৬০ রানকেও ‘ব্যর্থ’ বলা হচ্ছে দেখে ধাক্কা খেয়েছিলেন কোহলি

নিজেকে নতুন করে চেনা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলার জন্য দুঃসময়ের কাছেই কৃতজ্ঞ ভারতের ব্যাটিং গ্রেট।

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Sept 2022, 07:48 AM
Updated : 9 Sept 2022, 07:48 AM

নিজের সাফল্যই যেন ফিরে এসেছিল চাপ হয়ে। তুমুল খ্যাতি হয়ে উঠেছিল বিড়ম্বনা। উঁচু তারে বেধে দেওয়া মানদণ্ডই যেন চেপে বসেছিল বিষম ভার হয়ে। ২২ গজে এমনই অপ্রতিরোধ্য ছিল পথচলা, বিরাট কোহলি নিজেও যেন বুঝতে পারেননি, কোথায় পৌঁছে গেছেন! জগতের নিয়মেই যখন সেই ছুটে চলার গতি একটু কমে গেল, কোহলি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, সফল অন্য অনেকের কাতারে থাকার পরও তাকে বলা হচ্ছে ব্যর্থ!

সেঞ্চুরি খরার লম্বা সময়ে কোহলির অনেক উপলব্ধির মধ্যে ছিল এটিও। অনেকের জন্য যা সাফল্য, তার জন্য সেসবকে গণ্য করা হয়েছে ব্যর্থতা হিসেবে। একটা সময় ২২ গজে ব্যাট হাতে নামলেই ধরা দিত শতক। প্রতি দুই-তিন ইনিংসেই আসত সেঞ্চুরি। সেই তিনি যখন ফিফটির চক্রে আটকা পড়লেন, ব্যর্থতার শোর উঠতে শুরু করল।

সেঞ্চুরি খরার প্রথম দুই বছরে তার ব্যাট পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে নিয়মিতই। ২০১৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের বিপক্ষে কলকাতা টেস্টে সেঞ্চুরির পর গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ৫০ ম্যাচের ২০টিতেই তিনি ফিফটি ছাড়িয়ে যান। অনেক ব্যাটসম্যানের জন্যই এটা বড় সাফল্য। কিন্তু তিনি তো কোহলি, অন্য সবার মতো ৫০-৬০-৭০ রান দিয়ে তাকে বিচার করলে তো চলবে না!

গত ডিসেম্বর থেকে এবার এশিয়া কাপের আগ পর্যন্ত অবশ্য তার ফর্মটা ছিল সত্যিকার অর্থেই প্রশ্নবিদ্ধ। এই সময়ে ২৩ ইনিংসে পঞ্চাশের দেখা পান মোটে চারবার।

এর মধ্যে টি-টোয়েন্টির নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়া, ওয়ানডের অধিনায়কত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া ও আচমকা টেস্ট নেতৃত্বও ছেড়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার তো ছিলই।

অবশেষে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার সময় নেন তিনি। এশিয়া কাপের আগে তিনি জানান, মানসিক অবসাদের সঙ্গে তাকে লড়াই করতে হয়েছে। এক মাস ব্যাট ছুঁয়ে দেখেননি। নিজের মতো সময় কাটিয়ে চনমনে হয়ে ফিরেছেন।

মাঠের ক্রিকেটেও সেটির প্রতিফলন পড়ে। এশিয়া কাপে ৩৫ রানের ইনিংস দিয়ে শুরু। পরের দুই ম্যাচে করেন অপরাজিত ৫৯ ও ৬০। এরপর বহুকাঙ্ক্ষিত সেই সেঞ্চুরি। আফগানিস্তানের বিপক্ষে বৃহস্পতিবার আধ ডজন ছক্কা ও এক ডজন চারে ৬১ বলে ১২২ রানের অপরাজিত ইনিংস। ১ হাজার ২০ দিন ও ৮৩ ইনিংসের অপেক্ষার অবসান ঘটানো তিন অঙ্কের ছোঁয়া।

ম্যাচের পর কোহলি বললেন, এই ম্যাচে তার ব্যাটিং ছাড়িয়ে গেছে নিজের প্রত্যাশাকেও। পাশাপাশি সেঞ্চুরি খরার সেই সময়টার কথাও মনে করলেন তিনি।

“আজকে যা হয়েছে, তা গত কয়েক ম্যাচের ধারাবাহিকতারই ফসল। তবে সত্যি বলতে, আজকে আমি নিজেকে ছাড়িয়ে গেছি এবং নিজেকেও চমকে দিয়েছি।”

“আমাকে বিস্মিত করেছে যেটা, সত্যি বলতে, তা হলো আমার ৬০ রানের ইনিংসও ছিল যেন ব্যর্থতা! আমার জন্য এটা ছিল ‘শকিং।’ আমার মনে হচ্ছিল, ‘ব্যাটিং তো ভালোই করছি, অবদানও রাখছি।’ কিন্তু দেখছিলাম, এটাও যথেষ্ট হচ্ছিল না।”

তবে ওসব নিয়ে কারও দিকে আঙুল তুলছেন না কোহলি। ক্রিকেট থেকে দূরে থাকার সময়টায় নিজেকে নতুন করে চিনেছেন তিনি। সেঞ্চুরি করে ম্যাচের মাঝ বিরতির সময়ই টিভিতে কথোপকথনে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন স্ত্রী আনুশকা শর্মার প্রতি। ম্যাচের পরও আবার তিনি আলাদা করে বললেন, দুঃসময়ে তাকে কতটা আগলে রেখেছেন স্ত্রী।

“খেলা থেকে দূরে থাকার সময়টা আমাকে খুব ভালোভাবে সুযোগ করে দিয়েছে নিজেকে নিয়ে ভাবার। স্পেশাল একজন মানুষের কথা বলেছি আমি, সবসময় যে আমার পাশে থেকেছে, আনুশকা। কারণ এই কয়েক মাসে আমার সত্যিকারের কাঁচা অবস্থাটা কাছ থেকে দেখেছে সে। সত্যি বলতে, সময়টা অনেক কঠিন ছিল। সে আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে, পরামর্শ দিয়েছে, পথ দেখিয়েছে।”

“কাউকে নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। অতীতে স্রষ্টা আমাকে অনেক ভালো সময় উপহার দিয়েছেন। এজন্যই এই অবস্থানে আসতে পেরেছি যে এত কথা হয়েছে। আমার এটা স্বীকার করে নিতে কোনো অস্বস্তিই নেই যে, স্রষ্টা আমাদের ভাগ্যে সবকিছু লিখে রেখেছেন এবং আমাদের স্রেফ কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হবে।”

নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার সময়টায় পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি নিজেই। তবে টিম ম্যানেজমেন্টও যে প্রবলভাবে তার পাশে ছিল, এটা জানাতেও ভুললেন না।

“আমি মৌলিকত্বে ফিরে গেছি। সময় নিয়েছি, পরিশ্রম করেছি, তরতাজা হয়ে ফিরেছি। দলের আবহের কথাও বলতে হবে। টিম ম্যানেজমেন্ট এই সময়টায় দারুণভাবে যোগাযোগ করেছে আমার সঙ্গে, আমাকে রিল্যাক্সড রেখেছে। দলে ফিরে আসার পরও অনেক কথা তারা বলেনি। স্রেফ বলেছে যে, ‘উপভোগ করো।’ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, যখন ভালো খেলছি, তখন কী করতে পারি দলের জন্য। আগেও অনেকবার করেছি। ব্যাপারটা স্রেফ ছিল নিজেকে ফিরে পাওয়া।”

“খুব রিল্যাক্সড হয়ে আমি সিস্টেমে ফিরেছি। কাউকে কিছু প্রমাণে মরিয়া ছিলাম না। সেটা সত্যিকার অর্থেই, এমন ভাবনা থেকে নয় যে, ‘আমার সব প্রমাণ করা শেষ হয়ে গেছে।’ স্রেফ খেলাটাকে উপভোগ করতে চেয়েছি। এত বছর ধরে যা অর্জন করেছি, সেটা নিয়ে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, মাটিতে পা রেখে পরিশ্রম করে যাওয়া এবং মাঠে নেমে আবার সবকিছু শুরু করা। এই মানসিকতা নিয়েই ফিরে এসেছি।”

কোহলির সেঞ্চুরি না পাওয়া এবং এই বছর ছন্দে না থাকার সময়টায় অনেক কথা হয়েছে তার টেকনিক নিয়েও। কিছু জায়গা নড়ে গেছে বা আগের জায়গা থেকে তিনি সরে এসেছেন বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা অনেক মতামত দিয়েছেন। তবে কোহলি বললেন, টেকনিকে কোনো বদল তিনি আনেননি। তার লড়াই ছিল স্রেফ নিজের মানসিক অবস্থার সঙ্গে।

“নাথিং… কোনো টেকনিক্যাল বদল করিনি। অনেক পরামর্শ, উপদেশ দেওয়া হয়েছে আমাকে। অনেকের অনেক কথা শুনেছি। লোকে বলাবলি করেছে, ‘আমি এটা ভুল করছি, ওটা ঠিক হচ্ছে না।’ নিজের সেরা সময়ের সব ভিডিও দেখেছি আমি। সেই একই ইনিশিয়াল মুভমেন্ট, একইভাবে বলের কাছে যাওয়া, সব একইরকম ছিল।”

“স্রেফ নিজের মাথার ভেতর যা চলছিল, সেটাই কাউকে বোঝাতে পারছিলাম না। দিনশেষে, একজন মানুষ নিজেই কেবল বুঝতে পারে সে কোথায় দাঁড়িয়ে এবং তার কী করা উচিত। লোকে কথা বলবেই, তাদের অধিকার আছে মতামত দেওয়ার। তবে কেউ নিজে কেমন বোধ করছে, তা অন্য কেউই বুঝবে না। আমি খুব ভিন্নভাবে এটা অনুধাবন করতে পেরেছি গত কয়েক মাসে।”

পেছনে ফেলে আসা দুঃসময়টুকু নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই কোহলির। বরং ওই সময়টা তার জন্য প্রচণ্ড জরুরি ছিল বলেই মনে করেন সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন।

“এই সময়টা সত্যি বলতে, আমার জীবনের খুবই স্পেশাল সময়। সময়টার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। শুধু ক্রিকেটে নয়, নিজের জীবনে সামনে এগোনোর জন্য হলেও আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো প্রয়োজন ছিল। ওই সময়টার জন্য তাই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি যে নিজের মতো করে ভাবতে পেরেছি, মেনে নিতে শিখেছি, একদম তলানিতে চলে যাওয়ার অনুভূতি পেয়েছি এবং আস্তে আস্তে ওপরে ওঠার পথ খুঁজে নিয়েছি। এখন স্রেফ উপভোগ করছি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক