সম্বল নিয়ে ফিরছিলেন বাড়িতে, হারালেন সন্তানকে
সোমবার গভীর রাতে সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণহীন একটি লরির চাপায় নিহত হন পাঁচজন।
ভালোভাবে খেয়ে-পড়ে বাঁচার আশায় নেত্রকোণা থেকে বছর কয়েক আগে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম এসেছিলেন আজহারুল ইসলাম। দিনমজুরির কাজ করে চলত সংসার। মাস কয়েক আগে গ্রামের বাড়িতে দুটি গরু কিনেছিলেন। সেগুলো পালনের মাধ্যমে এলাকায় জীবিকা নির্বাহ করতে সোমবার রাতে বাড়িতে ফিরছিলেন আজহারুল।
মাঝপথে গাড়ি বিকল হলে অন্য বাসে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তিনি। এর মধ্যে ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ লরির চাপায় হারিয়েছেন আট বছর বয়সি সন্তানকে; নিজে ও স্ত্রী হয়েছেন গুরুতর আহত।
সোমবার গভীর রাতে সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাসযাত্রীদের ওপর উঠে যায় ‘নিয়ন্ত্রণ হারানো’ একটি লরি। এতে চাপা পড়ে পাঁচজন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে তিনজন নারী, একজন পুরুষ ও একজন শিশু।
মঙ্গলবার সকালে সন্তানের লাশের অপেক্ষায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্ত্রীসহ বসে ছিলেন আজহার। পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্বজনরা। বিভিন্নজনকে ফোন করছেন, আর কাঁদতে কাঁদতে জানাচ্ছেন নিজের সন্তানের মৃত্যুর খবর।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আজহার যখন বসে ছিলেন, তাঁর পায়ে ছিল ব্যান্ডেজ। পাশে বসে থাকা স্ত্রীর হাতেও ব্যান্ডেজ, পায়ে জখমের চিহ্ন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আজহার জানালেন, রাত আটটার দিকে বাসটি নারিকেলতলা থেকে ছেড়েছিল। পথে দুই দফায় বিকল হয়ে যায়। কুমিরা গিয়ে সড়কের বাম পাশে বাসটি দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন চালক।
তিনি বলেন, “দুই ঘণ্টা ধরে বাসটি ঠিক করতে না পারায় আমাদের জানানো হয়েছিল, আরেকটি বাসে করে নিয়ে যাওয়া হবে। সেজন্য যাত্রীরা বাস থেকে নেমে কেউ সড়কের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, কেউ সড়কের পাশে রাখা গাছের গুঁড়ির ওপর বসে ছিলেন।”
পুলিশ বলছে, শাপলা পরিবহনের একটি বাস যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাস্তার বাম পাশে রাখা হয়েছিল। এ সময় যাত্রীরা বাস থেকে নেমে সড়কের পাশে রাখা গাছের গুঁড়ির ওপর বসেছিলেন। তখন রড উৎপাদনকারী কোম্পানি বিএসআরএমের একটি খালি লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের বাম পাশে গাছের গুঁড়ির ওপর বসে থাকা বাসযাত্রীদের ওপর উঠে যায়।
এতে ঘটনাস্থলে তিনজন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজনসহ মোট পাঁচজন মারা গেছেন।
হাইওয়ে পুলিশ বারআউলিয়া থানার সার্জেন্ট শামীম আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দুর্ঘটনার পরপর লরিটি আটক করা হলেও চালক পালিয়ে গেছেন। ঘটনাস্থলে এক পুরুষ ও দুই নারীসহ তিনজন মারা গেছেন। আর হাসপাতালে মারা গেছেন দুজন।
হাসপাতালে মারা যাওয়া দুজনের মধ্যে একজন আট বছর বয়সি রাকিব এবং অপরজন স্বপ্না আক্তার (৩০)। এর মধ্যে রাকিব আহত আজহারের সন্তান।
সার্জেন্ট শামীম বলেন, “দুপুর পর্যন্ত ঘটনাস্থলে মারা যাওয়া তিন যাত্রীর কোন স্বজনের খোঁজ আমরা পাইনি। তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি টিম থানায় এসেছে। আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।”
সন্তানের সঙ্গে সম্বলও হারালেন আজহার
আজহারুল বলেন, বছর চারেক আগে পরিবার নিয়ে নেত্রকোণা থেকে চট্টগ্রাম এসেছিলেন। দিনমজুরির কাজ করে চলত সংসার। তবে মাস কয়েক আগে বাড়িতে দুটি গরু কিনেছিলেন। তাই পরিবার নিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে যাচ্ছিলেন।
“যাবার সময় ঘরের বিভিন্ন মালামাল ছোট্ট একটি ফ্রিজ, স্ত্রী ও মেয়ের কিছু অলঙ্কার ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার পর কিছুই আর পাইনি।”
হাসপাতালে আজহারের সঙ্গে থাকা তার খালাতো ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে থাকেন গ্রামের বাড়িতে। চট্টগ্রামে তার মেয়ে ও স্ত্রী একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।
“আজাহারের ইচ্ছা ছিল বাড়ি গিয়ে গরু পালন করবেন। আর মেয়েকে বিয়ে দিবেন। আগে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে নিজে চলে যাচ্ছিলেন। কিছুদিন পর তার মেয়েও চলে যাবেন গ্রামে। যাবার সময় সবকিছু নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর টাকা-পয়সা থেকে শুরু করে কোনো মালামাল পাওয়া যায়নি।”
‘দুই লরির পাল্লায় প্রাণ গেল পাঁচজনের’
আজহার বলেন, “দুই ঘণ্টা ধরে আমাদের বাসটি ঠিক করতে না পারায় আরেকটি বাসে করে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ সময় আমরা বাস থেকে নেমে দাঁড়াই। কেউ সড়কের পাশে রাখা গাছের গুঁড়ির ওপর বসে ছিলেন।
“এ সময় দূর থেকে দেখি দুটি লরি একটি আরেকটিকে ওভারটেক করার চেষ্টা করছিল। সেগুলো রাস্তায় সাপের মত দুলছিল। হঠাৎ একটি লরি ওভারটেক করতে গিয়ে এসে আমাদের গায়ের ওপর তুলে দেয়।”
