হায়দরাবাদের স্মরণিকায় ভালোবাসার বাংলাদেশ

বয়সের ভারে ন্যুজ, তবে চোখে-মুখে দীপ্তি। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছেন। পাশেই একজন হাতে বয়ে বেড়াচ্ছেন ম্যাগাজিনের স্তুপ। সেখান থেকেই একটি করে নিয়ে সংবাদকর্মীদের দিচ্ছেন প্রৌঢ় মানুষটি। তুলে দিচ্ছেন পরম মমতায়, যেন কোনো অমূল্য সম্পদ!

আরিফুল ইসলাম রনিহায়দরাবাদ থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Feb 2017, 02:44 PM
Updated : 10 Feb 2017, 05:53 AM

তার কাছে এটি অমূল্যই। ভালোবাসার জিনিস তো মূল্য দিয়ে বিচার করা যায় না! যাদেরকে দিচ্ছেন, তারাও বেশ আপ্লুত। কারণ এটি সংগ্রহে রাখার মতোই। ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট উপলক্ষে বের করা একটি স্মরণিকা!

একসময় এটা রীতিই ছিল। পঞ্চাশের দশক থেকেই হায়দরাবাদে বিভিন্ন খেলা উপলক্ষে বের হরা হয়েছে স্মরণিকা। তবে নব্বই দশক থেকে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেই থমকে যাওয়া রীতিকেও জাগিয়ে তুলেছে।

মূলত এই প্রবীণ মানুষটির উদ্যোগেই প্রকাশিত হয়েছে স্মরণিকা। হায়দরাবাদের ক্রিকেট মহলে তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়। পি আর মান সিং, হায়দরাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (এইচসিএ) সাবেক সচিব। দীর্ঘদিন ছিলেন দায়িত্বে, এখন সাম্মানিক সচিব। তার চেয়েও বড় পরিচয়, হায়দরাবাদ ক্রিকেটে তিনি জীবন্ত আর্কাইভ। ক্রিকেট স্মারকের নিজস্ব জাদুঘর আছে তার, আছে বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ। ক্রিকেটের ইতিহাস আর রোমাঞ্চকর সব গল্পের অফুরন্ত ভাণ্ডার তিনি। এবারও মাঠের ক্রিকেটে যাই হোক, ভারতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের উপলক্ষটিকে ধরে রাখতে চেয়েছেন ছাপার অক্ষরে।

স্মরনিকাটি প্রথম দর্শনেই ভালো লাগার মত; ভেতরের উপাদানেও এটি দারুণ সমৃদ্ধ। শুরু আব্বাস আলি বেগের লেখা দিয়ে। হায়দরাবাদের হয়ে সবচয়ে কম বয়সে অভিষেক হয়েছিল প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। পরে টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি করেছিলেন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। এখন ৭৮ ছুঁইছুঁই সাবেক ব্যাটসম্যান স্মৃতির ভেলায় ফিরে গেছেন তার সময়ে। প্রশংসা করেছেন উন্নতির পথে থাকা বাংলাদেশের।

এক সময় ধারাভাষ্য কক্ষের নিয়মিত মুখ চারু শর্মা লিখেছেন ভারতের ক্রিকেট বাণিজ্য নিয়ে। যেটির প্রসারে খানিকটা ভুমিকা ছিল তারও। ‘বাংলাদেশ—অবশেষে ভারতে’, শিরোনাম দেখেই ধারণা করা যেতে পারে হার্শা ভোগলের লেখার উপজীব্য।

বাংলাদেশের সাবেক কোচ মহিন্দর অমরনাথ লিখেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিবর্তন। তার লেখায় উঠে এসেছে আইসিসি ট্রফির দিনগুলিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট। এক বাদল দিনে পা রাখলেন ঢাকায়। সংগঠক, প্রশাসক, ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলার পর ধাক্কা মতো খেলেন। তখন দেশের ক্রিকেট কেবলই ক্লাব সর্বস্ব। ক্লাবের তারকাদের দেশের হয়ে খেলতে উদ্বুদ্ধ করা আর লিখেছেন ফিটনেসে জোর দেওয়ার গল্প।

হায়দরাবাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সম্পর্ক অনেক পুরোনো। বাংলাদেশে যখন বিদেশি দলগুলির পা পড়ত কদাচিৎ, সেই সত্তুরের দশকের শেষ ভাগ থেকে নব্বইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত চারবার বাংলাদেশ সফর করেছে হায়দরাবাদ ব্লুজ দল। বাংলাদেশও এসেছে এখানে খেলতে। প্রায় প্রতিটি লেখাতেই উঠে এসেছে দুই জায়গার সেই বন্ধনের কথা।

তেমনই একটি সফরের স্মৃতিচারণা করেছেন ভারতের উইকেটকিপিং কিংবদন্তি সৈয়দ কিরমানি। যে দলে ছিলে গুন্ডাপা বিশ্বনাথ, রজার বিনি, অংশুমান গায়কোয়াড়ের মত ক্রিকেটাররা। ভারতের বিখ্যাত স্পিন কোয়ার্টেটের অন্যতম ও পরে আম্পায়ার হিসেবে নাম কুড়ানো এস ভেঙ্কটরাঘবন শুনিয়েছেন, ২৫ রান করেই কিভাবে একটি টেস্টে পেয়েছিলেন সেরা ব্যাটসম্যানের পুরস্কার!

হায়দাবাদের কিছুতে ভিভিএস লক্ষ্মণ থাকবেন না, তো কী করে হয়! তার অন ড্রাইভ আর ফ্লিকের মতোই আনন্দদায়ী একটি লেখা উপহার দিয়েছেন ‘ভেরি ভেরি স্পেশাল’। আজ থেকে অনেক বছর আগে হায়দরাবাদে মইন-উদ-দৌলা ট্রফিতে খেলতে আসা বাংলাদেশ দলের আকরাম খানকে মনে রেখেছেন। এখনও তার চোখে ভাসে সেই দলের মোহাম্মদ রফিককে খেলা কতটা কঠিন ছিল!

শোনালেন একটি চমকপ্রদ গল্পও। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের স্কোয়াডে ছিলেন লক্ষ্মণ। অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি বলেছিলেন ম্যাচে ওপেন করতে। কিন্তু নির্বাচকরা বলে দিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে ওপেনার হিসেবে ভাবা হচ্ছে না লক্ষ্মণকে। তিনিও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সৌরভের প্রস্তাব। ভারত ৫ ব্যাটসম্যান নিয়ে খেলায় সেই টেস্টে সুযোগই পাননি লক্ষ্ণন। তবে ম্যাচের প্রায় সবকিছুই মনে আছে তার।

বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে লক্ষনের বেশ জানাশোনাটাও স্পষ্ট হয়ে ফুটেছে লেখায়। তামিম ইকবাল তার মতে দুর্দান্ত এক ব্যাটসম্যান, সাকিব সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, মুশফিক নির্ভরযোগ্য। আর টেস্ট না খেললেও টেস্ট দলে মাশরাফির প্রভাব অনেক, কারণ “প্রজন্মের সব ক্রিকেটারের জন্যই মাশরাফি বড় অনুপ্রেরণা।” সানরাইজার্স হায়দরাবাদের মেন্টর হিসেবে মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কাটানো সময় পেয়েছে তার লেখায় বিশেষ জায়গা।

স্মরণিকাটিতে দারুণ চমক বাংলাদেশের উপস্থিতি। এক সময়ের দারুণ ড্যাশিং ও স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান, এখন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ইউসুফ রহমান বাবুর লেখা আছে শুরুর দিকেই।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রায় শুরু থেকেই জড়িয়ে থাকা সংগঠক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম লিখেছেন হায়দরাবাদের সঙ্গে সম্পর্কের শুরু ও পথচলা। অভিষেক টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলামের লেখাতেও উঠে এসেছে এই সম্পর্কের কথা।

লেখাগুলোর শোভা বাড়িয়েছে কালের সাক্ষী হয়ে থাকা সব ছবি। একটি ছবির কথা না বললেই হয়। ১৯৮০ সালে মইন-উদ-দৌলা ট্রফিতে খেলতে এসেছিল আজাদ বয়েজ ক্রিকেট ক্লাব। সেই দলে সৈয়দ আশরাফুল হকের সঙ্গে করমর্দন করছেন অন্ধ্র প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর কে.সি. আব্রাহাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মান সিং জানালেন, বাংলাদেশকে পেয়েই আবার স্মরণিকা বের করার তাড়না অনুভব করেছিলেন।

“হায়দরাবাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বন্ধন অনেক পুরোনো ও অনেক শক্ত। একসময় নিয়মিতই আমাদের দলের খেলা হতো। অনেকদিন থেকে সেটি বন্ধ। এবার ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট খেলছে হায়দরাবাদে। পুরোনো সেই সম্পর্ককে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছি আমরা। চেয়েছি এখানকার সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সম্পর্কটা শুধু লোকের স্মৃতিতে নয়, লিপিবদ্ধ হয়েও থাকুক। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আর্কাইভের কাজ করবে এই স্মরণিকা।”

আর্কাইভ তো বটেই, দুই জায়গার সম্পর্কের একটি প্রামাণ্য দলিল এই স্মরণিকা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতি হায়দরাবাদের ভালোবাসার একটি স্মারকও!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক