Published : 21 Oct 2025, 09:46 PM
খ্যারি পিয়েরের ব্যাট থেকে বল যখন উঠে গেল আকাশে, গোটা স্টেডিয়ামের সবাই তখন রুদ্ধশ্বাস তাকিয়ে সেদিকে। ক্যাচ নিলেই বাংলাদেশের জয়। কিপার নুরুল হাসান সোহান অনেকটা দৌড়ে বলের নিচে গেলেন বটে, কিন্তু ডাইভ দিতে গিয়েই করে ফেললেন গড়বড়। বল পড়ে গেল মাটিতে। ততক্ষণে দুই রান নিয়ে ফেলেছেন পিয়ের ও শেই হোপ। ম্যাচ ‘টাই।’ বোলার সাইফ হাসান তখন মাথায় হাত দিয়ে নুইয়ে পড়েছেন হতাশা।
একটু পর সেই হতাশা ভুলিয়ে দেওয়ার সুযোগ এলো সাইফের সামনেই। এক বলে তিন রান করলে বাংলাদেশের জয়, দুই রান করলে আবার ‘টাই।’ কিন্তু সাইফ নিতে পারলেন স্রেফ এক রান। আরও একবার পুড়লেন তিনি হতাশায়। বাংলাদেশের ডাগআউট আর গ্যালারির দর্শকেরা তখন স্তব্ধ। কেবল ভেসে এলো ক্যারিবিয়ানদের উল্লাসধ্বনি। রোমাঞ্চের ভেলায় ভেসে সুপার ওভারে জিতে সমতা ফেরাল তারা সিরিজে।
তিন সংস্করণ মিলিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবার ‘টাই’ অভিজ্ঞতা হলো বাংলাদেশের। শেষ পর্যন্ত সেটি রূপ নিল সুপার ওভারে হারের বিষাদে।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে মূল ম্যাচে দুই দলের স্কোরই থামে ২১৩ রানে। সুপার ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তোলে ১০ রান। বাংলাদেশ আটকে যায় ৯ রানে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে লম্বা ফ্লাইটে উড়ে এসে ভোর চারটায় টিম হোটেলে যোগ দিয়ে দুপুরে ম্যাচ খেলতে নেমে রাতে সুপার ওভারে দলকে জেতালেন আকিল হোসেন।
মূল ম্যাচে বাংলাদেশর সম্ভাবনা জিইয়ে রেখেছিলেন সাইফ। শেষ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল কেবল ৫ রান। দুর্দান্ত বোলিং করে ক্যারিবিয়ানদের মুঠো থেকে ম্যাচ প্রায় বের করেই নিয়েছিলেন পার্ট টাইম এই স্পিনার। শেষ বলে সোহান ক্যাচটি না নিতে পারায় ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে।
মুস্তাফিজুর রহমানের করা সুপার ওভারে প্রথম বলে সিঙ্গল নেন শেই হোপ। পরের বলে আউট হয়ে যান শেরফেন রাদারফোর্ড। পরের তিন বলে পাঁচ রান নেন হোপ ও ব্র্যান্ডন কিং। শেষ বলে হোপের ব্যাটের কানায় লেগে থার্ডম্যান দিয়ে বল চলে যায় বাউন্ডারিতে।
১১ রান তাড়ায় সৌম্য সরকার ও সাইফকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় বাংলাদেশ। আকিল হোসেন প্রথম বলটি করেন ওয়াইড। পরের বলটি হয় ‘নো’, সঙ্গে দুটি রান। কোনো বল হওয়ার আগেই স্কোরবোর্ডে রান চলে আসে চার। এরপর দরকার ছিল কেবল ছয় বলে সাত রান। পরে আরও একটি ওয়াইড পেয়েও অবিশ্বাস্যভাবে জিততে পারেনি বাংলাদেশ।
পরের তিন বলে আসে কেবল দুটি সিঙ্গল। চতুর্থ বলে সীমানায় ধরা পড়েন সৌম্য। নতুন ব্যাটসম্যান নামানো হয় নাজমুল হোসেন শান্তকে। লেগ বাই থেকে আসে একটি রান। শেষ বলে প্রয়োজন পড়ে চার রানের। আকিল তখন ওয়াইড করে বসেন আরেকটি। তবে এরপর স্নায়ুর লড়াইয়ে নিজেকে সামলে নেন বাঁহাতি এই স্পিনার। তার শেষ বলে এক রানের বেশি নিতে পারেননি সাইফ।
অথচ ম্যাচের নায়ক হতে পারতেন রিশাদ হোসেন। ব্যাটিং প্রতিকূল উইকেটে শেষ দিকে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ১৪ বলে ৩৯ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। পরে বল হাতে নেন ৩ উইকেট। এসবও যথেষ্ট হলো না জয়ের জন্য। দুই বাঁহাতি স্পিনার গুডাকেশ মোটি ও আকিল হোসেনকে তুলাধুনা করেই শেষ দুই ওভারে রান বাড়িয়েছিলেন তিনি। সুপার ওভারে আকিলের সামনে কেন তাকে ব্যাটিংয়ে পাঠানো হলো না, এটা বড় বিস্ময়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের প্রথম ভাগে ইতিহাস গড়ে অন্যভাবে। ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে ৫০ ওভারই করে তারা স্পিন দিয়ে। পাঁচ স্পিনারই বল করেন ১০ ওভার করে। পরে বাংলাদেশের ইনিংসেও ৪২ ওভার করা হয় স্পিনে। এক ম্যাচে ৯২ ওভার স্পিন বোলিংয়েই গড়া হয়ে যায় নতুন রেকর্ড। স্পিন-ট্রায়ালের এই ম্যাচের ফয়সালা শেষ পর্যন্ত সুপার ওভারে। 
আগের ম্যাচে টস হেরে ব্যাটিং পাওয়া বাংলাদেশ এবার আগে ব্যাটিং নেয় টস জিতে। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার দুই প্রান্তে স্পিন দিয়ে আক্রমণ শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম সাফল্য পায় তারা পঞ্চম ওভারে। আগের রাত আড়াইটায় দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া আকিল হোসেন এনে দেন প্রথম উইকেট।
টানা ১৪ বলে রান না পেয়ে অবশেষে আকিলকে ছক্কা মেরে রানের দেখা পান সাইফ হাসান। পরের বলেই ক্যাচ দেন তিনি স্লিপে (১৬ বলে ৬)।
ওয়ানডে ক্যারিয়ারে মাত্র দ্বিতীয়বার তিনে নামা তাওহিদ হৃদয়ের অবস্থাও তথৈবচ। প্রথম রান করতে তিনি খেলেন ১০ বল। অন্য প্রান্তে সৌম্য সরকারও পিচের চরিত্র বুঝে আঁকড়ে রাখেন উইকেট।
প্রথম ১৫ ওভারে ডট ডেলিভারি ছিল ৬৫টি।
হৃদয় (১৯ বলে ১২) উইকেট হারান দৃষ্টিকটু স্লগে। ক্রিজে কিছুটা সময় কাটিয়ে উইকেট বিলিয়ে দেন নাজমুল হোসেন শান্ত (২১ বলে ১৫) ও মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন (৩৫ বলে ১৭)।
এই পুরো সময় এক প্রান্ত আগলে ছিলেন সৌম্য। ৩০ ওভারের বেশি ক্রিজে কাটিয়ে উইকেট উপহার দিয়ে ফেরেন তিনিও। ৮৯ বল খেলেন তিনি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এর চেয়ে বেশি বল খেলেছেন আর কেবল তিনবার, প্রতিটিতেই করেছেন সেঞ্চুরি। কিন্তু এ দিন তার নামের পাশে রান ৪৫। স্ট্রাইক রেট ৫০.৫৬। তার দু অঙ্ক ছোঁয়া ইনিংসগুলোর মধ্যে মন্থরতম ইনিংস এটিই।
একটি ছক্কা মারলেও নাসুম আহমেদ (২৬ বলে ১৪) সুবিধা করতে পারেননি। বাংলাদেশের ইনিংস একটু গতি পায় নুরুল হাসান সোহানের ব্যাটে। দুই চার এক ছক্কায় ২৪ বলে ২৩ করেন তিনি।
তার পরও দুইশ ছিল দূরের পথ। শেষ দুই ওভারে ঝড়ের বেগে সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দেন রিশাদ। ৪৯তম ওভারে গুডাকেশ মোটিকে দুটি ছক্কা ও একটি চার মারেন তিনি, শেষ ওভারে ছক্কা ও চার মারেন আকিলকে।
শেষ দুই ওভারে ৩৪ রান তোলে বাংলাদেশ, রিশাদের ব্যাট থেকেই আসে ৩৩।
তিনটি করে ছক্কা ও চারে ১৪ বলে ৩৯ রানে অপরাজিত থাকেন রিশাদ। বাংলাদেশের হয়ে এক ওয়ানডেতে ২০ ছোঁয়া ইনিংসগুলোর মধ্যে তার স্ট্রাইক রেটই (২৭৮.৫৭) সর্বোচ্চ।
অধিনায়ক মিরাজ অপরাজিত থাকেন ৫৮ বলে ৩২ রান করে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের পাঁচ স্পিনারের মধ্যে একমাত্র অনিয়মিত স্পিনার যিনি, সেই আলিক আথানেজ ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল। ১০ ওভারে স্রেফ ১৪ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন তিনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ১০ ওভার বোলিং করা স্পিনারদের মধ্যে সবচেয়ে মিতব্যয়ী তিনিই।
ব্যাটিংয়ের শেষটার মতো বোলিংয়ের শুরুটাও ভালো করে বাংলাদেশ। প্রথম ওভারেই ব্র্যান্ডন কিংকে ফেরান ১০ মাস পর ওয়ানডে খেলতে নামা নাসুম আহমেদ।
সেই ধাক্কা সামলে অর্ধশত রানের জুটি গড়েন আথানেজ ও কেসি কার্টি। বাংলাদেশের দুর্ভাবনা দূর হয় রিশাদ বল হাতে নিতেই। প্রথম ওভারেই আথানেজকে (২৮) ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন তিনি।
আরেকপ্রান্তে জমে যাওয়া কার্টিও (৩৫) ফেরেন রিশাদের শিকার হয়ে।
একটু পর অভিষিক্ত আকিম ওগিসের (১৭) বিদায়েও ছিল রিশাদের হাত। তানভির ইসলামের বলে দারুণ রিফ্লেক্স ক্যাচ নেন তিনি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ উইকেট হারাতে থাকে নিয়মিত বিরতিতে। তানভিরের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হয় শেরফেন রাদারফোর্ড, নাসুমের দ্বিতীয় শিকার রোস্টন চেইস। রিশাদকে স্লগ করার চেষ্টায় বোল্ড গুডাকেশ মোটি।
১৩৩ রানে ৭ উইকেট হারানো তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন হারের দুয়ারে। সেখান থেকে দলকে আবার লড়াইফে ফেরায় শেই হোপ ও জাস্টিন গ্রেভসের জুটি। ৯ নম্বরে নামলেও গ্রেভস মূলত ব্যাটসম্যানই। ঠাণ্ডা মাথায় খেলে হোপের সঙ্গে মিলে দলকে এগিয়ে নেন তিনি।
কোনো বোলারই যখন থামাতে পারছে না এই জুটিকে, মিরাজের দারুণ এক সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট হয়ে যান গ্রেভস (২৬)।
তবু লড়াইয়ে হাল ছাড়েনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এবার হোপের সঙ্গী হন আকিল। দুজনের জুটি দলকে নিয়ে যায় জয়ের খুব কাছে। ৪৮তম ওভারের শেষ বলে যখন মিরাজকে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলেন আকিল, ক্যারিবিয়ানরাই তখন ম্যাচে ফেভারিট।
বাংলাদেশের মূল বোলারদের কারও ওভার তখন বাকি নেই। মাঠেই ছোটখাটো টিম মিটিংয়ের পর বল তুলে দেওয়া হয় সাইফের হাতে।
কিন্তু শেষ ওভারে ৫ রানের সহজ সমীকরণে খেই হারান সেই আকিলই। প্রথম দুই বল জোরে হাঁকাতে গিয়ে ব্যাটে-বলেই করতে পারেননি তিনি। পরের বলে নেন সিঙ্গল। চতুর্থ বলে সিঙ্গল নেন হোপ। পঞ্চম বলে আবার স্লগ করার চেষ্টায় দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বোল্ড হয়ে যান আকিল।
এক বলে যখন প্রয়োজন তিন রান, তখন খ্যারি পিয়েরের সেই শট, সোহান ক্যাচ নিতে না পারায় ম্যাচ 'টাই।' এরপর সুপার ওভার নাটকে ক্যারিবিয়ানদের হাসি, বাংলাদেশের বেদনা।
সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ বৃহস্পতিবার।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২১৩/৭ (সাইফ ৬, সৌম্য ৪৫, হৃদয় ১২, শান্ত ১৫, মাহিদুল ১৭, মিরাজ ৩২*, নাসুম ১৪, সোহান ২৩, রিশাদ ৩৯*; আকিল ১০-১-৪১-২, চেইস ১০-২-৪৪-০, পিয়ের ১০-০-৪৩-০, মোটি ১০-০-৬৫-৩, আথানেজ ১০-৩-১৪-২)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৫০ ওভারে ২১৩/৯ (আথানেজ ২৮, কিং ০, কার্টি ৩৫, ওগিস ১৭, হোপ ৫৩*, রাদারফোর্ড ৭, মোটি ১৫, চেইস ৬, গ্রেভস ২৬, আকিল ১৬, পিয়ের ২*; নাসুম ১০-২-৩৮-২, মিরাজ ১০-১-৩৮-০, মুস্তাফিজ ৮-০-৪০-০, তানভির ১০-০-৪২-২, রিশাদ ১০-০-৪২-৩, সাইফ ২-০-৯-১)।
ফল: ম্যাচ টাই, সুপার ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে ১-১ সমতা।
ম্যান অব দা ম্যাচ: শেই হোপ।