১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সুষ্ঠু আসন বণ্টন ও ধর্মীয়-সামাজিক আয়োজনে ভারসাম্য আনতে চাই: পারমিতা চাকমা

আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হলের বাঙালী শিক্ষার্থীরাও ‘তার ওপর ভরসা করেন’ বলে ভাষ্য পারমিতার।

চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Oct 2025, 06:38 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:23 PM

আবাসিক ছাত্রীদের সুষ্ঠু আসন বণ্টন ও বসবাসের সুন্দর স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরিতে কাজ করতে চান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নওয়াব ফয়েজুন্নেসা হলের সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে একক প্রার্থী পারমিতা চাকমা। 

সেইসঙ্গে ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনে ভারসাম্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এই প্রার্থী। 

রাঙামাটির জুরাইছড়ি উপজেলার মেয়ে পারমিতা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী। হলের সংসদ নির্বাচনে একক ভিপি প্রার্থী হওয়ায় এখন তার জয় ঘোষণা এখন কেবল আনুষ্টানিকতা। 

আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হলের বাঙালী শিক্ষার্থীরাও ‘তার ওপর ভরসা করেন’ বলে ভাষ্য পারমিতার।

মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় পারমিতা তার হলের আবাসনসহ নানা রকমের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। এসব নিরসনে পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন তিনি।  

ফয়জেন্নুসা হলে বাঙালি ছাত্রীদের আবাসন সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরে পারমিতা বলেন, “আমাদের হলে আদিবাসীদের পাশাপাশি ৪০ শতাংশ সিট বাঙালি ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ। বাঙালি ছাত্রীদের প্রতিরুমে ৮/১০ জন করে গাদাগাদি করে থাকতে দিয়েছে হল প্রশাসন। তারা বারবার হল কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ আলোচনা করলেও সেটার কোন সুষ্টু সমাধান হয়নি।”

হলের আসন বরাদ্দে সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিতের প্রসঙ্গে পারমিতার ভাষ্য, “আবাসনের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু সমাধানে আসতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে আমার প্রথম প্রধান্য থাকবে বাঙালি ছাত্রীদের আবাসন ব্যবস্থার সুষ্ঠু বন্টন এবং থাকার পরিবেশ সুন্দর করা।” 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন  অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৫ অক্টোবর।

ইতোমধ্যে নির্বাচনের বিভিন্ন প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে প্রশাসন। প্রকাশ করা হয়েছে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকাও। প্রার্থীরা ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রচারও শুরু করেছে। 

সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া চাকসু, ১৪টি হল এবং একটি হোস্টেল সংসদের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন মোট ৯০৮ জন। যাদের মধ্যে ৪১৫ জন হল সংসদের প্রার্থী। 

বিভিন্ন সংগঠনগুলো মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার সময় কিংবা পরে প্যানেলের নাম ঘোষণা করলেও নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল ছিল এর ব্যতিক্রম। 

ছয়টি আদিবাসী সম্প্রদায় চাকমা, মারমা, রাখাইন, ত্রিপুরা, খেয়াং, তঞ্চংগ্যা এবং বাঙালী বড়ুয়া সম্প্রদায়ের এক ছাত্রী মিলে ‘হৃদ্যতার বন্ধন’ নামে একটি প্যানেল ঘোষণা করে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। যা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় হলটির সংসদ নির্বাচনে মাত্র ১৭ জন প্রার্থী। জিএস, এজিএস এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক পদ ছাড়া অন্য কোন পদে প্রার্থী না থাকায় ‘হৃদ্যতার বন্ধন’ প্যানেলের প্রার্থীদের মধ্যে ভিপিসহ ১১টি পদে জয়ী হওয়ার বিষয়টি এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মাত্র। 

ভিপিসহ এত পদে আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের জয় দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ প্রথম বলে মনে করেন অনেকেই। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ছাত্রী হলটির নাম ছিল বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল। বছরের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে হওয়া বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হয়। 

সে ধারাবাহিকতায় হলটির নামকরণ করা হয় নওয়াব ফয়েজুন্নেসা হল।  

নির্মাণের শুরুতে হলটি আদিবাসী এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা থাকলেও পরবর্তীতে সেখানে ৪০ শতাংশ আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাঙালিসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। 

ভাই হারানোর বেদনা নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন পারমিতা

হল সংসদের একক ভিপি প্রার্থী পারমিতা জানালেন, সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফে অপহরণকারীদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তার বড় ভাই সুজন চাকমা। ভাই হারানোর বেদনা নিয়েই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তিনি।

আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হলের বাঙালী শিক্ষার্থীরাও ‘তার ওপর ভরসা করেন’ বলেই তার সাথে আর কেউ প্রার্থী হয়নি বলে মনে করেন পারমিতা।  

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে পারমিতা বলেন, “মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরুর আগে বিভিন্ন সংগঠনের প্যানেল থেকে আমাকে প্রার্থী হতে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথমে নির্বাচনে দাঁড়ানোর কোন ইচ্ছা ছিল না।”

সবার অনুরোধ করার বিষয়টি বাবাকে জানানোর পর তার সম্মতি পেলেও মার রাজি ছিলেন না জানিয়ে পারমিতা বলেন, “এক ভাই, এক বোনের মধ্যে আমি ছোট। গত ১ সেপ্টেম্বর ভাই হারিয়েছি। এখন বাবা-মায়ের একমাত্র অবলম্বন আমি। কোন নির্বাচনি বিরোধে জড়িয়ে যাওয়ার ভয়ে মা রাজি হয়নি। পরে মাকে রাজি করানোর পর যখন মনোনয়ন ফরম কিনেছিলাম তখন গণমাধ্যমে আমার বক্তব্য শুনে এলাকার লোকজনও উৎসাহ দিয়েছিলেন নির্বাচন করার।”

পারমিতার ভাষ্য, হলে কোনো প্রার্থী না থাকায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাঙালি ছাত্রীরাও তাকে অনুরোধ করেছিল প্রার্থী হতে। 

“হলের বাঙালি এবং সব সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের নির্বাচন করতে বলেছিলাম। কিন্তু কেউ কোন রেসপন্স করেনি। তখন আমরা একটা প্যানেল দিয়েছি। এরপর অনেকেই যোগাযোগ করেছিলেন কিন্তু প্রথমে যাদের আমরা ঠিক করেছি তারা কেউ সরে আসেনি।” 

এদিকে দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের হলের শিক্ষার্থীদের আবাসনের পাশাপাশি খাওয়া এবং নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পারমিতা। 

‘অবস্থানগত কারণেও’ হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা নানা রকম সমস্যার মুখোমুখি হয় বলে জানিয়েছেন পারমিতা।

তিনি বলেন, ক্যাম্পসের এক কোণে আমাদের হলের অবস্থান যার কারণে নিরাপত্তার পাশাপাশি যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সমম্যায় পড়তে হয় ছাত্রীদের। সাথে আছে খাবার সমস্যা। 

“ভিপি হিসেবে আমার প্রথম অগ্রাধিকার থাকবে ছাত্রীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। তার মধ্যে অন্যতম খাবার। পাশাপাশি হলটি একপাশে হয়ে যাওয়ায় সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রীতিলতা হলের মোড়ে (শিক্ষার্থীদের কাছে হতাশার মোড় নামে পরিচিত) নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ করতে প্রশাসনকে বলা।” 

হলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ভারসাম্য আনার পরিকল্পনার কথাও বলেছেন ফয়জুন্নেসা হলের ভিপি পদে একক প্রার্থী পারমিতা। 

“আমাদের হলে আদিবাসী এবং বাঙালি-দুই সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছাত্রীরা থাকেন। যার কারণে এখানে ‘কালচারাল ডাইভারসিটি’ আছে। ঈদের সময় হলে যে ধরনের ফেস্ট দেওয়া হয় আমি চেষ্টা করব অন্যান্য 

সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের। যাতে প্রত্যেক ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের ছাত্রীদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় থাকে।” 

এদিকে নিজ প্যানেলের ১১টি পদ ছাড়া বাকী যে তিনটি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেগুলোতেও নিজের প্যানেলের প্রার্থীদের জয় আশা করছেন পারমিতা। 

পুরনো খবর:

চবির ফয়জুন্নেছা হলে ১৩ আদিবাসী ও এক বৌদ্ধ ছাত্রীর 'হৃদ্যতার বন্ধন

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া 'প্রথম খেয়াং' ছাত্রী লড়ছেন হল সংসদ নির্বাচনে

চাকসু নির্বাচন: চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হল সংসদে ২২ প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই