Published : 08 Dec 2025, 10:57 AM
১৩৫-১৩৮ কিলোমিটার গতিতে বল করছেন পেসার। উইকেটকিপার কিপিং করছেন স্টাম্প ঘেঁষে। ক্রিকেটে এই দৃশ্য বিরল নয়। কিন্তু ব্রিজবেন টেস্টে অ্যালেক্স কেয়ারি যতটা লম্বা সময় ধরে ও যতটা সফলভাবে করলেন, তা খুব একটা দেখা যায় না। কেয়ারি নিজে যদিও বলছেন, ঝুঁকির কারণে অনুশীলনে এই চেষ্টা তিনি খুব একটা করেন না। তবে পারফরম্যান্সের জন্য স্তুতির জোয়ারে ভাসছেন তিনি। কিংবদন্তি কিপার ইয়ান হিলি তো অকপটেই বলছেন, বিশ্বের সেরা কিপার এখন কেয়ারি।
অ্যাশেজের ব্রিজবেন টেস্টে ব্যাট হাতেও কার্যকর ছিলেন কেয়ারি। তার ৬৯ বলে ৬৩ রানের ইনিংস অস্ট্রেলিয়ার লিডের জন্য ছিল জরুরি। তবে ব্যাটিংকে অনেক ছাপিয়ে গেছেন তিনি কিপিং পারফরম্যান্সে। আগের টেস্টেও দুর্দান্ত কিপিং করেছিলেন পার্থে। সেটিকে ছাড়িয়ে গেছেন ব্রিজবেনে। অবিশ্বাস্য ক্যাচ নিয়েছেন তো বটেই, তবে মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়েছেন পেস বোলিংয়ে স্টাম্প ঘেঁষে কিপিং করে।
আগ্রাসী ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের ক্রিজে বিচরণ সীমিত রাখতে মাইকেল নিসার, স্কট বোল্যান্ডের মতো পেসারদের বোলিংয়েও কেয়ারি কিপিং করেছেন স্টাম্প ঘেঁষে। বল তার হাত থেকে ফসকায়নি বললেই চলে। সুইং ডেলিভারি, বাউন্স, লেগ স্টাম্পের বাইরের বল, সব তিনি মুঠোয় জমিয়েছেন পরম নির্ভরতায়। স্টাম্প ঘেঁষে দাঁড়িয়েই বেন স্টোকসের ক্যাচ নিয়েছন নিসারের বলে। দুই ইনিংসেই এত লম্বা সময় পেস বোলিংয়ে কিপিং করেছেন স্টাম্প ঘেঁষে, সচরাচর দেখা যায় না তা।
অ্যাশেজের এই দুই টেস্টের পারফরম্যান্সের পর অনেকেই এখন কেয়ারিকে বলছেন বিশ্বের সেরা কিপার। তাদের মধ্যে আছেন এমন একজন, যার মতামতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেই হবে। কেয়ারিকে নিয়ে রায় দিয়ে দিলেন ইয়ান হিলি, যিনি নিজে সর্বকালের সেরা কিপারদের একজন।
“আমার মনে হয়, পরিষ্কারভাবেই সে (কেয়ারি) বিশ্বের সেরা কিপার, সম্ভবত এই টেস্টের আগে থেকেই। এমন একটি পিচ, যেখানে সবসময়ই মনে হয়েছে কিছু না কিছু হবে-তবে সবসময় ততটা বেশি হয়নি- এমন পিচে এত লম্বা সময় ফাস্ট বোলিংয়ের সামনে স্টাম্প ঘেঁষে কিপিং করার পর বিশ্বসেরা হিসেবে তার জায়গাটি আরও পোক্ত হয়েছে। এত লম্বা সময় ধরে কার্যকর হয়েছে সে, গ্লাভস থেকে বল ফসকায়নি বললেই চলে।”
দুই কিংবদন্তি ইয়ান হিলি ও অ্যাডাম গিলক্রিস্টের পর অনেকদিন অস্ট্রেলিয়ার সেরা কিপার ছিলেন ব্র্যাড হ্যাডিন। তিনিও আরও বড় সনদ দিলেন কেয়ারির কিপিং দেখে, “এর চেয়ে ভালো কিপিং প্রদর্শনী আর দেখিনি।”

কেয়ারির পারফরম্যানেস মুগ্ধ স্টিভেন স্মিথও। অস্ট্রেলিয়ার ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক বললেন, অনেক ঘাম ঝরানোর পুরস্কার পাচ্ছেন কেয়ারি।
“স্টাম্পের পেছনে তার পারফরম্যান্স ছিল অন্য পর্যায়ের। নেস (নিসার) বল করছিল কখনও কখনও ১৩৭-১৩৮ কিলোমিটার গতিতে। বোল্যান্ড প্রায় একই রকমের। সে (কেয়ারি) বল ডেলিভারির পেছনে ঠিকঠাক যেতে পেরেছে এবং গ্লাভসে জমানোর কোনো একটা পথ বের করে ফেলেছে। ব্যাটারের প্যাডে লাগার পরও কোনো না কোনোভাবে তার গ্লাভসে ঠিকই গেছে।”
“সে কঠোর পরিশ্রম করে। যে কারও মতোই সে ফিট। দিনের পর দিন নিজেকে মেলে ধরে। ভুল প্রায় করে না বললেই চলে, অবিশ্বাস্য সব ক্যাচ নেয়।”
অনেকটা সময় স্লিপে ফিল্ডিং করায় স্মিথ আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন, কতটা স্পেশাল ছিল কেয়ারির পারফরম্যান্স।
“আমি যখন স্লিপে ছিলাম আর সে স্টাম্প ঘেঁষে কিপিং করছিল, আমাকে অনেকটা সরে দাঁড়াতে হয়েছিল, কারণ এতটা বেশি দূরত্ব সে পাড়ি দেয়। বল যেখানেই থাকুক, কোনো না কোনোভাবে তার হাত ঠিকই পৌঁছে যায়। এমন মনে হয়, সে ঠিকই জানে কখন ব্যাটের কানায় লাগবে বল আর তার হাত সেখানে প্রস্তুত থাকবে। যত ভালো কিপিং প্রদর্শনী দেখেছি, এটা তার মধ্যে থাকবে নিশ্চিতভাবেই।”
চারপাশ থেকে স্তুতির যে জোয়ার বইছে, তাতে বেশ আপ্লুত কেয়ারি। যদিও উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছেন না ৩৪ বছর বয়সী কিপার।
“নিজের প্রচেষ্টায় আমি বেশ গর্বিত। সত্যিকার অর্থেই ভালো বোলিংয়ের সামনে স্টাম্পের কাছ থেকে কিপিংয়ের সুযোগ এসেছিল, বোলাররা নিয়মিতই ব্যাটকে পরাস্ত করছিল। সেখানে মনে হয়েছে, দলের জন্য খুব একটা খারাপ করিনি! বোলাররাও সুযোগগুলো তৈরি করে অসাধারণ কাজ করেছে।”
চমকপ্রদ তথ্যটি এরপরই জানালেন কেয়ারি। পেস বোলিংয়ে স্টাম্প ঘেঁষে কিপিংয়ের অনুশীলন নাকি তিনি করেন না তেমন একটা। ম্যাচের সময় প্রয়োজন বুঝেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
“অনুশীলনে ফাস্ট বোলিংয়ের সামনে স্টাম্পের কাছ ঘেঁষে কিপিং করি না। কারণ, কখনও কখনও তা বিপজ্জনক হতে পারে। অনুশীলনে তো বেশি কাজ করা হয় মৌলিক দিকগুলো নিয়েই। স্টাম্প ঘেঁষে দাঁড়ানো অনুশীলন করি মূলত ন্যাথান লায়নের বোলিংয়ের জন্য, অনেক ড্রিল করি, থ্রো নেই, ভালো পজিশনে থাকার চেষ্টা করি।”
“ম্যাচে অনেক সময় যেটা হয়, তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে অনেক সহজাত প্রবৃত্তিকে আলিঙ্গন করে নিতে হয়। নিজের ভাবনার ওপর আস্থা রাখতে হয়, সহজাত প্রবৃত্তির ওপর ভরসা রাখতে হয় এবং এরপর সেটি কাজে লাগাতে সঠিক জায়গায় থাকতে হয়।”
পার্থের পর ব্রিজবেনেও জিতে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে অ্যাশেজ ধরে রাখার কাছাকাছি এখন অস্ট্রেলিয়া। পরের টেস্ট অ্যাডিলেইডে শুরু ১৭ ডিসেম্বর।