অংশে) উচ্চতা নিয়ে রেলওয়ের সাথে সিডিএর বিরোধ চলে।
পরে প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) জটিলতা নিরসনে রেলওয়েকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন আবার ফিডার রোডের ওভারপাসের কাজ শুরু হয়।
সিডিএ এর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা অনেক আগেই ফিডার রোড-৩ এর কাজ শুরু করেছিলাম। রেললাইনের উপর ওভারপাসের উচ্চতা জটিলতায় দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ ছিল।
“এখন পুরো কাজ শেষ। রোববার ফিডার রোডটি খুলে দেওয়া হবে। এতে আউটার রিং রোড ও টোল রোডের উপর গাড়ির চাপ কমবে। পাশাপাশি টানেল চালু হলে শহরমুখী যানবাহন এই ফিডার রোড ধরে শহরে এবং বিপরীতমুখী গাড়ি আউটার রিং রোডে যাওয়া-আসা করতে পারবে।”
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ এর চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আউটার রিং রোডের সাথে মূল শহরের যোগাযোগের মাধ্যমই হল এই ফিডার রোডগুলো।
“যে কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনা করা উচিত। সেটা না হলে কাজ শুরুর পর মাঝপথে জটিলতা হয়। কাজ বিলম্বিত হয়। সাধারণ মানুষ প্রকল্পের সুবিধাটা পায় না। নির্ধারিত সময়ে কাজও শেষ হয় না।”
রইল বাকি দুই
শুরুতে আউটার রিং রোডের সাথে নগরীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে আরও দুটি ফিডার রোড নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।
সেগুলো হলো স্টিলমিল নারিকেলতলা-বেড়িবাঁধ (ফিডার রোড-১) এবং বড়পোল-আনন্দবাজার-বেড়িবাঁধ (ফিডার রোড-২)।
প্রকল্প পরিচালক সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, “ফিডার-১ এর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে একটু সমস্যা ছিল। সেটা মিটেছে। দ্রুতই কাজ শুরু করতে পারব আশা করি। আর ফিডার-২ এই প্রকল্পের অধীনে আর হচ্ছে না। অন্য একটি প্রকল্পের অধীনে সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।”
২০১১ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্টের সঙ্গে চুক্তি সই করে সিডিএ। তখন প্রকল্প শেষের সময় ধরা হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। শুরুতে ব্যয় ধরা হয় ৮৫৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা
পরে ২০১৩ সালের অগাস্টে একনেকে অনুমোদনের পর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। জুলাইতে শুরু হয় নির্মাণ কাজ।
গত এক যুগে চার দফায় ডিপিপি সংশোধন করে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্প শেষ করার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। দফায় দফায় খরচ বেড়ে হয় ২ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা।
প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “ফিডার-২ এর প্রস্তাবিত অংশ ওয়াসার প্রকল্পের মধ্যে হওয়ায় জটিলতা দেখা দেয়। ওই এলাকায় সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং স্টেশন। তারা সেটি উল্টো দিকে সরিয়ে নিলে ওয়াসা সুয়ারেজ প্রকল্প সব অবকাঠামো সড়কের একই পাশে রাখতে পারত। তখন ফিডার রোড সরাতে হত না। কিন্তু এই সমাধান হয়নি।
“ফলে এখন ফিডার রোডের দৈর্ঘ্য বাড়াতে হয়েছে। ওভারপাসও করতে হবে। এটা কঠিন সমাধান হল। বিলম্বও হল। সময়মত কাজ শেষ না হলে প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময় এগিয়ে আসে কিন্তু সুফল মানুষ পায় না। জাতীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।”
এই প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ ২ হাজার ৩২ কোটি টাকা এবং জাইকার অর্থায়ন ৬৪৩ কোটি টাকা।
উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করা, নগরীতে যানজট কমানো, আবাসন-বাণিজ্য ও পর্যটন উৎসাহিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি যুক্ত হয়েছে কর্ণফুলী টানেল ও বিমান বন্দর সড়কের সঙ্গে।