Published : 02 Dec 2025, 12:22 AM
চট্টগ্রাম কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিহত জাপানি সৈনিকদের দেহাবশেষ উত্তোলনের পর জাপানে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
এসব দেহাবশেষ যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং জাপানে ফিরিয়ে নেয়ার পর তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর বাদশা মিয়া রোডে অবস্থিত চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সালে মধ্যে মারা যাওয়া ১৯ জন জাপানি সৈনিকের মরদেহ একসঙ্গে কবর দেওয়া হয়।
বিশ্জুড়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের জন্য সমাধিক্ষেত্র প্রস্তুত এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে ‘কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন‘ (সিডব্লিউজিসি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কুমিল্লার ময়নামতি ও চট্টগ্রাম মহানগরে দুটি ওয়ার সিমেট্রি রয়েছে, যেগুলো তারা তত্ত্বাবধান করে থাকেন।
সিডব্লিউজিসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার হিল্লোল সাত্তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ১৯ জন সৈনিকের কবর ছিল। সেগুলো একসাথেই কবর ওদয়া হয়েছিল। কবর খুঁড়ে ১৮ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে ১৮টি খুলি ও বেশ কিছু হাড় পাওয়া গেছে।
জাপান সরকারের মনোনীত ১০ জনের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল এ কাজে অংশ নেন জানিয়ে হিল্লোল সাত্তার বলেন, ১৭ থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত ওয়ার সিমেট্রিতে কবর খোঁড়ার কাজ চলে এবং দেহাবশেষ উদ্ধারের পর সেগুলো সংরক্ষণ কর হয়।

সোমবার আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেহাবশেষ উত্তোলন শেষে গত শুক্রবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি চৌকষ দল সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার পর সেগুলো জাপানে পাঠানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অর্ন্তবর্তী সরকারের নির্দেশনায় দেহাবশেষ উত্তোলনের খননকাজে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সহায়তা দেয় সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চল। দেহাবশেষ উত্তোলনে খননকাজে নেতৃত্ব দেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক।
যেভাবে উত্তোলন
কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশনের অধীনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ের সৈনিকদের দুটি সমাধিক্ষেত্র রয়েছে। একটি কুমিল্লার ময়নামতিতে এবং অপরটি চট্টগ্রামের বাদশা মিয়া সড়কে। গত বছরের নভেম্বর ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে কবর দেয়া ২৩ জাপানি সৈনিকের দেহাবশেষ উত্তোলন করে জাপানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সিডব্লিউজিসির কান্ট্রি ম্যানেজার হিল্লোল সাত্তার বলেন, ‘‘২০১৬ সালে জাপানের পার্লামেন্টে বিশ্বযুদ্ধে নিহত তাদের দেশের সৈনিকদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনার একটি আইন পাস করা হয়। সে প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে ময়নামতি সিমেট্রি থেকে জাপানি সৈনিকদের দেহাবশেষ উদ্ধার করে সে দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।‘‘
হিল্লোল সাত্তার বলেন, ওই সময়ে উদ্ধার করা দেহাবশেষগুলো জাপানে নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার পর তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি থেকে ১৮ জাপানি সৈনিকের দেহাবশেষ উত্তোলন করা হয়েছে।
ডিএনএ পরীক্ষায় যাদেরগুলো পরিবারের সদস্যদের সাথে মিলবে সেসব হস্তান্তর করা হবে এবং অন্যগুলো পৃথক একটি মনুমেন্ট তৈরি করা হবে বলে জানা গেছে।

হিল্লোল সাত্তার বলেন, দেহাবশেষ উত্তোলনের জন্য দশ সদস্যের টিম গঠন করা হয়। যেখানে খনন বিশেষজ্ঞ ছাড়াও আর্কিওলজিস্ট, ফরেনসিক এক্সপার্টও ছিলেন। ওই টিমে একজন আমেরিকান আর্কিওলজিস্ট ছিলেন, যার এ বিষয়ে ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ কর্নেল সাজ্জাদ আলী জহিরও ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘‘বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা শুরুতে শাবল দিয়ে তিন ফূটের মতো মাটি খোঁড়ার কাজ করেন। পরবর্তীতে ম্যানুয়ালি সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুটের মতো খোঁড়ার পর মাথার খুলি ও হাড়গোড়ের সন্ধান পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় হাড় এবং মাথার খুলিগুলো সংরক্ষণ করেন।‘‘
খোঁড়ার পর এসব দেহাবশেষ আনুষ্ঠানিকতা শেষে জাপান দূতাবাসের নিকট হস্তান্তর করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এ ওয়ার সিমেট্রি প্রতিষ্ঠা করে।
যুদ্ধ চলাকালীন চট্টগ্রামে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্র বাহিনী চতুর্দশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প স্থাপন করে। সেখানে স্থাপিত হাসপাতালটি ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চালু ছিল। এসময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় যারা মারা গিয়েছিল, তাদের সম্মানার্থে সমাধিসৌধ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
প্রাথমিকভাবে এই সমাধিতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৪০০ মৃতদেহ সমাহিত করা হয়।
বর্তমানে এখানে ৭৩১টি সমাধি রয়েছে, যার মধ্যে ১৭ জনের কোনো পরিচয় মেলেনি। চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রিতে যুক্তরাজ্যের ৩৭৮ জন, কানাডার ২৫ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৯ জন, নিউজিল্যান্ডের ২ জন, অবিভক্ত ভারতের (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) ২১৪ জন, পূর্ব আফ্রিকার ১১ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৯০ জন, মিয়ানমারের ২ জন, নেদারল্যান্ডসের ১ জন ও জাপানের ১৯ জনের সমাধি রয়েছে।
পেশা অনুসারে এই সমাধিস্থলে সৈনিক ৫৪৩ জন, বৈমানিক ১৯৪ জন এবং নাবিক আছেন ১৪ জন। যুদ্ধকালীন সমাধি ছাড়াও বেসামরিক নাগরিকদের ৪টি সমাধি এখানে রয়েছে।