Published : 24 Feb 2026, 09:53 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের ১১৫ প্রার্থীর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ১০ জন; যাদের দুজন ছাড়া অন্যদের ভোট পাওয়ার হার ১ শতাংশের নিচে।
১০ স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে তিনজনই সরাসরি বিএনপি’র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছাড়া অন্যরা জামানত হারিয়েছেন।
জামানত টিকে যাওয়া চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের প্রার্থী লেয়াকত আলী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। অন্য ৯ প্রার্থীর মধ্যে তিনজন ছাড়া অন্যদের ভোটের সংখ্যা হাজারের ঘরে পৌঁছায়নি।
নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬টি আসনের মধ্যে ফল ঘোষণা করা ১৪ আসনের ৬০ শতাংশ প্রার্থী তাদের জামানত হারিয়েছেন। যে দুই আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি, তাদের মধ্যেও বিএনপি-জামায়াত ইসলামী ছাড়া অন্যসব প্রার্থী তাদের জামানত হারাতে বসেছেন।
আর ১৬টি আসনের নিরিখে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়াদের মধ্যে জামায়াত ইসলামী ও তাদের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীও আছেন।
দলীয় পদ-পদবির বাইরে যারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
তাদের ভাষ্য, বড় দলের প্রার্থী হওয়া ছাড়া প্রচলিত নির্বাচনি সংস্কৃতিতে জয়লাভ করা ‘অসম্ভব’। ভোট করতে দরকার টাকা ও জনবলের।
চট্টগ্রামের মতোই পরিণতি সারাদেশের বেশিরভাগ স্বতন্ত্র প্রার্থীর। এবার নির্বাচনে সারাদেশে মোট ২৭৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে ছিলেন; প্রদত্ত ভোটের ৫.৭৯ শতাংশ (প্রায় ৪৪ লাখ) ভোট পেয়েছেন তারা । তাদের মধ্যে জয় পেয়েছেন সাতজন, যারা সবাই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী মনে করেন, জনপ্রিয় ব্যক্তি না থাকা এবং দল দেখে সাধারণ মানুষের ভোট দেওয়ার প্রবণতার কারণেই মূলত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এ ধরনের অবস্থা হয়।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ এবং ত্যাগী ও এলাকাতে কাজ করে—এরকম কোনো ব্যক্তি হয়তো নির্বাচনে আসছেন না। নির্বাচন করার যোগ্য হলে তার ভোট করার অধিকার আছে।”
জেসমিন টুলী বলেন, প্রার্থী নিজেও জানে একটা দলের যে পরিমাণ জনসমর্থন থাকে, নেতাকর্মী থাকে; কিন্তু তার সেটি নাই। তার পরও তারা নির্বাচনে দাঁড়ায়।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হরেক রকম বাধা
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশিরভাগই সবকেন্দ্রে এজেন্ট দেওয়ার মতো লোক খুঁজে পান না। বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুরে এবং প্রার্থীদের কথা থেকেও এ তথ্য ফুটে উঠেছে।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে মোট কেন্দ্র সংখ্যা ১৪০টি। আর ভোট কক্ষের সংখ্যা ছিল ৯০০টি। প্রতিটি কক্ষে প্রার্থীর এজেন্ট থাকার কথা থাকলেও সবমিলিয়ে ২০ জনের মত এজেন্ট দিকে পেরেছেন বলে জানান স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আকতার।
তিনি বলেন, “আমাকে বড় দুই দল থেকে এজেন্ট দেওয়ার কথা বলেছিলেন। আমি রাজি হয়নি। পরে অন্য একটি দলের প্রার্থী আমাকে এজেন্টের বিষয়ে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
“কিন্তু নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে গিয়ে কাউকে দেখিনি। শুনেছি উনার এজেন্টও নাকি দিয়েছেন বড় এক দলের প্রার্থী।”
হাটহাজারী আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইমাম উদ্দিন রিয়াদও সব কক্ষে এজেন্ট দিতে না পারার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমি প্রত্যেক কেন্দ্রে একজন করে মোট ১৪৩ জন এজেন্ট দিয়েছিলাম। তাদের মধ্যে অনেকেই নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন না।
“এজেন্টের মত একটা বড় সমস্যা ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন স্বাক্ষর সম্বলিত সমর্থনপত্র জমা দেওয়া।”
চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া। সিটি করপোরেশনের ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনে তিনি নির্বাচনে এজেন্ট দিতে পেরেছিলেন মাত্র চারটি ওয়ার্ডে।
বড় দলের প্রার্থীদের বিপরীতে গিয়ে নির্বাচনে জয় হওয়া অনেক বেশি ‘কষ্টকর’ মন্তব্য করে জাহাঙ্গীর বলেন, বড় দলগুলোর প্রার্থীদের প্রতি সাধারণ ভোটারদের ‘মাইন্ড সেটাপ’ থাকে। যার কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হতে হলে তাকে অনেক বেশি জনবান্ধব হতে হবে।
জাহাঙ্গীর মনে করেন, কোনো ব্যক্তি অন্তত ১০ বছর সাধারণ জনগণের সঙ্গে মিশে তাদের সহযোগিতা করাসহ নানা ধরনের কাজে সম্পৃক্ত থাকতে পারলেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থায় যেতে পারবেন।
এবারের নির্বাচনে অংশ নিলেও আগামীতে অংশগ্রহণ করার বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে জানান তিনি।
পরিচিতি পেতেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া
ফটিকছড়ি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আকতার মনে করেন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমি জয়ী হব না, জানতাম। এককভাবে কেউ জয়ী হতে পারবে না। কিন্তু জনগণ আমাকে চিনেছে।
“আমিও জনগণের প্রত্যাশা কী, সেটা জেনেছি। সেগুলো প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করব। প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গা চিনেছি। জনগণের জন্য কাজ করতে এটা আমার উপকারে আসবে।”
চট্টগ্রাম-৫ আসনের মোহাম্মদ ইমাম উদ্দিনের ভাষ্য, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
তিনি বলেন, “কীভাবে নির্বাচন হয়, সেটা নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে। আমাকে চেনার মূল ভিত্তি সোশাল মিডিয়া। প্রথমবার হয়তো পরাজয় হয়েছে।
“অনেকে আমাকে উৎসাহ দিচ্ছেন উপজেলা নির্বাচনে আসতে। মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার জায়গায় আমি যেতে পারছি, এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।”
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোটের ফল
আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের ফল নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেনি। তবে আসনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে জিন্নাত আকতার পেয়েছেন ২৭৬ ভোট, আর আহমেদ কবির পেয়েছেন ২৬২ ভোট।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ উপজেলা) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন মাত্র ৩০৮ ভোট।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও সিটি করপোরেশনের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ড) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইমাম উদ্দিন রিয়াদ (ফুটবল) পেয়েছেন ১ হাজার ১২৯ ভোট।
চট্টগ্রাম- ১০ (চসিকের ৮, ১১ থেকে ১৪ ও ২৪ থেকে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড) আসনে স্বতস্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আরমান আলী ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৩৫৭ ভোট।
চট্টগ্রাম- ১১ (সিটি করপোরেশনের ২৭ থেকে ৩০ ও ৩৬ থেকে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া সূর্যমুখী ফুল প্রতীকে পেয়েছেন ১৭৮ ভোট।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ শাখাওয়াত হোসাইন ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ২৪৩ ভোট।
এছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ উপজেলা ও সাতাকানিয়া আংশিক) আসনের দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীই বিএনপি’র মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
তাদের মধ্যে মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী ২০০৮ সালে বিএনপি’র মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে লড়েছিলেন। এবার মনোনয়ন না পেয়ে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। আবার দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা শফিকুল ইসলাম রাহীও ছিলেন প্রার্থী।
মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৩ হাজার ৬৩০ ভোট; আর মোটরসাইকেল প্রতীকে শফিকুল ইসলাম রাহী পেয়েছেন ১ হাজার ১৬৫ ভোট।
চট্টগ্রাম- ১৬ (বাঁশখালী) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী লেয়াকত আলী ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি নির্বাচনে লড়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। লেয়াকত আলী ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৪৯২ ভোট।
পুরানো খবর:
স্বতন্ত্র সাতজনই বিএনপির বিদ্রোহী
চট্টগ্রামে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত
সংসদ নির্বাচন: চট্টগ্রামের ১৮ স্বতন্ত্র প্রার্থীর ১৬ জনই বাদ