দক্ষিণ আফ্রিকান কিংবদন্তি প্রক্টরের চিরবিদায়

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় ২২ হাজার রান করা ও ১৪০০ উইকেট শিকারি অলরাউন্ডার পরে কোচ ও ম্যাচ রেফারি হিসেবেও আলাদা ছাপ রেখেছেন।

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Feb 2024, 04:20 AM
Updated : 18 Feb 2024, 04:27 AM

দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি অলরাউন্ডার ও কোচ মাইক প্রক্টর মারা গেছেন। ডারবানে বাড়ির কাছেই একটি হাসপাতালে হার্টের অস্ত্রোপচারকালীন জটিলতার পর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তার মৃত্যু হয় শনিবার। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। 

প্রক্টরকে মনে করা হয় সর্বকালের সেরা পেস বোলিং অলরাউন্ডারদের একজন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ হিসেবে তিনি আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট। পরে কাজ করেছেন আইসিসি ম্যাচ রেফারি হিসেবেও। ম্যাচ রেফারি হিসেবে তিনি কাজ করে গেছেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেও। 

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রক্টরের সেরাটা দেখতে পায়নি বর্ণবাদের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা নিষিদ্ধ থাকায়। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ৭টি টেস্ট খেলতে পেরেছেন তিনি। সবকটিই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। এর ৬টিতে জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, একটি হয়েছিল ড্র। ওই ৭ টেস্টেই স্রেফ ১৫.০২ গড়ে ৪১ উইকেট নিয়ে নিজের সম্ভাবনার জানান দিয়েছিলেন প্রক্টর। 

বর্ণবৈষম্যের কারণে ১৯৭০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিষিদ্ধ করে আইসিসি। যা পরবর্তী ২১ বছর। তাতে প্রক্টরসহ গ্রায়েম পোলক, ব্যারি রিচার্ডস, এডি বার্লোর মতো ক্রিকেটাররা নিজেদেরকে আর মেলে ধরতে পারেননি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। 

প্রক্টর ছিলেন দুর্দান্ত সিম ও সুইং বোলার। দারুণ গতিময়ও ছিলেন। তার বোলিং অ্যাকশনও নজর কাড়ত প্রথম দেখাতেই। ‘চেস্ট-অন’ অ্যাকশনে বল হাতে ছুটে এসে ডেলিভারি স্ট্রাইডে একটু দ্রুতই বল ছেড়ে দিতে তিনি, যেটি পরে বিখ্যাত হয়ে যায় ‘রং ফুটেড’ অ্যাকশন হিসেবে। বোলিং ক্রিজের বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল কাজে লাগিয়ে ব্য্যাটসম্যানদের বিপাকে ফেলতেও তার জুড়ি ছিল না। ব্যাট  হাতেও তিনি ছিলেন আগ্রাসী, দাপুটে ও কার্যকর। 

স্রেফ ৭টি টেস্ট খেলতে পারার পরও কেন তাকে সর্বকালের সেরাদের একজন মনে করা হয়, সেটি কিছুটা ফুটে উঠবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার পরিসংখ্যানে। ৪০১ ম্যাচ খেলে ১ হাজার ৪১৭ উইকেট তার, ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ৭০ বার, ম্যাচে ১০ উইকেট ১৫ বার। ব্যাট হাতে ৪৮ সেঞ্চুরি ও ১০৯ ফিফটিতে রান করেছেন প্রায় ২২ হাজার, গড় ৩৬.০১। 

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার টানা ৬ ইনিংসে সেঞ্চুরি বিশ্বরেকর্ড টিকে আছে এখনও, যে রেকর্ডে তার সঙ্গী সিবি ফ্রাই ও স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। 

লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ২৭১ ম্যাচে তার রান ৬ হাজার ৬২৪, উইকেট ৩৪৪টি। ক্যারিয়ারের সেই অঙ্কুরেই ১৯৭০ সালে তিনি ছিলেন উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটারদের একজন। 

দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হওয়ার পর ঘরোয়া ক্রিকেটে নাটাল এবং রোডেশিয়ার (এখনকার জিম্বাবুয়ে) হয়ে পারফর্ম করে গেছেন তিনি। তবে নিজের সামর্থ্যের প্রায় সবটুকু দেখিয়ে তিনি আলো ছড়িয়েছেন ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত প্রায় ১৪ মৌসুম খেলেছেন গ্লস্টারশায়ারের হয়ে। তার হাত ধরেই বিংশ শতাব্দিতে প্রথম শিরোপার স্বাদ পেয়েছিল দলটি ১৯৭৩ সালের জিলেট কাপ জিতে। 

এই কাউন্টি দলটির ইতিহাসের সেরাদের একজন মনে করা হয় তাকে। তাদের হয়ে ২০৯ ম্যাচে ৩২ সেঞ্চুরিতে সাড়ে ১৪ হাজার রান করেছেন তিনি, ১৯.৫৬ গড়ে নিয়েছেন ৮৩৩ উইকেট। সেরা ছিল ৩০ রানে ৮ উইকেট। 

তার একটি স্মরণীয় পারফরম্যান্স ছিল একদিনের ম্যাচের আসর বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপের সেমি-ফাইনালে ১৯৭৭ সালে, যখন তিনি পাঁচ বলের মধ্যে চার উইকেট নিয়েছিলেন।

সেই যুগে কাউন্টিতে সবচেয়ে ভীতি জাগানিয়া বোলারদের একজন ছিলেন তিনি। কাউন্টিতেই তার প্রতিভা আর সামর্থ্যের ভালো বিজ্ঞাপন দেখেছেন সেসময়ের বিশ্ব ক্রিকেটের বড় তারকারা, যারা তাকে সর্বকালের সেরাদের কাতারেই রাখেন। 

তার সম্মানে গ্লস্টারশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবে পতাকা অর্ধনমিত থাকবে আগামী কাউন্টি মৌসুম শুরুর আগ পর্যন্ত (৫ এপ্রিল)

১৯৯১ সালে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর তিনিই দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার সময় প্রক্টর পান কোচের দায়িত্ব। তার কোচিংয়েই চমকপ্রদ ক্রিকেট খেলে ১৯৯২ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে উঠে যায় প্রোটিয়ারা। সেখানে তারা বাদ পড়ে যায় সেই সময়কার বিতর্কিত বৃষ্টি আইনে। 

পরে ২০০২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আইসিসির ম্যাচ রেফারির দায়িত্ব পালন করেন ৪৭ টেস্ট, ১৬২ ওয়ানডে ও ১৫ টি-টোয়েন্টিতে। দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচক কমিটির প্রধান হিসেবেও কাজ করেন তিনি কিছুদিন।