ভাবনার জগতে শান দিয়ে দ্যুতিময় লিটন
টেস্ট ও ওয়ানডেতে দারুণ সময় কাটানো লিটন দাস নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন টি-টোয়েন্টিতে। বিশ্বকাপে নিদারুণ ব্যর্থতায় জায়গাও হারিয়েছিলেন এই দলে। অন্যদের ব্যর্থতায় আবার ফিরে করলেন ঝকঝকে এক ফিফটি। আভাস দিলেন অন্য দুই সংস্করণের ছন্দটা নিয়ে আসছেন টি-টোয়েন্টিতেও।
টেস্টে সবশেষ ১৬ ইনিংসে করেছেন সাত ফিফটি ও দু্ই সেঞ্চুরি। ওয়ানডেতে শেষ ১৭ ইনিংসে চার সেঞ্চুরির পাশে ফিফটি একটি। কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে ছিলেন ভীষণ বিবর্ণ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টির আগে টানা ১৬ ইনিংসে একবারও ছুঁতে পারেননি পঞ্চাশ।
গত বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ একেবারেই ভালো কাটেনি লিটনের। শঙ্কা জেগেছিল, সেই ব্যর্থতায় ছায়া না পড়ে না নিউ জিল্যান্ড সফরে। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি, মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে লড়াকু ৮৬ রানের ইনিংস খেলার পর ক্রাইস্টচার্চ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে পাল্টা আক্রমণে করেন ঝকঝকে সেঞ্চুরি।
ছন্দটা ধরে রেখে আলো ছড়ান আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেও। সেঞ্চুরির পর করেন ফিফটি, জেতেন সিরিজ সেরার পুরস্কার। এর ধারাবাহিকতায় এবার উজ্জ্বল টি-টোয়েন্টিতেও। রশিদ খান, মুজিব উর রহমান, মোহাম্মদ নবি, ফজলহক ফারুকিদের বোলিং সামলে খেললেন ৪৪ বলে ৬০ রানের চমৎকার ইনিংস।
ধীরে ধীরে যেন সব সংস্করণের ব্যাটসম্যান হয়ে উঠছেন লিটন। তার যে প্রতিভা ও সামর্থ্য, রাখতে শুরু করেছেন সেটার ছাপ।
মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৬১ রানের জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে লিটন নিজের খেলা নিয়ে বললেন অনেক কিছুই।
পাকিস্তান সিরিজে বিশ্রাম দেওয়ার পর টি-টোয়েন্টিতে পুনরায় মনোযোগ ফিরেছে কি না, জানতে চাইলে নিজেই প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, “বিশ্রাম দেওয়া হয়নি, বাদ পড়েছিলাম।”
“আমি কি অনেক ক্রিকেট খেলে ফেলেছি যে ছুটি নেব? বিশ্বকাপের পর এসে সরাসরি জাতীয় লিগে খেলেছি, ছুটি নিলাম কোথায়? আমি তো কিছু না কিছু খেলছিলামই। টেস্ট খেলছিলাম, ওয়ানডে খেলছিলাম। ধারাবাহিক ছিলাম। তারা আমাকে মনে করেছেন, লিটনকে খেলালে ভালো হবে। আমি চেষ্টা করেছি শতভাগ দেওয়ার।”
“প্রথমে বলতে চাই, অস্বস্তি ছিল না। আমার যে ভূমিকা, তাতে কোনোদিন সফল হব, কোনোদিন হব না। বিশ্বকাপে যেমন ব্যর্থ হয়েছি। সেটা এখন অতীত। এ ম্যাচে সুযোগ পেয়েছি, ভালো খেলার চেষ্টা করেছি।”
সেই চেষ্টাতে ১৬ ইনিংস পর টি-টোয়েন্টিতে এসেছে ফিফটি। সেটাও এমন জায়গায় ব্যাট করে যেটা তার সহজাত পজিশন নয়। মোহাম্মদ নাঈম শেখ ও মুনিম শাহরিয়ার ওপেন করায় তিনে নামেন লিটন। ক্রিজে অবশ্য যেতে হয় তৃতীয় ওভারেই।
একেক ধরনের ক্রিকেটে একেক পজিশনে ব্যাট করতে হয় লিটনকে। এটা কি তারে ব্যাটিংয়ে একটু হলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না?
“আমি ব্যাটিং পজিশন নিয়ে কোনো তর্কে বা কিছুতে যেতে চাই না। আমার লক্ষ্য থাকে, খেললে দলকে সাহায্য করা। সেটা যেভাবেই হয়। টিম ম্যানেজমেন্ট যদি বলে এক নম্বরে ব্যাটিং করতে, তো সেখানে, যদি বলে সাতে, তো সাতে। কথা হচ্ছে এটা আমার সঙ্গে যাচ্ছে কি না। টিম ম্যানেজমেন্ট ভালো বুঝবে, আমি সাতে খেলার ব্যাটসম্যান কি না। তারা মনে করেছে, আমাকে এখানে খেলালে বেটার হবে, আমি চেষ্টা করেছি খেলার জন্য। এনিয়ে আমার কোনো কথা নেই।”
“আমাকে কাল যদি বলা হয় ওপেন করতে, করব। দল যেটা করতে বলবে, করব। এতো দিন কিপিং করি নাই, আজকে করতে বলেছে করেছি। যখন যেটা বলবে, চেষ্টা করব ১০০ ভাগ দেওয়ার। হলে হবে, না হলে কিছু করার নেই।”
ব্যাটিং পজিশন নিয়ে ভাবেন না লিটন, কিন্তু ভাবেন ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে। ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়ে। বোলার নিয়ে, ফিল্ডিং নিয়ে। খেলেন হিসেব কষে। টেকনিকে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি, এসেছে মনোজগতে। সেটাই পাল্টে দিয়েছে লিটনের ব্যাটিং।
“সবাই বলে ক্রিকেটটা মাথার খেলা। তো আপনি যদি মাথা খাটিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে আপনার হাতে (টি-টোয়েন্টিতেও) অনেক সময় আছে। যেহেতু আমি টপ অর্ডারে খেলি তাই টি-টোয়েন্টিতেও বড় ইনিংস খেলার জন্য যথেষ্ট সময় আছে। ওয়ানডেতে তো যথেষ্ট সময় আছে। তো আমার কাছে মনে হয়, চিন্তা-ভাবনা (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)। কেউ যদি চিন্তা করে ঠিক করতে পারে এই সংস্করণ এভাবে খেলব, ওই সংস্করণ এভাবে, তাহলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।”
“এটা কেবল আমার জন্য না, সবার জন্যই। চিন্তা-ভাবনা একটু পরিবর্তন করলে ১২০ বল অনেক সময়। এখন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করছি, আগে হয়তো ওভাবে বুঝতাম না। এটা মানুষের জন্য স্বাভাবিক যে, যতো খেলবে ততো শিখবে।”
খেলাটা বুঝতে শুরু করার পর থেকে ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে লিটনের খেলার ধরন। এখন আর আগের মতো চাপ সরাতে হুট করে বড় শট খেলার চেষ্টায় যান না। এখন কি ক্যারিয়ারের সেরা সময়ের কাছাকাছি আছেন লিটন?
“সেরা বা এমন কিছু নয়। ভালো চিন্তা-ভাবনা আছে, ব্যাটে-বলে ভালো লাগছে, এটাকে যতদূর নিয়ে যাওয়া যায়।”
