Published : 20 Jan 2026, 05:04 PM
দুই রান হতে পারত একটু চেষ্টা করলেই। কিন্তু সিঙ্গল নিয়েই থেমে গেলেন ক্রিস ওকস। চ্যালেঞ্জটা তিনি নিজেই নিলেন। শেষ বলে মারতে হবে ছক্কা। ক্রিকেটীয় সমীকরণে কঠিনতম কাজগুলির একটু। গোটা স্টেডিয়াম তখন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায়। ফাহিম আশরাফ বল করলেন অফ স্টাম্পের বাইরে। ওকস চালিয়ে দিলেন ব্যাট। শট খেলেই তিনি বুঝে গেলেন, হাত উঁচিয়ে ইশারা করলেন বলের দিকে। সেই বল এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে ডানা মেলে আশ্রয় নিল গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের গ্যালারিতে।
১২ মৌসুমের পথচলায় অনেক স্মরণীয় ম্যাচের স্বাক্ষী হয়েছে বিপিএল। সেই তালিকায় ওপরের দিকে জায়গা করে নিল এই ম্যাচ। রোমাঞ্চে টইটম্বুর ম্যাচে শেষ বলের ছক্কায় নায়ক ক্রিস ওকস।
দুদিন আগে দলে যোগ দিয়ে মৌসুমে প্রথমবার খেলতে নামা ইংলিশ অলরাউন্ডার বল হাতেও ছিলেন দুর্দান্ত। এরপর ব্যাট হাতেও শেষ সময়ে গড়ে দিলেন ভাগ্য। ৩ উইকেটের জয়ে ফাইনালের লড়াইয়ে টিকে রইল সিলেট টাইটান্স। গতবারের মতোই এলিমিনেটর থেকে বিদায় নিল ফেভারিট রংপুর রাইডার্স।
বিপিএলে শেষ ওভারে চার ছক্কা মেরে জয়ের ঘটনা আছে। শেষ ওভারে ২৬ রান দিয়ে জয়ের কৃতিত্ব আছে। তবে এক বলে ছয় রান প্রয়োজন, সেখান থেকে জয়ের নজির এটিই প্রথম।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার রংপুর ২০ ওভারে করতে পারে ১১১ রান।
তিন ম্যাচ পর একাদশে ফিরে দারুণ বোলিংয়ে চার উইকেট শিকার করেন সৈয়দ খালেদ আহমেদ। দুটি করে উইকেট নেন ওকস ও নাসুম আহমেদ।
উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য দুরূহ ছিল, তার পরও এতটা উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই হবে, মাঝ বিরতিতে এটা ভাবতে পেরেছিলেন কম জনই। রোমাঞ্চের নানা পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত শেষ বলে জয় পায় সিলেট।
উইকেটে বাউন্স ও মুভমেন্ট দেখা যায় ম্যাচের প্রথম ওভার থেকেই। সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, উইকেট কিছুটা মন্থরও। বল থমকে এসেছে ব্যাটে।
তবে প্রথম উইকেটে দায় ছিল কেবলই ব্যাটসম্যানের। ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারে খালেদের অনেক বাইরের ডেলিভারিতে জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন তাওহিদ হৃদয় (৬ বলে ৪)।
পরের ওভারে ওকসে বলের বাজে শটে উইকেট হারান দাভিদ মালান (৯ বলে ৪)।
অধিনায়ক লিটন কুমার দাসও (৪ বলে ১) দ্রুতই অনুসরণ করেন দুই ওপেনারকে। আসরে ১১ ম্যাচ খেলে কোনো ফিফটি করতে পারলেন না বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক।
দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেননি কাইল মেয়ার্সও। পাওয়ার প্লে শেষ হতেই সালমান ইরশাদকে উড়িয়ে মেরে ধরা পড়েন তিনি কাভার সীমানায় (১৩ বলে ৮)।
৩০ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর খুশদিল শাহ ও মাহমুদউল্লাহ চেষ্টা করেন পাল্টা আক্রমণের। ক্রিজে যাওয়ার পরপরই মইন আলিকে ছক্কায় উড়িয়ে দেন মাহমুদউল্লাহ, মইন আলিকে দুটি ও মেহেদী হাসান মিরাজকে একটি ছক্কা মারেন খুশদিল।
তবে দুজনের কেউ পারেননি বড় ইনিংস খেলতে। খুশদিলকে (১৯ বলে ৩০) থামিয়ে সম্ভাবনাময় জুটি থামান নাসুম।
মাহমুদউল্লাহ এরপর কিছুটা আশা দেখান দলকে। টানা দুই বলে ছক্কা ও চার মারেন তিনি মইনকে। পরের ওভারে তার পথচলাও থামে নাসুমের বলে (২৬ বলে ৩৩)।
এরপর নুরুল হাসান সোহান কিছুক্ষণ টিকে থেকে মৌসুমে প্রথমবার দুঅঙ্ক স্পর্শ করেন। তবে পারেননি তেমন কিছু করতে। খালেদ দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে এক ওভারেই ফেরান সোহান (২৪ বলে ১৮) ও ফাহিম আশরাফকে ( ৫ বলে ৩)।
ওকসের ইয়র্কারে বোল্ড হন আলিস আল ইসলাম। শেষ ওভারে নাহিদ রানা ও মুস্তাফিজুর রহমানের কাউকে আউট করতে না পারায় প্রথমবার ৫ উইকেট হয়নি খালেদের।

এই পুঁজি নিয়ে রংপুরের প্রয়োজন ছিল শুরুতেই উইকেট। মৌসুমে প্রথমবার নতুন বল তুলে দেয় তারা মুস্তাফিজুর রহমানের হাতে। দলের দাবি মিটিয়ে উইকেটও এনে দেন তিনি প্রথম ওভারেই। বিদায় নেন তৌফিক খান তুষার।
সেই ধাক্কা সামলে পারভেজ হোসেন ইমন ও আরিফুল ইসলাম এগিয়ে নেন দলকে। পরের চার ওভারে পাঁচটি বাউন্ডারি আসে দুজনের ব্যাট থেকে।
আলিস আল ইসলাম আক্রমণে এসে আবার বদলে দেন প্রেক্ষাপট। তার দুই ওভারে দুর্দান্ত দুটি ডেলিভারিতে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে আউট হয়ে যান পারভেজ (১২ বলে ১৮) ও আফিফ হোসেন (৯ বলে ৩)।
আলিসের দুই উইকেটের মাঝে নাহিদ রানার শিকার হন আরিফুল (১৮ বলে ১৭)।
৮ ওভার শেষে সিলেটের রান তখন ৪ উইকেট ৪৪।
টালমাটাল সেই দলের হাল ধরেন স্যাম বিলিংস ও মিরাজ। দুজনের কেউই খুব সাবলিল ছিলেন না, ধুঁকেছেন বারবার। তবে উইকেট হারাননি। চোয়ালবদ্ধ লড়াইয়ে দুজন এগিয়ে নেন দলকে।
দুজনের ৫০ রানের জুটিতে বল লাগে ৫৪টি। এই ম্যাচের জন্য এটিই ছিল কার্যকর।
২৩ বলে ১৮ রান করে স্টাম্পড হন মিরাজ।
আগের দিন দলে যোগ দেওয়া বিলিংস পরিস্থিতি বুঝে নিজের সহজাত ব্যাটিংয়ের সঙ্গে আপস করে আঁকড়ে রাখেন উইকেট। ৩২ বল খেলেও কোনো বাউন্ডারি ছিল না তার। পরে রিভার্স সুইপে ছক্কা মারেন খুশদিলকে।
কিন্তু দুই ওভারে যখন প্রয়োজন ১৫ রান, ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে উড়িয়ে মারেন তিনি মুস্তাফিজকে। মিড উইকেট সীমানায় দুর্দান্ত ডাইভিং ক্যাচ নেন হৃদয়। ইংলিশ ব্যাটসম্যান ফেরেন ৪০ বলে ২৯ রান করে।
ওভারের বাকি পাঁচ বলে আসে ছয় রান। শেষ ওভারে প্রয়োজন পড়ে ৯ রানের।
প্রথম বলে ওয়াইড লং অনে পাঠিয়ে দুটি রান নেন মইন। পরের দুই বলে বড় শটের চেষ্টায় তিনি ব্যাটেই লাগাতে পারেননি। এরপর আবার হাঁকাতে গিয়ে তিনি বল তুলে দিলেন ওপরে। শর্ট থার্ড ম্যানে আলিস ক্যাচ নিতেই উল্লাসে মেতে উঠলেন রংপুরের ক্রিকেটাররা। ডাগআউটে গর্জে উঠলেন কোচ মিকি আর্থার।
এরপর পঞ্চম বলে সেই সিঙ্গল ও শেষ বলে ওকসের বীরোচিত শটে নাটকীয় জয়। খ্যাপাটে দৌড়ে মাঠে ছুটে গেলেন অধিনায়ক মিরাজ, বাঁধনহারা উদযাপনে মেতে উঠলেন সতীর্থরা।
উল্টো চিত্র রংপুরের। আলিস শুয়ে রইলেন মাটিতে, সোহান লাথি মারলে মাঠে, অন্যরা যেন হতভম্ব।
ফাইনালের ওঠার লড়াইয়ে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে বুধবারই সিলেট খেলবে প্রথম কোয়ালিফায়ারে হেরে যাওয়া দলের বিপক্ষে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
রংপুর রাইডার্স: ২০ ওভারে ১১১/৯ (মালান ৪, হৃদয় ৪, লিটন ১, মেয়ার্স ৮, খুশদিল ৩০, মাহমুদউল্লাহ ৩৩, সোহান ১৮, ফাহিম ৩, আলিস ৪, মুস্তাফিজ ২*, নাহিদ ২*; ওকস ৪-০-১৪-২, খালেদ ৪-০-১৫-৪, মইন ৪-০-৩৯-০, ইরশাদ ৩-০-১৯-১, মিরাজ ১-০-১১-০, নাসুম ৪-০-১২-২)।
সিলেট টাইটান্স: ২০ ওভারে ১১২/৭ (তৌফিক ২, পারভেজ ১৮, আরিফুল ১৭, আফিফ ৩, বিলিংস ২৯, মিরাজ ১৮, মইন ৫, ওকস ১০*, খালেদ ১*; মুস্তাফিজ ৪-০-২০-২, ফাহিম ৪-০-২৮-১, নাহিদ ৪-০-২১-১, আলিস ৪-০-১৮-২, খুশদিল ৪-০-২১-১)
ফল: সিলেট টাইটান্স ৩ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: সৈয়দ খালেদ আহমেদ।