বিতর্কের হাওয়ায় টালমাটাল মাঠের ক্রিকেট
সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের মতে, মাঠের বাইরের বিতর্কের নেতিবাচক প্রভাব মাঠের ক্রিকেটে পড়েছে প্রবলভাবেই।
ঘুমজড়ানো কণ্ঠে ফোন রিসিভ করলেন হাবিবুল বাশার। ব্যক্তিগত কাজে এখন তিনি আছেন নিউ ইয়র্কে। সেখানে সবে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ঘুমের রেশ থাকলেও কথা বলতে আপত্তি করলেন না তিনি। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টির পারফরম্যান্স নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই সাবেক এই অধিনায়কের ত্বরিত মন্তব্য, “খেলার কথা বাদ দিন। আমি খুবই বিরক্ত হয়েছি খেলার আগের পরিস্থিতি নিয়ে। এটা কোনোভাবেই হতে পারে না…।”
দেশের ক্রিকেটের সামান্যতম অনুসারী হলেও বুঝে ফেলার কথা, কোন ঘটনার কথা হাবিবুল বলছেন। সিরিজ শুরুর আগের দিন দল নির্বাচন নিয়ে অধিনায়ক লিটন কুমার দাসের বিস্ফোরক মন্তব্য, প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেনের পাল্টা জবাব এবং এসব নিয়ে বিতর্কের দিকেই ইঙ্গিত তার।
হাবিবুল নিজেও দীর্ঘদিন ছিলেন নির্বাচক কমিটিতে। এখন তার দায়িত্ব বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের হেড অব অপারেশন্সের। বিসিবির চাকুরে হয়ে অনেক কিছুতেই মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হয় তাদেরকে। তবে এই ঘটনার তীব্রতা এতটা প্রবল যে, তার সেই বাধ্যবাধকতার দুয়ার ভেঙে গেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি অকপটেই বললেন, খেলার আগেই বাংলাদেশ দলের মনোযোগ খেলা থেকে সরে গেছে এবং সেটিতে লাভবান হয়েছে আয়ারল্যান্ড।
“আমি খুব বিরক্ত হয়েছি, খেলার আগেই যে পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে সেটা নিয়ে। যার সঙ্গেই আলাপ করছিলাম, বারবার এটাই বলছিলাম যে খুব খারাপ হলো। সিরিজ শুরু হওয়ার আগে যেখানে আলোচনায় থাকার কথা সিরিজে আমরা কী করব না করব, পরিকল্পনা কেমন, এসব নিয়ে। অথচ আমরা এমন একটা বিষয় শুরু করলাম যে খেলা থেকে মনোযোগ সরে গেল এবং আমরা নিজেদের উপর নিজে চাপ তৈরি করে ফেললাম ও আয়ারল্যান্ডের জন্য সুবিধা করে দিলাম। আয়ারল্যান্ড খুবই খুশি হয়েছে। এটা কোনোভাবেই তৈরি হওয়া উচিত হয়নি।”
“টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ড এমনিতেই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। টি-টোয়েন্টিতে এই দেশগুলো খুব ভালো খেলে। ওরা টেস্টে হয়তো পারবে না, ওয়ানডেতে লড়াই করবে, কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে ওরা যে কাউকে হারাতে পারে। সেটা নেপাল হোক, এই আয়ারল্যান্ড হোক বা নেদারল্যান্ডস, এই ফরম্যাটটা ওদের জন্য খুব ভালো। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিপক্ষ যে দেশই হোক, একটা সিরিজের আগে আপনি এরকম পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন না…।”
হাবিবুল নির্বাচক কমিটিতে থাকার দীর্ঘ সময়ে প্রায় সব অধিনায়ক, কোচের সঙ্গেই দল নির্বাচনে মতবিরোধ, টানাপোড়েন নিশ্চিতভাবেই হয়েছে। নিজেদের মতো করেই তারা সেসব সামলেছেন। কিন্তু এবারের ঘটনায় কেউই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেননি বলে মনে করেন ৫০ টেস্ট খেলা সাবেক এই ব্যাটসম্যান।
“এসব প্রকাশ্য হওয়ার কোনো দরকারই ছিল না। কোনোটাই জনসম্মুখে যাওয়া উচিত হয়নি। প্রথমে লিটন, তারপরে লিপু ভাই, দুটোই। কোনোটিই এভাবে উচিত হয়নি। কারণ আমরা তো সবাই ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে, তাই না? ক্রিকেট বোর্ড আমাদের একটা অভিবাবক সংস্থা। সুতরাং আমাদের মধ্যে যা-ই ঘটুক না কেন, সেটা আমাদের মধ্যেই থাকা উচিত।”
“এটা ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরেই সমাধান করা যেত। অধিনায়কের যদি কোনো সমস্যা থাকতো, সে ক্রিকেট বোর্ডে এসে কথা বলতে পারত। নির্বাচকের কোনো সমস্যা থাকলে তিনিও ক্রিকেট বোর্ডে কথা বলতে পারত। আড়াল থেকেই সমাধান হয়ে যেত। লিটন কোন পরিস্থিতিতে এমন বলতে বাধ্য হয়েছে, আমি জানি না। কিন্তু যে পরিস্থিতিই হোক, এটা নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নিলেই ভালো হতো।”
বিতর্কের ঝড়ের মধ্যে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে লড়াই সেভাবে জমাতেই পারেনি বাংলাদেশ। আয়ারল্যান্ড সিরিজে এগিয়ে গেছে দারুণ জয়ে। হাবিবুল কোনো রাখঢাক না রেখেই বললেন, সিরিজ শুরুর আগের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব লিটনদের পারফরম্যান্সে পড়েছে।
“একটা বাসার মধ্যে তো সমস্যা থাকতেই পারে, সেটা বাইরের লোক কেন জানবে? সেটার প্রভাব ম্যাচেও পড়েছে। যদি ম্যাচের আগে অন্য জিনিস নিয়ে বেশি মনোযোগী থাকি, এটার প্রভাব ম্যাচে পড়বেই। এটা একটা মানসিক খেলা, তাই না? তাহলে আমি কেন আমার উপর বাড়তি চাপ তৈরি করব!।”
“আমি মাঠে গেলাম আর জিতে গেলাম, এমনটা তো হয় না। ভারত বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দলও যখন আমাদের সঙ্গে খেলে, তারা অনেক সময় ব্যয় করে, হোমওয়ার্ক করে। তারা এসব অপ্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি করে না। সেরা প্রস্তুতিটা নিশ্চিত করে। আমরা অকারণে নিজেদের উপর চাপ সৃষ্টি করছি।”
পরাজয়ের ক্রিকেটীয় কারণগুলোও ছুঁয়ে গেলেন হাবিবুল। তার দুর্ভাবনা টপ অর্ডারে দ্রুত উইকেট হারানো নিয়ে। কিছুদিন আগে কাজ করে যাওয়া পাওয়ার হিটিং কোচ জুলিয়ান উডের সঙ্গে কাজ করে ব্যাটসম্যানদের কিছু উপকার হয়েছে বলে মনে করেন তিনি, তবে উল্টো দিক নিয়েও শঙ্কার ছবি তিনি দেখছেন।
“আমাদের এখানে জুলিয়ান উড এসে একটা ফর্মুলা দিয়ে গেছে যে, মারতে হবে। এখানে বার্তাটা হয়তো ঠিকঠাক ধরতে পারেনি। হ্যাঁ, এই জিনিসটা উন্নত হয়েছে, আমরা এখন মারতে পারি। আগে আমরা এত ছক্কা মারতে পারতাম না, বা নিয়মিত মারতে পারতাম না। কিন্তু ওর বার্তাটা ভুল যাচ্ছে কি না, প্রশ্ন থাকছে। মারতে হবে মানে এই নয় যে, আমি পাওয়ার প্লেতে চারটা উইকেট হারাব। ইমার্জিং টুর্নামেন্টেও (রাইজিং স্টার্স) এই ব্যাপারটি দেখলাম, সেখানেও একই ধরণ দেখেছি।”
“আমাদের একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে যে, কীভাবে উইকেট না হারিয়ে রান করব। এতটা বেপরোয়া হওয়া তো যাবে না। এখন বিশ্বকাপ প্রায় চলে এসেছে, নতুন কিছু নিয়ে চেষ্টা করার সময় নেই। সুতরাং আমাদের যারা খেলছে, তাদেরই বুঝতে হবে যে খেলার ধরণটা কী হওয়া উচিত।”
একটি জায়গায় অবশ্য হাবিবুলের সন্তুষ্টি আছে, বিশ্বকাপের আগে ভালো উইকেটে খেলার চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ নিয়েছে। সিরিজ নিয়েও আশার সমাপ্তি তিনি দেখছেন না এক ম্যাচেই।
“আমি খুশি যে, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে আমরা ভালো উইকেটে ম্যাচ খেলছি। কারণ বিশ্বকাপে আমরা এরকম উইকেটেই খেলব। হার-জিত তো থাকবেই। হারাটা অবশ্যই ভালো কিছু নয়, কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে যে কোনো দল হারতেই পারে।”
“আয়ারল্যান্ড ভালো দল। আমি এটা বলব না যে বাংলাদেশ হেরেছে বলে একদম সব শেষ হয়ে গেছে। হারাটা আদর্শ নয়, তবে এই ফরম্যাটে এটা হতেই পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরের দুটো ম্যাচ আমরা কীভাবে খেলি।”
বাংলাদেশের সিরিজে টিকে থাকার ম্যাচ শনিবার। চট্টগ্রামে খেলা শুরু যথারীতি সন্ধ্যায ৬টায়।
