অভিষেক মৌসুমে মামুনের বাজিমাত, বোলিংয়ে সুমন-নাহিদের চমক

রংপুরকে চ্যাম্পিয়ন করার পথে ব্যাটে-বলে সমান অবদান রেখে আসর সেরা ১৮ বছর বয়সী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

শাহাদাৎ আহমেদ ভূঁইয়াবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Nov 2022, 07:03 AM
Updated : 18 Nov 2022, 07:03 AM

রংপুর বিভাগের দ্বিতীয় শিরোপা জয় দিয়ে শেষ হয়েছে জাতীয় ক্রিকেট লিগের ২৪তম আসর। দলকে চ্যাম্পিয়ন করে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। টুর্নামেন্টে ব্যাট হাতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক রানার্সআপ সিলেট বিভাগের অধিনায়ক জাকির হাসান। বোলিংয়ে চমক দেখিয়েছেন ঢাকার সুমন খান ও রাজশাহীর নাহিদ রানা।

সিলেটের বিপক্ষে রংপুরের শেষ ম্যাচটি একপ্রকার ‘ফাইনালে’ রূপ নিয়েছিল। ড্র করলেও হতো রংপুরের। তবে হেরে গেলে শিরোপা চলে যেত সিলেটের ঘরে। ৫ উইকেটে জিতে নিজেদের কাজ সেরেছে রংপুর। ব্যাট হাতে দুই ইনিংসে ২৩ রান ও বোলিংয়ে ৬ উইকেট নিয়ে শেষ রাউন্ডে ম্যাচ সেরার পুরস্কারও জিতেছেন মামুন।

টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন প্রাইজমানি হিসেবে ৩০ লাখ টাকা পেয়েছে আকবর আলির রংপুর। দ্বিতীয় স্তরের সেরা দল ঢাকা মেট্রো পেয়েছে ৭ লাখ টাকা। আসরের সেরা খেলোয়াড় মামুন পেয়েছেন ১ লাখ টাকা। সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক জাকির (৪৪২) ও সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি সুমন (৩৩)।

অভিষেকে দ্যুতিময় মামুন 

এবারের জাতীয় লিগ দিয়ে স্বীকৃত ক্রিকেটে নাম লিখিয়েছেন রংপুরের ব্যাটিং অলরাউন্ডার মামুন। ডিউক বলের কঠিন চ্যালেঞ্জ সামলে তৃতীয় রাউন্ডের ম্যাচে আসরের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেন তিনি। সিলেটের বিপক্ষে খেলেন ১৬ চার ও ১৩ ছয়ে ২১০ রানের অপরাজিত ইনিংস।

সব মিলিয়ে ৯ ইনিংসে ৪৬.৫৭ গড়ে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩২৬ রান করেছেন ১৮ বছর বয়সী বাঁহাতি এ ওপেনার। এর সঙ্গে ডানহাতি মিডিয়াম পেসে বল হাতে স্রেফ ১২.২৭ গড়ে মামুনের শিকার ১১ উইকেট। সিলেটের বিপক্ষে শেষ রাউন্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে পাওয়া ৪০ রানে ৪ উইকেট তার সেরা বোলিং।

বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে শেষ ম্যাচ খেলেই চলে গেছেন রংপুরে নিজের বাড়িতে। সেখান থেকেই মুঠোফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানালেন নিজের অনুভূতির কথা।

“সেরা খেলোয়াড় হয়েছি, খুব ভালো লাগছে। সবাই অনেক প্রশংসা করেছে, বাহবা দিয়েছে। দলের বড় ভাইরা, এলাকার মানুষরা সবাই আমাকে নিয়ে খুশি। এসব দেখে খুব ভালো লেগেছে। আমি চেষ্টা করেছি দলকে যথাসম্ভব সাপোর্ট করার, নিজে ভালো খেলার এবং দলের জন্য ভালোটা করার। আল্লাহ্‌র রহমতে করতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ্‌।” 

মূল কাজ ব্যাটিং হলেও ব্রেক থ্রুর খোঁজে প্রায়ই মামুনের হাতে বল তুলে দিয়েছেন আকবর। প্রথম স্পেলেই উইকেট নিয়ে অধিনায়কের আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন কয়েকবার। নিজের বোলিং নিয়েও তৃপ্তির কথা বললেন মামুন। 

“আমার বোলিংয়ের ব্যাপারে আকবর ভাই সবসময় আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। উনার অধিনায়কত্বে রংপুরের স্থানীয় ম্যাচ খেলেছি অনেক। প্রস্তুতি ম্যাচে একটা হ্যাটট্রিক করেছিলাম। তো উনাদের বিশ্বাস ছিল আমি পারব। আমিও যখন প্রয়োজন পড়েছে উইকেট নিতে পেরেছি। যা দলের খুব কাজে লেগেছে।”

আসরের চমক তরুণ নাহিদ রানা 

জাতীয় লিগে এবার সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন রাজশাহী বিভাগের ২০ বছর বয়সী পেসার নাহিদ রানা। গতির ঝড়ে প্রায় প্রতি ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের মাথাব্যথার কারণ হয়েছেন চাপাইনবাবগঞ্জের এই তরুণ। ডিউক বলের বাড়তি বাউন্স দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। 

রাজশাহী বিভাগের হয়ে জাতীয় লিগের গত আসরে অভিষেক হয়েছিল নাহিদের। সেবার দুই ম্যাচ খেলে পেয়েছিলেন ৫টি উইকেট। এবার পুরো আসরে সুযোগ পেয়ে সামর্থ্যের জানান দিলেন তিনি। ছয় ম্যাচে তিনবার ইনিংসে ৫ উইকেটসহ আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২ উইকেট নিয়েছেন দীর্ঘদেহী এ পেসার।

নিজের প্রক্রিয়া ঠিক রেখে বোলিংয়ে সাফল্য পাওয়ার কথা বলেছেন নাহিদ। 

“প্রতি ম্যাচেই আমি নিজের প্রক্রিয়া ঠিক রেখে বোলিংয়ের চেষ্টা করেছি। কখনও উইকেট পেয়েছি, কখনও পাইনি। তবে সবগুলো ম্যাচে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বোলিং করে গেছি। আমার শক্তির জায়গা গুড লেংথে টানা বল করে যাওয়া। আলহামদুলিল্লাহ্‌ আমি যেভাবে করতে চেয়েছি সেটা করতে পেরেছি।”

পরিবারের শর্ত ছিল মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগে ভর্তি হওয়া যাবে না ক্রিকেট অনুশীলনে। তাই নিজের ইচ্ছে থাকার পরও স্কুলে থাকতে ক্রিকেট বলের কোনো পাঠ নিতে পারেননি নাহিদ। ফলে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটেরও কোন অভিজ্ঞতা নেই তার। ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর রাজশাহীর ক্লেমন ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। 

ওই অ্যাকাডেমির কোচ আলমগীর কবিরের অধীনে ক্রিকেট বলে হাতেখড়ি হয় নাহিদের। জাতীয় লিগে আলো ছড়ানোর পরও ক্যারিয়ারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিজের কোচের পরামর্শকে শিরোধার্য হিসেবে রাখার কথা বলেছেন নাহিদ। এখনই বড় কোনো লক্ষ্যের কথা না বলে বরং পারফর্ম করার দিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। 

“আমি আসলে বেশি চিন্তা করতে চাই না। এখন যদি বলি দুই বছরের মধ্যে জাতীয় দলে খেলব, বলে দিলেই তো হবে না। প্রতিনিয়ত নিজের উন্নতি করে যেতে হবে, পারফর্ম করতে হবে। আমি যদি টানা ভালো বোলিং করে যেতে পারি, তাহলে নির্বাচক যারা আছেন, তারা ভাববেন আমি যোগ্য। বারবার মুখে বলতে থাকলে কিছু হবে না।”

ধারাবাহিক ব্যাটিংয়ে রানের শীর্ষে জাকির 

২০২১ সালে ঘরোয়া ক্রিকেটে এক পঞ্জিকাবর্ষে করেছিলেন এক হাজারের বেশি রান। ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ২০২২ সালেও হাজার পেরিয়েছেন সিলেট বিভাগের অধিনায়ক জাকির হাসান। মার্চ-এপ্রিলে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৬৩৬ রানের পর এবার জাতীয় লিগে তিনি করেছেন ৪৪২ রান। 

আসরের চতুর্থ রাউন্ডের ম্যাচে চট্টগ্রামের বিপক্ষে ২১৩ রানের ইনিংস খেলেন জাকির। যা এবারের জাতীয় লিগে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। সবমিলিয়ে ৮ ইনিংসে ৫৫.২৫ গড়ে ৪৪২ রান করেছেন ২৪ বছর বয়সী বাঁহাতি এই কিপার-ব্যাটসম্যান। আর কেউ আসরে চারশ রান করতে পারেনি।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৯৫ রান করেছেন রাজশাহীর জহুরুল ইসলাম। এছাড়া আসরে সাড়ে তিনশর বেশি রান করেছেন সিলেট বিভাগের তৌফিক খান তুষার (৩৮৯), বরিশাল বিভাগের সালমান হোসেন ইমন (৩৮৯) ও ঢাকা বিভাগের আব্দুল মজিদ (৩৬৩)। 

এবারের জাতীয় লিগের আগে প্রথম শ্রেণির সবশেষ টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগেও দারুণ ছন্দে ছিলেন জাকির। সেবার পাঁচ ইনিংসে তিন সেঞ্চুরির সৌজন্য ৯৯ গড়ে করেন ৩৯৬ রান। বিসিএলের আসন্ন মৌসুমে বিসিবি দক্ষিণাঞ্চলের হয়ে খেলতে দেখা যাবে তাকে। প্লেয়ার্স ড্রাফটে তাকে ধরে রেখেছে দলটি।

বোলিংয়ের মুকুট সুমনের মাথায় 

প্রথম রাউন্ডে রংপুর বিভাগকে প্রায় একাই ধসিয়ে দেন ঢাকা বিভাগের ডানহাতি পেসার সুমন খান। প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে সাজঘরে ফেরান ৪ ব্যাটসম্যানকে। ঢাকা ম্যাচ জেতে ইনিংস ব্যবধানে। 

সুমন পুরো আসরজুড়ে দেখিয়েছেন শুরুর ম্যাচের সেই বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা। ডিউক বল পেয়ে নিজের শক্তির জায়গা সুইংকে আরও শৈল্পিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন ২২ বছর বয়সী এ পেসার। প্রায় প্রতি ম্যাচেই চকচকে ডিউক হাতে নিয়ে প্রথম স্পেলে নান্দনিক সুইং বোলিংয়ের পসরা সাজিয়েছেন তিনি।

সবমিলিয়ে লিগের ছয় ম্যাচে দুইবার ইনিংসে ৫ উইকেট ও তিনবার ইনিংসে ৪ উইকেটসহ মোট ৩৩ উইকেট নিয়েছেন সুমন। উইকেটপ্রতি তিনি খরচ করেছেন স্রেফ ১১.১৫ রান। অন্তত ১৫ উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে তার এই বোলিং গড়ই সবার সেরা। 

ঘরোয়া ক্রিকেটে গত কয়েক টুর্নামেন্টে উইকেট শিকারে ওপরের দিকে ছিলেন সুমন। এবার প্রথমবার শীর্ষে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করলেন সুমন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপে নিজের সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ধারাবাহিকতা দেখানোর লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন সুমন।

“যেকোনো খেলায়ই সর্বোচ্চ উইকেট নিতে পারার আনন্দটা আসলে অন্যরকম। প্রত্যেকটা টুর্নামেন্ট খেলার আগে একরকম প্রস্তুতি থাকে, পরিকল্পনা থাকে সেরাটা দেওয়ার, সেরা হওয়ার। আল্লাহ্‌র রহমতে এবার হতে পেরেছি। মৌসুমের শুরুটা ভালো হলো। সামনের টুর্নামেন্টগুলোতে এটি ধরে রাখতে চাই। যখন যেখানে খেলি, পারফর্ম করাটাই মূল।” 

এছাড়া বোলিংয়ে চমক দিয়েছেন রংপুর বিভাগের ২০ বছর বয়সী পেসার মুশফিক হাসান। ঢাকা বিভাগের বিপক্ষে ৭৩ রানে নেন ৮ উইকেট। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের পেসারদের তৃতীয় সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড এটি। সবমিলিয়ে নিজের অভিষেক আসরে ২৫ উইকেট নিয়েছেন মুশফিক। 

পেসারদের দাপটের ভিড়ে স্পিনারদের পতাকা উঁচু রেখেছেন সিলেট বিভাগের অভিজ্ঞ নাবিল সামাদ ও চট্টগ্রাম বিভাগের তরুণ হাসান মুরাদ। দুজনই সমান ৯ ইনিংসে বোলিং করে পেয়েছেন ২৮ উইকেট। যা এবারের আসরে যৌথভাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এবারের লিগে সর্বোচ্চ চারবার ৫ উইকেট পেয়েছেন মুরাদ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক