Published : 18 Jan 2026, 05:38 PM
তিন বলে প্রয়োজন তখন তিন রান। টিভি পর্দায় দেখানো হলো তাওহিদ হৃদয়কে। ড্রেসিং রুমের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি মুখে হাত বুলাচ্ছিলেন। মুখায়বে টেনশনের ছাপ স্পষ্ট। তিনি আউট হওয়ার সময় দল ছিল জয়ের কিনারায়। কিন্তু শেষ ওভারে একটু জটিল হয়ে গেল পরিস্থিতি। তবে নাটকীয় কিছু শেষ পর্যন্ত হলো না। প্রত্যাশিজ জয় পেয়ে গেল রংপুর। হৃদয়ের মুখেও ফুটে উঠল হাসি। শেষ সময়টায় ক্রিজে থাকতে না পারলেও ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরিতে নায়ক তো তিনিই।
ম্যাচের প্রথম ভাগের নায়ক ছিলেন হাসান ইসাখিল। এক সপ্তাহ আগে বিপিএল অভিষকে ৯২ রানে আউট হওয়া ব্যাটসম্যান এবার করেন অপরাজিত সেঞ্চুরি। কিন্তু আফগান গ্রেট মোহাম্মদি নাবির ছেলের সেঞ্চুরি ছাপিয়ে আরও কার্যকর শতরান উপহার দেন হৃদয়।
বিপিএলের প্রাথমিক পর্বের শেষ দিনের ম্যাচে নোয়াখালী এক্সপ্রেসকে ৮ উইকেটে হারায় রংপুর রাইডার্স।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে রোববার নোয়াখালী ২০ ওভারে তোলে ২ উইকেটে ১৭৩ রান। রংপুর জয় পায় দুই বল বাকি রেখে।
নোয়াখালী হয়ে ৭২ বলে ১০৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন ইসাখিল। ফিফটি করতে তার ৫০ বল লাগলেও পরের পঞ্চাশ করেন তিনি ২০ বলেই। ইনিংসে ছক্কা মারেন ১১টি, এবারে বিপিএলে এক ম্যাচে ৬টির বেশি ছক্কা নেই আর কারও।
হৃদয়ের ইনিংসে এমন ছক্কা বৃষ্টি ছিল না। তবে তার ব্যাট ছিল আরও গতিময়। ১৫ চার ও ২ ছক্কায় ৬৩ বলে ১০৯ রানের ইনিংস খেলেন তিনি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ও বিপিএলে তার দ্বিতীয় শতরান এটি। আগেরটি ছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে ১০৮।
এই আসরের প্রথথম ছয় ম্যাচে তার রান ছিল মাত্র ১০৬। ফিফটি ছিল একটি। ওপেনিংয়ে উঠে আসার পর থেকেই তার পারফরম্যান্সে এসেছে অবিশ্বাস্য বদল। ইনিংস শুরু করে চার ম্যাচের একটিতে তিনি করলেন অপরাজিত ৯৭, একটিতে ৬২, এবার সেঞ্চুরি। ৩৫৬ রান নিয়ে এখন তিনি রানের তালিকায় সবার ওপরে।
রান তাড়ায় শুরু থেকে রংপুরকে এগিয়ে নেন মূলত হৃদয়ই। প্রথম চার ওভারেই পাঁচটি চার একটি ছক্কা আসে তার ব্যাট থেকে।
পাওয়ার প্লেতে রংপুর তোলে ৫৫ রান। সেখানে হৃদয়ের অবতান ২৬ বলে ৪৭। সঙ্গী দাভিদ মালান তখনও যেন ঘুমিয়ে (১০ বলে ৭)।
মালান পরেও জেগে উঠতে পারেননি। জুটি থামে ৭৮ রানে। তাতে হৃদয়ই করেন ৬১ রান। মালান ফেরেন ১৫ বলে ১৫ রান করে।
পরে লিটন দাসকে সঙ্গী করে ছুটতে থাকেন হৃদয়। সেখানেও রংপুর অধিনায়ক ছিলেন সহকারীর ভূমিকায়। রান বাড়ানোর কাজটি করেন মূলত হৃদয়।
একটা পর্যায়ে রান রেট যদিও একটি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছিল। শেষ ৫ ওভারে প্রয়োজন পড়ে ৪৭ রানের। সৌম্য সরকারের ওভারে তখন দুজন মিলে ১৮ রান দিয়ে ম্যাচের ফয়সালা একরকম করে ফেলেন।
হৃদয় শতরানে পা রাখেন ৫৭ বলে।
আউট হয়ে যখন ফিরছেন তিনি, জয়ের জন্য দলের প্রয়োজন তখন ১০ বলে ৯ রান। ওই ওভারের বাকি চার বলে আসে তিন রান।
শেষ ওভারে প্রয়োজন পড়ে ছয় রানের। লিটন ও খুশদিল শাহ প্রথম তিন বলে নেন তিন রান। পরের বলে নেন দুটি রান। এরপর ওয়াইড ডেলিভারিতে ম্যাচের সমাপ্তি।
লিটন অপরাজিত থাকেন ৩৫ বলে ৩৯ রানে।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা নোয়াখালীর শুরুটা ছিল মন্থর। প্রথম দুই ওভারে রান আসে তিন। তৃতীয় ওভারে নাহিদ রানাকে চার ও ছক্কা মারেন ইসাখিল, পঞ্চম ওভারে ছক্কা মারেন তিনি ফাহিম আশরাফকে। তার পরও পাওয়ার প্লেতে রান আসে মাত্র ৩৩। এতে ইসাখিল ২৫ বল খেলে করেন ২০ রান।
এর মধ্যেই আউট হয়ে যান মৌসুমে প্রথম খেলতে নামা রহমতউল্লাহ আলি (১০ বলে ৯)। একটু পর আলিস আল ইসলামের চোখধাঁধানো এক ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে যান জাকের আলি (৭ বলে ৩)।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়া কিপার-ব্যাটসম্যানের বিপিএল কাটল দুঃস্বপ্নের মতো। ৮ ম্যাচে ১১৪ রান করে আসর শেষ করলেন তিনি। ব্যাটিং গড় ১৬.২৮, স্ট্রাইক রেট ১০৫.৫৫।
পাওয়ার প্লে শেষে রানের গতি কমে যায় আরও। পরের তিন ওভারে আসেনি কোনো বাউন্ডারি। ১০ ওভারে নোয়াখালীর রান ছিল ৪৭।
ইসাখিলের রান এক পর্যায়ে ছিল ৩৫ বলে ২৩। পরে হাত খুলে খেলে ফিফটিতে পা রাখেন তিনি ৫০ বলে। মন্থর শুরুর পর জেগে ওঠেন হায়দার আলিও।
বাউন্ডারি আসতে থাকে তখন নিয়মিতই। তার পরও ইসাখিলের সেঞ্চুরির সম্ভাবনা সেভাবে ছিল ১৭ ওভার পর্যন্তও। তার রান তখন ৬৭।
পরের দুই ওভারে দুটি ছক্কা একটি চার মেরে তিনি এগিয়ে যান শতরানের দিকে। শেষ ওভার শুরু করেন তিনি ৮৭ রান নিয়ে।
আকিফ জাভেদের প্রথম বলটিই পয়েন্টের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন ইসাখিল। পাকিস্তানি বাঁহাতি পেসারের সেই ডেলিভারি ছিল ‘নো।’ পরের বলেই ফ্রি হিটে তিনি বল আছড়ে ফেলেন গ্যালারিতে।
৯৯ থেকে দুটি রান নিয়ে শতরানে পৌঁছে যান তিনি ৭০ বলে। পরের বলে ছক্কা মারেন একটি।
শেষ বলে হায়দারের বাউন্ডারিতে শেষ হয় ইনিংস।
ইসাখিল ও হায়দারের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে আসে ৭৪ বলে ১৩৭ রান। এবারের বিপিএলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি এটি।
৩২ বলে ৪২ রানে অপরাজিত থাকেন হায়দার। জুটিতে ৪২ বল খেলে ৮৬ রান করেন ইসাখিল।
শেষ ৬ ওভারে ৯১ রান তোলে নোয়াখালী।
তবে সেই পুঁজি যথেষ্ট হয়নি হৃদয়-লিটনদের সামনে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
নোয়াখালী এক্সপ্রেস: ২০ ওভারে ১৭৩/২ (ইসাখিল ১০৭*, রহমতউল্লাহ ৯, জাকের ৩, হায়দার ৪২*; ফাহিম ৪-০-৩৩-০, আকিফ ৪-০-৫৩-০, নাহিদ ৪-০-৪০-১, আলিস ৪-০-২২-১, খুশদিল ৪-০-২২-০)।
রংপুর রাইডার্স: ১৯.৪ ওভারে ১৭৪/২ (মালান ১৫, হৃদয় ১০৯, লিটন ৩৯*, খুশদিল ৩*; হাসান ৪-০-২৩-১, মুশফিক ৪-০-৪৭-০, মেহেদি রানা ৩.৪-০-৩১-০, সাব্বির ২-০-১৫-০, জাহির ৪-০-২৭-১, রহমত ১-০-১২-০, সৌম্য ১-০-১৮-০)।
ফল: রংপুর রাইডার্স ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: তাওহিদ হৃদয়।