বাবার খুনের বিচার পেতে আইনজীবী হন ছেলে

রায় ঘোষণার পর আদালত কক্ষের বাইরে মা খালেদা ইয়াসমিন ছেলে এরশাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন। ছেলের চোখে তখন পানি।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 July 2022, 04:09 PM
Updated : 25 July 2022, 04:09 PM

এলাকার মানুষ বলত উকিল হতে পারলে আদালতে গিয়ে মামলা চালানো যায়; তাই কিশোর এরশাদ ঠিক করেন বাবা হত্যার বিচার পেতে তিনি আইনজীবী হবেন।

বাবার খুনের সময় ছিলেন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। আর নিজে আইনজীবী হন ২০১২ সালে। হত্যার সাড়ে ২২ বছর পর সোমবার রায় হয়েছে চট্টগ্রামের আদালতে।

৪৩ বছর বয়সে খুন হওয়া নুরুল কবিরের সন্তান হোছাইন মোহাম্মদ এরশাদ এখন পুরোদস্তুর আইনজীবী। বাবার হত্যা মামলা পরিচালনা করা আইনজীবীদের মধ্যেও তিনি একজন।

১৯৯৯ সালের ৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর রুস্তমের পাড়া আজলা পুকুরের পাড়ে নুরুল কবিরকে হত্যা করা হয়। পরে ওই ঘটনায় স্ত্রী খালেদা ইয়াসমিন থানায় মামলা করেন।

মামলার তদন্তে হত্যাকারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হন তারই বড় ভাই নুরুল ইসলাম ও তিন ছেলে মো. ওসমান গণি, সরোয়ার কামাল ও আব্বাস উদ্দিন।

সোমবার চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ফেরদৌস ওয়াহিদের আদালত শুনানি শেষে এই চার আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

খুন হওয়ার তিন মাস আগে দেশে ফিরেছিলেন সৌদি আরব প্রবাসী নুরুল কবির। তার চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে হোছাইন মোহাম্মদ এরশাদ তৃতীয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী লোকমান হোসেন চৌধুরী জানান, ভাতিজা ইসমাইলকে বিদেশে নিয়েছিলেন নুরুল কবির। এজন্য এক লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয় জানিয়ে বড় ভাইয়ের কাছে টাকা চেয়েছিলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিবাদ ছিল।

এর জেরেই ভাই ও ভাতিজার হাতে খুন হতে হয় তাকে। তখন মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র এরশাদ। এরপর ২০০৭ সালে তিনি আলিম পাস করেন। ভর্তি হন আইন বিষয়ে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এরশাদ বলেন, “যখন বাবা খুন হন তখন আমার ক্লাস সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আমরা পাঁচ ভাইবোনকে নিয়ে মায়ের সংগ্রাম শুরু হয়। মামলার বাদীও আমার আম্মা।

"তখন এলাকার মানুষ বলত উকিলরা আদালতে গিয়ে মামলা লড়তে পারে। তখনই মনে মনে ভাবি আমি বড় হয়ে উকিল হব। তাহলে বাবার হত্যা মামলা লড়তে পারব। বিচার পাব।”

সোমবার তাদের পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়। রায় ঘোষণার পর এরশাদ বলেন, “ছেলে হয়ে বাবার হত্যা মামলায় শুনানিতে হাজির থাকতে পেরেছি, আজ রায় ঘোষণার দিন উপস্থিত থাকতে পেরে আমি সন্তুষ্ট।”

রায় ঘোষণার পর আদালত কক্ষের বাইরে মা খালেদা ইয়াসমিন ছেলে এরশাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন। ছেলের চোখে তখন পানি।

২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে আইন বিষয়ে ভর্তি হন এরশাদ। সেই থেকে মামলার কার্যক্রমে তিনি আদালতে আসেন। ২০১১ সালে আইনে স্নাতক এবং ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন।

“মূলত বাবা হত্যার বিচারের জন্যই আমি আইনজীবী হয়েছি। আমার তিন ভাই বিদেশে থাকে। আমার জন্যও ভিসা হয়েছিল। কিন্তু আমি যাইনি। আইনজীবী হব, বাবার হত্যার বিচার পাব এই আশায়।”

মামলার এজাহারে বলা হয়, ঘটনার দিন আসামিরা নুরুল কবিরকে মারতে এলে তিনি পালিয়ে ঘরের পেছন দিয়ে পুকুর পাড়ে চলে যান। এসময় আসামি আব্বাস শাবল দিয়ে তার চোখে আঘাত করেন।

এতে তিনি মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। এরপর নুরুল কবির মাটিতে পড়ে গেলে অন্য আসামিরা লাঠি ও রড দিয়ে মারধর করেন। এতে নুরুল কবির মারা যান।

এ ঘটনায় নুরুল কবিরের স্ত্রী খালেদা ইয়াসমিনের মামলায় ২০০০ সালের ২১ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অভিযোগ গঠন হয় ২০০৩ সালের ১৩ জানুয়ারি। এর প্রায় ১৯ বছর পর হল রায়।

জানতে চাইলে আইনজীবী এরশাদ বলেন, “বেশিরভাগ সময়ই সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচারক পদ শূন্য থাকত। এছাড়া আসামিপক্ষ নানাভাবে মামলায় দেরি করানোর চেষ্টা করেছে।

“তারা একজন মিথ্যা সাক্ষীও করিয়েছিল। ওই ব্যক্তি আমার এলাকার হওয়ায় তাকে আমি চিনতাম। পরে এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিলে আদালত ওই সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করেন।”

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ১৭ জন এবং আসামি পক্ষে ৩ জন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয় বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী লোকমান হোসেন চৌধুরী।

রায় ঘোষণার পর নুরুল কবিরের স্ত্রী ৬৩ বছর বয়সী খালেদা ইয়াসমিন সাংবাদিকদের বলেন, “আশা ছিল খুনের বিচার পাব। আজ বিচার পেয়েছি। আমার ছেলে অনেক করেছে। রায়ে আমি খুশি।”

রায়ের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ছেলে এরশাদ বলেন, “আসামিদের মধ্যে আব্বাস উদ্দিন আমার বাবাকে শাবল দিয়ে আঘাত করেছিল। আমরা তার মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছিলাম।

"এখন যে রায় হয়েছে তাতে মোটামুটি সন্তুষ্ট। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে, জানতে পারব কেন আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়নি।”

এই মামলায় অপর দুই আসামি নুরুল ইসলামের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও মেয়ে নাসিমা আক্তার নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাদের খালাস দিয়েছেন।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

আরও খবর

ছোট ভাই খুন: বড় ভাই ও তিন ভাতিজার যাবজ্জীবন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক