২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

বিজয়ের মাসে শুধু লাল-সবুজের টানেই পথে

দেশের স্বাধীনতা একবারই হয় বলে মনে করেন এই পতাকা বিক্রেতা।

বিজয়ের মাসে শুধু লাল-সবুজের টানেই পথে
রোকনের ভাষ্য, এটা শুধু ব্যবসা নয়, মনের তাগিদও।

মিন্টু চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Dec 2024, 11:59 AM

Updated : 26 Aug 2026, 11:07 AM

বছরের এই একটা মাসে ব্যবসার নির্ধারিত স্থান ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন মোহাম্মদ রোকন, পতাকা বিক্রি করবেন বলে।

রক্ত দিয়ে পাওয়া এই লাল-সবুজ পতাকা তাকে টেনে আনে পথে। 

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলেই শুধু পতাকা ফেরি করেন রোকন। লম্বা বাঁশে বিভিন্ন মাপের পতাকা লাগিয়ে, হাতে ছোট পতাকা, হেড ব্যান্ড ইত্যাদি ব্যাগে নিয়ে ঝুলিয়ে অলিগলি ঘুরে বিক্রি করেন।

বছরের অন্য সময় গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় ফেরি করে বিছানার চাদর ও কাপড় বিক্রি করেন মাদারীপুরের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়েসী রোকন। 

ডিসেম্বর এলেই জাতীয় পতাকা, পতাকার প্রতীক সম্বলিত মাথার ব্যান্ড, ফিতা, ছোট হাত পতাকা, স্টিকার, লোগো নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন; কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের শহর-গ্রামে ছুটে বেড়ান এসব বিক্রির জন্য। 

রোকনের ভাষ্য, এটা শুধু ব্যবসা নয়, মনের তাগিদও। গত তিন বছর ধরে জাতীয় পতাকা বিক্রির এই কাজ করছেন তিনি। 

রোকনের সাথে চট্টগ্রামের মোমিন রোডে কথা হয়। পতাকা বিক্রি, তার জীবিকা এবং তার ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি। 

লম্বা বাঁশে বিভিন্ন মাপের পতাকা লাগিয়ে, হাতে ছোট পতাকা, হেড ব্যান্ড ইত্যাদি ব্যাগে নিয়ে ঝুলিয়ে অলিগলি ঘুরে বিক্রি করেন রোকন।

লম্বা বাঁশে বিভিন্ন মাপের পতাকা লাগিয়ে, হাতে ছোট পতাকা, হেড ব্যান্ড ইত্যাদি ব্যাগে নিয়ে ঝুলিয়ে অলিগলি ঘুরে বিক্রি করেন রোকন।

কেন, কিসের তাগিদে এই লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে ছুটে চলা- এমন প্রশ্নে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই ডিসেম্বর মাসেই দেশ স্বাধীন হইছিল। মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়ে, অনেক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখি নাই, কিন্তু শুনছি। এ বিজয় না হলে পতাকা পেতাম না।

“পতাকা বিক্রি করতে ভালো লাগে বলেই ডিসেম্বর মাস আসলেই বেরিয়ে পড়ি। ডিসেম্বরের ৪-৫ তারিখ থেকে বিজয় দিবস পর্যন্ত পায়ে হেঁটে অলি-গলি ঘুরে জাতীয় পতাকা বেচি। এ কাজ করতে আমার ভালো লাগে।”       

নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করা রোকন প্রতি বছর ডিসেম্বরের শুরুর দিকে পতাকা বিক্রির কাজ শুরু থাকেন। তিন বছর ধরে তিনি এ কাজের সাথে যুক্ত। মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় এ কাজ করছেন।

এ বছর গত ৮ ডিসেম্বর রোকন প্রথম কক্সবাজার যান। সেখানে পতাকা ও অন্যান্য সামগ্রী বেচে যা আয় হয়েছে তা দিয়ে যাওয়া-আসা এবং থাকা-খাওয়ার খরচ মিলিয়ে তেমন লাভ হয়নি তার। 

রোকন বলেন, “এবারে পতাকা বিক্রির পরিমাণ একটু কম। আগে লোকজন পতাকা বেশি কিনত, কিন্তু এবার লোকজন পতাকা বা মাথার ব্যান্ড বেশি কিনতে চাইছেন না।”

গত দুইদিন ধরে রোকন চট্টগ্রামের অলিগলিতে ঘুরছেন। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় তার কাজ চলবে। 

বিভিন্ন মাপের পতাকা ৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। এছাড়া হাত পতাকা সর্বনিম্ন ১০ টাকাতেও তার কাছে মিলছে। 

অন্যবারের চেয়ে এবার পতাকার কেনাবেচা একটু মনে হচ্ছে রোকনের।

অন্যবারের চেয়ে এবার পতাকার কেনাবেচা একটু মনে হচ্ছে রোকনের।

প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে দুই হাজার টাকার পতাকা বিক্রি হয় তার। কেউ একটা পতাকা কিনে খুশি হয়ে দুই-একশ টাকা বাড়তিও দেন বলে জানান তিনি।    

রোকন বলেন, “রাস্তায়, পার্কের বাইরে অথবা কোনো মেলায় গিয়ে হাঁটি, লোকজনের সাথে কথা বলি আর পতাকা বেচি। পতাকার যা দাম বলি, ক্রেতারা খুশি হয়ে যা দেয় তা দিয়েই সন্তুষ্ট। কারও সাথে টাকা নিয়ে জোরাজুরি করি না।

“রক্ত দিয়ে আমাদের দেশ স্বাধীন হইছে। স্বাধীন না হইলে এ পতাকা পেতাম না। সে কারণে কাউরে জোর করি না। আমি ব্যবসার জন্য এখানে আসলেও এটা আমার নেশাও।”

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে জানতে চাইলে এই পতাকা বিক্রেতা বলেন, “পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে আমাদের বিজয় হইছে এই মাসে। আমরা পতাকা পাইছি। এইটা আমার ভালো লাগে।” 

১৬ ডিসেম্বর রাতেই গাজীপুরে ফিরবেন রোকন; আবার শুরু হবে ফেরি করে বেডশিট আর কাপড় বিক্রি।

১৬ ডিসেম্বর রাতেই গাজীপুরে ফিরবেন রোকন; আবার শুরু হবে ফেরি করে বেডশিট আর কাপড় বিক্রি।

সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন তিনি দেখেছেন। তার মতে, বিগত সরকার অন্যায় কাজ করেছে, সে কারণে পরিবর্তন হয়েছে। খারাপ কাজ করেছে তাই ভালোর হাতে দেশ গেছে। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা একবারই হয় বলে মনে করেন এই পতাকা বিক্রেতা।  

ফেরি করে পতাকা বিক্রি শেষ করে ১৬ ডিসেম্বর রাতে গাজীপুর ফিরে যাবেন। ফিরেই আবারও করে বিছানার চাদর  ও কাপড় বিক্রির কাজে লেগে পড়বেন রোকন। 

রোকন তার তিন বছর বয়েসী মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে নিরাপদ ও শান্তিতে বসবাস করবেন, এই প্রত্যাশা করেন বিজয়ের মাসে।