Published : 14 Aug 2026, 11:36 PM
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পুরনো যে জাহাজে ৯ জনের প্রাণ গেছে, গ্যাসমুক্ত না করেই সেটি কাটার কাজ চলছিল বলে ‘জানতে পেরেছেন’ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
সরকারের একাধিক সংস্থার ভাষ্য, এলএনজি বহনকারী পুরনো জাহাজটিতে তারা হাইড্রোজেন সালফাইড ও কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির নিচের দিকের অংশে সালফার জাতীয় কোনো উপাদান ছিল। ওই উপকরণ পানির সংস্পর্শে আসায় সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস সৃষ্টি হয়। বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্ব বেশি থাকায় ওই জাহাজে কাজ করতে যাওয়া ব্যক্তিরা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন।
ঘটনা তদন্তে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
শিপ ব্রেকিং ও রিসাইক্লিং ইয়ার্ড মালিকদের সংগঠন— বিএসবিআরএর পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসার সব খরচ দেওয়া হবে।
শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে ফায়ার সার্ভিস খবর পায় বেলা ১০টা ৫০ মিনিটে।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, সেটি প্রায় ৮-৯ তলার সমান উঁচু একটি এলএনজি ট্যাংকার।
“এ ধরনের খালি জাহাজে কার্বন গ্যাস জমে যায়। বাতাসের সংস্পর্শে কার্বন ডাই অক্সাইড বা কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের সৃষ্টি হয়। তাই গ্যাসমুক্ত করে তারপর কাটতে হয়। যতটুকু জানতে পেরেছি, গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কাজ করা হচ্ছিল। তাই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা গিয়েও গ্যাসের গন্ধ পেয়েছি। পরে সাগর পাড়ের বাতাস ও জোয়ারের পানিতে গ্যাসের পরিমাণ কিছুটা কমে।”
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি পুরনো জাহাজটিতে গ্যাসের বিষক্রিয়ায় শুক্রবার ৮জনের মৃত্যু হয়।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সহকারী পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের পরিদর্শনে প্রাথমিকভাবে যা পেয়েছি, তাতে মনে হচ্ছে, গ্যাসের বিষক্রিয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। আমরা প্রধানত হাইড্রোজেন সালাইফড গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছি। এছাড়া অন্য গ্যাসও ছিল।
“এলএনজিবাহী পুরনো জাহাজটির কার্গো ট্যাংকার আগেই ডিজমেন্টাল করা হয়েছে। জাহাজের নিচের দিকে কোনো অংশে সালফারবাহী কোনো উপাদান হয়ত ছিল। যা পঁচে সেখানে সালফার জমা হয়েছে। পানির সংস্পর্শে আসার পর সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাসের ঘনত্ব ছিল অনেক বেশি। তাই যারাই শুরুতে সেখানে গিয়েছেন, তারা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।”
তবে প্রকৃতপক্ষে কোন গ্যাসের প্রভাবে এবং কীভাবে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান এস এম সাখাওয়াত হোসেন।
কী ঘটেছিল
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, “জাহাজের তলায় একটি ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। শুক্রবার সকালেও শ্রমিকেরা সেখানে কাজ করে। ট্যাংকটির একটি অংশ কাটার পর কাটা অংশটি খুলতে গেলে শুরুতে দুজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়ে যায়।
“তখন তাদের উদ্ধারে কয়েকজন এগিয়ে গেলে তারাও অচেতন হয়ে পড়েন।”
ওই সময় যারাই জাহাজের কাছাকাছি গিয়েছেন, তারাই গ্যাসের তীব্র গন্ধ পেয়েছেন এবং অচেতন হয়েছেন বলে ভাষ্য ওই শ্রমিকের।
জানতে চাইলে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ বন্ধের দিন। আমাদের কাটার কাজ ছিল না। গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে বলে জানতে পেরেছি।
“গ্যাস লিকেজ দেখতে পেয়ে শিফট ইনচার্জসহ তিনজন কর্মকর্তা এগিয়ে গেলে তারা অসুস্থ হয়ে যান। তাদের দেখে আরো চারজন এগিয়ে গেলে তারাও অচেতন হয়ে পড়েন।”
দুর্ঘটনার পর শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মূল ফটক বন্ধ থাকায় স্থানীয়রা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। ঘণ্টাখানেক পর ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেলে তারা ইয়ার্ডে ভাংচুর চালান।
স্বজনদের আহাজারি
নিহত মনসুরের সম্বন্ধী মহিউদ্দিন চমেক হাসপাতালে হাউমাউ করে কান্না করছিলেন।
তিনি বলেন, “খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছি। আমার বোন জামাই আর তার ভাই ওই ইয়ার্ডে কাজ করত। তাদের পরিবারে এই দুজই উপার্জনের মানুষ।
“এখন তাদের আর কেউ নেই। দুই পরিবারে তিনটি সন্তান আছে। তাদের কী হবে? শুক্রবারও তাদের ইয়ার্ডে ছুটি দিত না। এত কাজ করে কী হলো? আজ তো দুজনই মারা গেল।”
হতাহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসা আঙ্গুর মিয়া বলেন, “শ্রমিকরা জাহাজ কাটার কাজ করছিল। তখন গ্যাস ট্যাংকিতে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণ হয়। নিহতদের মধ্যে আমি দুজনকে চিনি। তারা গাইবান্ধা জেলার মানুষ।”
ওই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি বলে দাবি করেন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কে এম শহীদুল্লাহ।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডটির গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে সার্টিফিকেট আছে। কিন্তু শ্রমিকদের কাজের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি।
“অতীতেও শিপ ইয়ার্ডে নানা দুর্ঘটনায় শ্রমিকরা মারা গেছেন। আজ আবার বিষক্রিয়ায় শ্রমিক মারা গেল। প্রতিজন নিহত শ্রমিককে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
গ্রিন ইয়ার্ডে মৃত্যু
২০০৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) হংকং কনভেনশন অনুসারে, আইএমও’র সদস্য রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং এই খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে পুরনো জাহাজ ভাঙার সময় তা যেন মানুষ ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি না করে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
পরিবেশ সম্মতভাবে জাহাজ ভাঙার জন্য শিপ ইয়ার্ডগুলোকে বিভিন্ন শর্ত পূরণ করে গ্রিন শিপ ইয়ার্ডের সনদ নিতে হয়।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডটি গ্রিন ইয়ার্ড। সব নীতিমাল মেনেই তাদের ওখানে জাহাজ কাটা হয়। যে ঘটনা ঘটেছে সেটা অপ্রত্যাশিত।
“ওই জাহাজে কীভাবে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হলো, তা বিশেষজ্ঞরা তদন্ত না করা পর্যন্ত বলতে পারছি না। নিহতদের পরিবারকে আমরা ক্ষতিপূরণ দিব। আহতদের চিকিৎসার সব দায়িত্ব আমাদের। প্রয়োজনে তাদের ঢাকায় নেওয়া হবে।”
বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইয়ার্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আছেন। শ্রমিকদের মৃত্যুর পর স্থানীয়রা উত্তেজিত হয়ে আছেন। সেটা স্বাভাবিক। এরকম মৃত্যুর কোনো স্বান্তনা হয় না।
“ইতিমধ্যে দুটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তখন বলতে পারব, কী পরিস্থিতি এ ঘটনা ঘটেছে।”
আরো পড়ুন
সীতাকুণ্ডে শিপ ইয়ার্ডে ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯
‘বিষাক্ত গ্যাসে’ ৮ মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেখে ব্যবস্থা: অর্থমন্ত্রী