Published : 11 Mar 2026, 08:57 AM
“সবাই খুব ভালো আছে, ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে, সবাই অনেক খুশি…”, দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনের একদম শেষ দিকে বললেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তাদের এই খুশি মাঠে ফিরতে পারায়। টেস্ট আর ওয়ানডেতে এই বছর তুমুল ব্যস্ত সময় কাটবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের। সামনের সময়টায় একটু দম ফেলার ফুরসত খুঁজে, একটু বিরতির জন্য হাপিত্যেশ করবেন ক্রিকেটাররা। তবু পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজে মাঠে নামার জন্য তর যেন সইছে না তাদের। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে না পারার যে শূন্যতার অনুভূতি আর যন্ত্রণাময় বিরতি, সেটির শেষ হওয়ার কাতর অপেক্ষায় যে ছিলেন তারা!
বিশ্বকাপ-বেদনার ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার জন্য জরুরি আন্তর্জাতিক সিরিজে বুঁদ থাকা। কাঙ্ক্ষিত সেই সিরিজটি অবশেষে শুরু হচ্ছে। তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে বুধবার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে খেলা শুরু দুপুর সোয়া ২টায়।
আইসিসির ভবিষ্যৎস সফরসূচি অনুযায়ী, এই সফরে দুটি টেস্ট আর তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলার কথা ছিল দুই দলের। তবে পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) জন্য বদল আনতে হয়েছে সেখানে। এবার শুধু ওয়ানডে সিরিজ খেলতেই এসেছেন শাহিন শাহ আফ্রিদি, সালমান আলি আগা, মুহাম্মাদ রিজওয়ানরা। পিএসএল শেষে মে মাসে আবার পাকিস্তানিরা আসবেন টেস্ট সিরিজ খেলতে। পরিবর্তিত সূচিতে কাটা পড়েছে টি-টোয়েন্টি সিরিজ।

শুধু মাঠে ফেরার তাড়নার জন্যই নয়, এই ওয়ানডে সিরিজটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামনে তাকিয়েও। কোচ ফিল সিমন্স সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এই সিরিজ দিয়েই ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পথে যাত্রা শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের। কোচের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে মঙ্গলবার অধিনায়ক মিরাজও বললেন, বিশ্বকাপকে ঘিরেই ভাবনা ও পরিকল্পনার পথ ধরে এগোতে চান তারা।
সেই পথে আপাতত সবচেয়ে জরুরি র্যাঙ্কিংয়ের উন্নতি। বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা করে নিতে হলে র্যাঙ্কিংয়ে ওপরের দিকে উঠতে হবে ক্রমাগত। আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে এখন ১০ নম্বরে আছে বাংলাদেশ। ঠিক ওপরে আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গত অক্টোবরে ক্যারিবিয়ানদের সিরিজ হারানোর পর তাদের চেয়ে এখন মাত্র ১ পয়েন্ট পেছনে আছে বাংলাদেশ (৭৬ পয়েন্ট)। র্যাঙ্কিংয়ের চারে থাকা পাকিস্তানকে (১০৫ পয়েন্ট) সিরিজে হারাতে পারলে এক ধাপ এগিয়ে উঠে যাবে ৯ নম্বরে।
পাকিস্তানতে ২-১ ব্যবধানে হারাতে পারলে বাংলাদেশের পয়েন্ট হবে ৭৯, ৩-০ ব্যবধানে হারাতে পারলে পয়েন্ট হবে ৮১।
দুই দলের সবশেষ ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানেই জিতেছিল বাংলাদেশ। তবে সেই সিরিজটির বয়স ১১ বছর হতে চলেছে! বদলে গেছে অনেক কিছুই।
র্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে থাকলেও তাদের দলের গঠন দেখে আশার আলো দেখতে পারে বাংলাদেশ। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ও গত এক বছরে সর্বোচ্চ রান করা বাবর আজমকে এই সিরিজে নেওয়া হয়নি, ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দারুণ শুরু করা অলরাউন্ডার সাইম আইয়ুবকেও বাইরে রাখা হয়েছে। কখনও ওয়ানডে ক্রিকেট না খেলা ৬ ক্রিকেটার আছেন দলে! বোলিংয়ে দলটির স্বাভাবিক সময়ের শক্তি থাকলেও ব্যাটিংয়ে স্রেফ রিজওয়ান ছাড়া অভিজ্ঞ নাম নেই একটিও। বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তো বটেই!
অধিনায়ক মিরাজ অবশ্য ক্রিকেটীয় রীতি মেনেই সর্বোচ্চ সমীহই জানালেন প্রতিপক্ষকে।

“কোনো দলকেই হালকা করে নেওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবাই ভালো দল। কিছু তরুণ ক্রিকেটার নিয়ে এসেছে তারা, তবে পারফর্ম করেছে বলেই তো দলে সুযোগ পেয়েছে। আমাদের বাড়তি সুবিধা যে ঘরের মাঠে খেলছি, নিজেদের সম্পর্কে আমরা জানি, সবাই অনেক স্বচ্ছ। এখন দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হবে। তবে তাদেরকে আমরা অবশ্যই অনেক সম্মান করি।”
সবশেষ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মন্থর ও নিচু বাউন্সের উইকেট বেছে নেওয়া হয়েছিল। তবে এবার উইকেটে থাকছে ঘাসের ছোঁয়া, বাউন্স ও ক্যারি থাকার কথা ভালোই। মিরাজ জানিয়েছেন, আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত বেশির ভাগ ম্যাচ তারা এই ধরনের উইকেটেই খেলতে চান।
ওয়ানডে ক্রিকেটে সামনের সময়টায় বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটতে পারে, কেমন খেলতে পারে, সেসবের আভাস কিংবা স্পষ্ট ছবিও মিলতে পারে এই সিরিজ থেকে।
একাদশ বাছাইয়ে টপ অর্ডারে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে টিম ম্যানেজমেন্টের- সৌম্য সরকার, তানজিদ হাসান ও সাইফ হাসানের মধ্যে কোন দুজনকে বেছে নেওয়া হবে একাদশে। তিনজনকেই একাদশে রাখার সুযোগও অবশ্য আছে, সেক্ষেত্রে ব্যাটিং অর্ডারের তিন-চার নম্বর পজিশন নিয়েও ভাবতে হবে, নাজমুল হাসান শান্তকে তিনে খেলানো হবে নাকি চারে।
পাঁচে যে লিটন কুমার দাস খেলবেন, সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে আগেই। ওয়ানডেতে চরম দুঃসময়ে থাকা অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানকে কার্যকর ভূমিকায় পেতে আপাতত এটিই দাওয়াই মনে করছে টিম ম্যানেজমেন্ট। ছয়ে হয়তো খেলবেন তাওহিদ হৃদয়, সাতে মেহেদী হাসান মিরাজ, আটে রিশাদ হোসেন। তাসকিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে পেস আক্রমণে থাকবেন নাহিদ রানা কিংবা শরিফুল ইসলামের একজন।
পাকিস্তান অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি ম্যাচের আগের দিনই নিশ্চিত করেছেন, তাদের ব্যাটিং অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যানই থাকবেন অভিষিক্ত। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়া সাহিবজাদা ফারহান এবার দেখাবেন তার ওয়ানডে সামর্থ্য। টি-টোয়েন্টিতেই বড় ইনিংস খেলতে পছন্দ করেন তিনি, ওয়ানডেতে সেই হাতছানি আরও বেশি থাকবে তার।
তার সঙ্গে ইনিংস শুরু করবেন তরুণ অলরাউন্ডার মাজ সাদাকাত, পাকিস্তানের ক্রিকেটে যাকে মনে করা হচ্ছে দারুণ সম্ভাবনাময়। তিনে নামবেন আরেক প্রতিভাবান তরুণ শামিল হোসেন। মিডল অর্ডারে রিজওয়ান, সালমান আগারা থাকবেন। নবীন লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডার সাদ মাসুদকে খেলানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদের। স্পিন আক্রমণে আবরার নিশ্চিতভাবেই থাকছেন। বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার ফায়সাল আকরামের খেলা নির্ভর করবে হয়তো উইকেট বুঝে দলীয় ভারসাম্যের ওপর। পেস বোলিং অলরাউন্ডার ফাহিম আশরাফের সঙ্গে পেস আক্রমণে শাহিন আফ্রিদি, হারিস রউফরা আছেন।
র্যাঙ্কিংয়ের অবস্থানই বলে দিচ্ছে, ওয়ানডেতে বেশ ভালো খেলছে এখন পাকিস্তান। দেশের মাঠে বাংলাদেশের প্রতি সম্মান জানিয়েই নিজেদের সাফল্যের ধারা ধরে রাখার কথা বললেন অধিনায়ক আফ্রিদি।
“দেশের কন্ডিশনে যে কোনো দলই নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলে। বাংলাদেশের দলটি খুব ভালো এবং দেশের মাঠে সবসময় ভালো ক্রিকেট খেলে তারা। গত সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছে, আরও অনেক জিতেছে। আমরাও ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি এবং সবশেষ দুই সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকা ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছি। খুব ভালো ক্রিকেট খেলছি আমরা এবং সেটিই ধরে রাখতে চাই।”
বিশ্বকাপে তাকিয়েই যে একগাদা তরুণকে নেওয়া হয়েছে এই সিরিজে, সেটিও নিশ্চিত করেছেন আফ্রিদি।
র্যাঙ্কিংয়ে এই সিরিজ থেকে কিছু পেতে হলে বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করতে হবে পাকিস্তানের। ৩-০ ব্যবধান জিতলে একটি রেটিং পয়েন্ট মিলবে তাদের। ২-১ ব্যবদানে জিতলেও পয়েন্ট হারাতে হবে একটি।
পাকিস্তানের তাই কিছু প্রাপ্তির চেয়ে হারানোর শঙ্কা বেশি। বাংলাদেশের পাওয়ার আছে অনেক কিছুই।