রেকর্ডময় ইনিংসে তামিমকে ছাড়িয়ে ৩৫০ রানে ইনিংস ছাড়লেন হৃদয়
ইতিহাস গড়া ইনিংসে একগাদা রেকর্ড গড়ে শেষ পর্যন্ত আউট হলেন না তাওহিদ হৃদয়, ইনিংস ঘোষণা করলেন ৩৫০ রানে অপরাজিত থেকে।
টেপো এনটুলির বল মিড উইকেটে ঠেলে সিঙ্গল নিয়ে তাওহিদ হৃদয় পূর্ণ করলেন ৩৫০ রান। এবার আর কোনো উদযাপন নয়, বরং আম্পায়ারে দিকে ‘থামস আপ’ দেখালেন। সঙ্কেত দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, ম্যারাথন ব্যাটিংয়ের এখানেই সমাপ্তি। ইনিংস ঘোষণা করলেন বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অধিনায়ক।
রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়া ইনিংসটিতে শেষ পর্যন্ত আউট হলেন না হৃদয়। অপরাজিত রয়ে গেলেন ৪৮১ বলে ৩৫০ রানে। মাঠের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিপক্ষ ফিল্ডাররা এসে অভিনন্দন জানালেন তাকে, পিঠ চাপড়ে দিলেন, হাত মেলালেন হাতে। মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সতীর্থদের সবাই ড্রেসিং রুমের সামনে এসে বরণ করে নিলেন তাকে।
পচেফস্ট্রুমের এই মাঠেই ২০২০ যুব বিশ্বকাপজয়ী দলে ছিলেন হৃদয়। সেখানেই এবার রচিত হলো তার ক্যারিয়ারের আরেকটি গৌরবময় অধ্যায়।
অধিনায়কের কীর্তিময় ব্যাটিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে দ্বিতীয় আনঅফিসিয়াল টেস্টে ৮ উইকেটে ৬৭৬ রানে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ ‘এ’ দল।
হৃদয়ের ৩৫০ রানের ইনিংসে চার ২৭টি, ছক্কা ১০টি।
এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সাড়ে তিনশ ছুঁতে পারলেন। পেছনে পড়ে গেল তামিম ইকবালের ৩৩৪ রান।
দেশের বাইরে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের ২২০ রানও ছিল না আগে।
২০৪ রান নিয়ে ম্যাচের শেষ দিনটি শুরু করা হৃদয় একের পর এক রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন সকাল থেকেই। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার আগের সেরা ২১৭ ছাড়িয়ে গেছেন।
পরে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন শাহরিয়ার হোসেনকে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের দেশের বাইরে সর্বোচ্চ ছিল সাবেক এই ওপেনারের। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে করাচিতে ডিফেন্স হাউজিং অথোরিটির বিপক্ষে ২১৮ রান করেছিলেন তিনি।
অপর প্রান্তে নাঈম হাসান ও হাসান মুরাদ বিদায় নেন অল্প রানে। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অষ্টম উইকেট পতনের সময় হৃদয়ের রান ২২৫। কিন্তু দশে নামা রেজাউর রহমান রাজা দারুণ ব্যাটিংয়ে ভরসা জোগান সঙ্গীকে। ব্যস, রেকর্ডের পথচলা চলতে থাকে।
২৫০ পূর্ণ করেন তিনি ৩৮১ বলে। লাঞ্চে যান ২৭৪ রান নিয়ে।
জুটি ভাঙতে তৃতীয় নতুন বল নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে লাভ হয়নি তাতেও। ৪৫০ বল খেলে হৃদয় পৌঁছে যান তিনশতে।
সেখানেই না থেমে বরং ছুটতে থাকেন তিনি আরও গতিময়তায়। চা বিরতিতে যান ৩৩৩ রান নিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক মার্কের আকারম্যান তার কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, ইনিংস ঘোষণা করা হবে কি না। কিন্তু হৃদয় জানিয়ে দিলেন, ব্যাটিং চালিয়ে যাবেন বিরতির পরও।
সেটির কারণ বোঝা গেল বিরতির একটু পরই। ৩৫০ ছোঁয়ার জন্যই ছিল অপেক্ষা।
তিনশ থেকে সাড়ে তিনশতে যান তিনি স্রেফ ৩১ বলেই।
এই পরিক্রমায় পেছনে ফেলেন তিনি রকিবুল হাসানের ৩১৩ আর তামিমের ৩৩৪ রানকে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি ছিল এতদিন এই দুজনেরই।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ট্রিপল সেঞ্চুরি ছিল এতদিন শুধু ডেনিস কম্পটনের। সেই ১৯৪৮ সালে এমসিসির হয়ে ৩০০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন ইংলিশ গ্রেট।
তিনশ ছুঁয়ে সামনে এগিয়ে হৃদয় ছাড়িয়ে গেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক ব্যাটসম্যানকেও। শেষ পর্যন্ত যেখানে থেমেছেন, সেখানে তার ওপরে আছেন কেবল একজন। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংসটি হৃদয়ের। তার ওপরে আছেন কেবল স্টিভেন কুক। ১১ টেস্ট খেলা ওপেনার ২০০৯ সালে লায়ন্সের হয়ে ৩৯০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন ৬৪৮ বল খেলে।
বাংলাদেশ ‘এ’ দলের ইনিংস ঘোষণার সময় হৃদয়ের সঙ্গে অষ্টম উইকেটে রেজাউরের অবিচ্ছিন্ন জুটির রান ছিল ১৫৭। চারটি চার ও দুই ছক্কায় ১১০ বলে ৩১ রানে অপরাজিত থাকেন রেজাউর।
১৬৪ রানে এগিয়ে থেকে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ ‘এ’ দল।
প্রোটিয়াদের বাঁহাতি স্পিনার কাইল সিমন্ডস চারটি উইকেট নিলেও রান দেওয়ার প্রায় ট্রিপল সেঞ্চুরি করে ফেলেন। অফ স্পিনার টেপো এনটুলিও রান দেওয়ার ডাবল সেঞ্চুরি করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল দ্বিতীয় ইনিংসে ১২ ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে ১৮ রান তোলার পর ড্র মেনে নেয় দুই দল।
প্রিটোরিয়ায় প্রথম আনঅফিসয়াল টেস্টে ইনিংস ও ৪১৩ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ ‘এ’ দল। সেখান থেকে এই ম্যাচকে বলা হয় অভাবনীয় পরিবর্তন।
ম্যান অব দা ম্যাচ অনুমিতভাবেই হৃদয়। আগের ম্যাচে ডাবল সেঞ্চুরি ও এই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে ম্যান অব দা সিরিজ সিনেথেম্বা কেশিলে।
দুই দল এখন খেলতে একদিনের ম্যাচের সিরিজ। রোববার ব্লুমফন্টেইনে শুরু তিন ম্যাচের সিরিজটিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন এই হৃদয়ই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল ১ম ইনিংস: ৫১২
বাংলাদেশ ‘এ’ দল ১ম ইনিংস: ১৯১.২ ওভারে ৬৭৬/৮ (ডি.) (আগের দিন ৪৭১/৬) (হৃদয় ৩৫০*, নাঈম ১৬, মুরাদ ১১, রেজাউর ৩১*; মোরেকি ২৫-৬-৬৩-২, বোস্ট ২৫-২-৯২-১, সিমন্ডস ৫৯-৩-২৯৩-৪, পটগিটার ২০-৮-৪৬-০, এনটুলি ৫৪.২-৭-২১৪-১, আকারম্যান ৮-১-২১-০)।
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল ২য় ইনিংস: ১২ ওভারে ১৮/০
ফল: ম্যাচ ড্র।
সিরিজ: ২ ম্যাচের সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল ১-০ ব্যবধানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: তাওহিদ হৃদয়।
ম্যান অব দা সিরিজ: সিনেথেম্বা কেশিলে।
