নির্বিষ বোলিং ও হজের সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশের আরেকটি হতাশার দিন
বাংলাদেশের বোলার-ফিল্ডারদের হতাশায় ডুবিয়ে ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসে দলকে এগিয়ে নিচ্ছেন কাভেম হজ।
প্রথম সেশনের ৩২তম ওভারে শুরু। এরপর টানা ৩৭ ওভার ধরে চলল ওয়েস্ট ইন্ডিজের রানের চাকা। মাঝের সময়ে কোনো মেডেন ওভারও নিতে পারল না বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে হঠাৎ কেন মেডেনের পরিসংখ্যান, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে! তবে এতেই মূলত পরিষ্কার হয়ে ওঠে, কতটা সাদামাটা ছিল স্বাগতিকদের বোলিং।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে রোববার বাংলাদেশের ছন্নছাড়া বোলিংয়ের সুযোগ দারুণভাবে কাজে লাগান কাভেম হজ, কেভিন উইকহ্যামরা। চমৎকার সেঞ্চুরিতে ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস খেলে দলকে বড় লিড এনে দেন হজ। পঞ্চাশছোঁয়া ইনিংস খেলেন উইকহ্যাম ও ব্র্যান্ডন কিং।
ম্যাচের চার দিন শেষে শক্ত অবস্থানে সফরকারীরাই। ৩০ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে রোববার পর্যন্ত তাদের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ৩৪৫ রান। শেষ দিনে বাংলাদেশের সামনে আসতে পারে চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য।
অথচ আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলার সম্ভাবনা আরও জোরাল করতে সিরিজের দুই টেস্টেই জয় পাওয়া ছিল জরুরি। কিন্তু প্রথম ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর, এখন দ্বিতীয়টিতেও জেতার বাস্তবিক সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ম্যাচের প্রথম দিন একাদশে তৃতীয় পেসার না থাকা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তাসকিন আহমেদ। চতুর্থ দিন ক্যারিবীয়দের দ্বিতীয় ইনিংসে আরও প্রকট হয় আরেকজন পেসার না থাকার অভাব। বাড়তি পেসার থাকলে চমকে দেওয়ার মতো কোনো ডেলিভারিতে হয়তো সুবিধা পেত বাংলাদেশ।
আগের তিন দিনের তুলনায় এদিন ব্যাটিংয়ের জন্যও আরও সহজ হয়ে ওঠে উইকেট। ন্যাড়া উইকেটে তেমন কোনো সুবিধা পাননি স্পিনাররা। পেসারদের বলেও দেখা মেলেনি মুভমেন্টের। ব্যাটিং সহায়ক উইকেট ও কন্ডিশনে সারা দিনে ৭৯ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে ৩৩৮ রান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
প্রথম ইনিংসের তুলনায় অবশ্য দ্বিতীয় ইনিংসে স্পিনারদের টার্নের পরিমাণ ছিল বেশি। কিন্তু কার্যকর উপায়ে তা ব্যবহার করতে পারেননি মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলামরা। ব্যাটিং শৈলীর দারুণ প্রদর্শনীতে অনায়াসে রান করেন হজ, উইকহ্যামরা।
দিনের শুরু থেকে রান রেট চারের ওপর রেখে খেলতে থাকেন কিং ও জশুয়া দা সিলভা। একবারও মনে হয়নি তাদের বেকায়দায় ফেলতে পারে বাংলাদেশের বোলাররা। ওয়ানডে ঘরানার ব্যাটিংয়ে ১৩ ওভারে পূর্ণ হয় উদ্বোধনী জুটির পঞ্চাশ।
কিছুই হচ্ছে না দেখে প্রান্ত বদলের সিদ্ধান্ত নেন তাইজুল। প্রথম ওভারেই পেয়ে যান সাফল্য। অ্যাঙ্গেলে ভেতরে ঢোকা ডেলিভারি ভুল লাইনে ডিফেন্ড করে এলবিডব্লিউ হন ৩৬ রান করা দা সিলভা।
উদ্বোধনী সঙ্গীকে হারানোর কিছুক্ষণ পর ফিফটি তুলে নেন কিং। এরপর তাইজুলের বলে কাভারে তার সহজ ক্যাচ ছেড়ে দেন তাওহিদ হৃদয়। তবে সেটি কাজে লাগাতে পারেননি ক্যারিবীয় ওপেনার। লাঞ্চ বিরতির অল্প সময় বাকি থাকতে রাউন্ড দ্য উইকেটে গিয়ে কিংকে স্লিপে ক্যাচ বানান মিরাজ।
এরপর শুরু হয় উইকহ্যাম ও হজের দাপট। টানা ৩৭ ওভারে কোনো মেডেন না দিয়ে তারা দুজন স্কোরবোর্ডে যোগ করেন ১৬৫ রান। সাবলীল ব্যাটিংয়ে ৭৮ বলে ফিফটি করেন হজ। অভিষেকে দ্বিতীয় ইনিংসেও পঞ্চাশ করা উইকহ্যাম নেন ৬৮ বল।
প্রায় ৪৮ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসেই পঞ্চাশ করার কীর্তি গড়েন উইকহ্যাম। তার আগে সবশেষ ১৯৭৮ সালে অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসেই পঞ্চাশ পেরিয়েছিলেন সিউ শিবনারাইন।
চা বিরতির পর ক্ষণিকের জন্য মনোযোগ সরে যায় উইকহ্যামের। তাতেই ঘটে তার সর্বনাশ। তাইজুলের লেগ স্টাম্পে ঝুলিয়ে করা ডেলিভারি আলতো করে খেলতে গিয়ে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে বসেন ২৩ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। ৭৮ রানে থামে তার ৭ চার ও ২ ছক্কায় সাজানো ইনিংস।
১৬৫ রানের জুটি ভাঙার পর মেডেনের দেখা পায় বাংলাদেশ। তবে উইকেটের দেখা আর মেলেনি। ইতিবাচক ব্যাটিংয়ে দিনের বাকি ১৫ ওভার নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেন হজ ও আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান আমির জাঙ্গু।
এর মাঝে অবশ্য মিরাজের বলে হজের বিপক্ষে একবার এলবিডব্লিউর আবেদনে সাড়া দেন আম্পায়ার। তবে তাৎক্ষণিক রিভিউ নিয়ে সেই সিদ্ধান্ত বদলান ৩৩ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান।
শুরু থেকে দাপুটে ব্যাটিং করে ১১ চার ও ১ ছক্কায় ১৪২ বলে কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন হজ। টেস্টে এটি তার তৃতীয় সেঞ্চুরি। শতক করার পথে ক্যারিয়ারের হাজার রানও পূর্ণ হয় মিডল-অর্ডার এই ব্যাটসম্যানের।
তিন অঙ্ক ছুঁয়েও একই ছন্দে এগিয়েছেন হজ। একের পর এক বাউন্ডারির সাহায্যে নিজের আগের সেরা ১২৩ ছাড়িয়ে আরও বড় ইনিংসের সম্ভাবনা জাগান তিনি। সেঞ্চুরির পর ৪৭ বলে এরই মধ্যে তিনি করেছেন ৪০ রান।
১৪০ রানে অপরাজিত থেকে শেষ দিন নামবেন হজ। জাঙ্গুর সংগ্রহ ২০ রান। অবিচ্ছিন্ন জুটিতে তারা যোগ করেছেন ৬১ রান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ৩৫৬
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৩৮৬
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২য় ইনিংস: (আগের দিন ৭/০) ৮৩ ওভারে ৩৪৫/৩ (কিং ৬১, দা সিলভা ৩৬, হজ ১৪০*, উইকহ্যাম ৭৮, জাঙ্গু ২০*; তাসকিন ১১-০-৫১-০, হাসান ১১-১-৬১-০, তাইজুল ২৯-১-১১৮-২, মিরাজ ২২-৪-৫৮-১, নাঈম ১০-০-৪৮-০)
