Published : 29 Sep 2025, 02:29 AM
আগের দুই ম্যাচের দুটিই একপেশে লড়াই। ফাইনালের মঞ্চে শক্ত অবস্থানে থেকে নাটকীয় ব্যাটিং ধসে যখন দেড়শর নিচে গুটিয়ে গেল পাকিস্তান, আরেকটি নিরুত্তাপ সমাপ্তির আভাসই পাওয়া যাচ্ছিল তখন। কিন্তু এবার বোলিংয়ে দারুণ লড়াই করল পাকিস্তান। শুরুতেই ভারতকে চেপে ধরল তারা তিন উইকেট নিয়ে। তবে তিলাক ভার্মার চমৎকার ইনিংস ও দুটি পঞ্চাশোর্ধ জুটিতে রোমাঞ্চের নানা ধাপ পেরিয়ে আরেকবার এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হলো ভারত।
এশিয়া কাপের ৪১ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার হলো ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল। রোমাঞ্চ-উত্তেজনায় ঠাসা লড়াইয়ে টি-টোয়েন্টির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা জিতল ৫ উইকেটে।
আসরে তিনবারের দেখায় তিনবারই পাকিস্তানকে হারিয়ে নবমবারের মতো এশিয়া কাপ জিতল প্রতিযোগিতাটির সফলতম দল ভারত।
দুবাইয়ে রোববার ত্রয়োদশ ওভারে ১ উইকেটে ১১৩ রানের ভালো অবস্থানে থেকে অন্তত ১৮০ রানে চোখ রাখছিল পাকিস্তান। কিন্তু ৩৩ রানের মধ্যে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৪৬ রানে গুটিয়ে যায় তারা পাঁচ বল বাকি থাকতে।
জবাবে ২০ রানে ৩ উইকেট হারালেও, তিলাকের পঞ্চাশোর্ধ ইনিংসে দুই বল বাকি থাকতে জয়ের ঠিকানায় পৌঁছে যায় চোটাক্রান্ত হার্দিক পান্ডিয়াকে ছাড়া খেলতে নামা ভারত।
৫৩ বলে অপরাজিত ৬৯ রানের ইনিংস খেলে ফাইনালের নায়ক তিলাক। চারটি ছক্কা ও তিনটি চারে গড়া তার ইনিংসটি। দুটি করে চার ও ছক্কায় ২২ বলে ৩৩ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন শিভাম দুবে।
জয়ের জন্য শেষ ওভারে ভারতের দরকার ছিল ১০ রান। হারিস রউফের প্রথম বলে দুই রান নেওয়ার পর ছক্কায় ওড়ান তিলাক। পরের বলে এক রান নিয়ে স্কোর সমান করেন তিনি। চতুর্থ বল মিড-অফ ফিল্ডারের ওপর দিয়ে চার মেরে জয় নিশ্চিত করেন রিঙ্কু সিং, আসরে প্রথমবার খেলতে নামা বাঁহাতি ব্যাটসম্যান খেলেছেন কেবল এই একটি বলই!
ভারতের জয়ের ভিতটা গড়ে দেন অবশ্য বোলাররা। তাদের তিন স্পিনার মিলে শিকার করেন ৮ উইকেট। চার ওভারে ৩০ রানে ৪ উইকেট নিয়ে দলের সফলতম বোলার কুলদিপ ইয়াদাভ। সাত ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিও এই বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার।
আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক আভিশেক শার্মা ফাইনালে অবশ্য জ্বলে উঠতে পারেননি। ছোট লক্ষ্য তাড়ায় দ্বিতীয় বলে চার মেরে শুরু করলেও ৫ রানে শেষ হয় তার ইনিংস। দ্বিতীয় ওভারে আক্রমণে এসে বিস্ফোরক ওপেনারকে বিদায় করেন ফাহিম আশরাফ। শাহিন শাহ আফ্রিদি দ্রুত বিদায় করে দেন সুরিয়াকুমার ইয়াদাভকে। দুজনই ক্যাচ দেন স্লোয়ার বলে।
১০ বলে ১২ রান করে শুবমান গিল ফিরলেন যখন, তিন ওভারে ২০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ভীষণ চাপে ভারত।
সেমি-ফাইনালে পরিণত হওয়া সুপার ফোরের ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৩৫ রানের পুঁজি নিয়ে ১১ রানের জয় পেয়েছিল পাকিস্তান। এবারও হয়তো তেমন কিছুর আশাই তারা করছিল।
দ্রুত কয়েকটি বাউন্ডারি মেরে জেঁকে বসা চাপ সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিলাক। আরেক প্রান্তে সাঞ্জু স্যামসন আউট হতে পারতেন ১২ রানে, কিন্তু ক্যাচ ফেলেন হুসাইন তালাত। জমে ওঠে দুই ব্যাটসম্যানের জুটি।
স্যামসনকে (২১ বলে ২৪) ফিরিয়ে ৫৭ রানের জুটি ভাঙেন লেগ স্পিনার আবরার আহমেদ। পরের ওভারে তিলাককে রান আউট করার সুযোগ হাতছাড়া করেন কিপার মোহাম্মদ হারিস।
তিলাক ও দুবের জুটি এরপর এগিয়ে নেয় ভারতকে। শেষ ছয় ওভারে ভারতের দরকার ছিল ৬৪ রান। রউফের করা পঞ্চদশ ওভারে দুই ব্যাটসম্যান তোলেন ১৭ রান।
১৩ বলে দরকার যখন ২৩ রান, রউফকে ছক্কায় উড়িয়ে ব্যবধান কমিয়ে আনেন দুবে। ১৯তম ওভারে ফাহিমকে একটি চার মেরে শেষ বলে দুবে আউট হয়ে ফেরেন।
দুবেকে ফিরিয়ে হয়তো কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল পাকিস্তান শিবিরে, তবে সেই আশা শেষ ওভারে গুঁড়িয়ে দেন তিলাক ও রিঙ্কু।
অথচ ম্যাচের শুরুটা কী দারুণ হয়েছিল পাকিস্তানের। টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে খুব আগ্রাসী না হলেও পাওয়ার প্লেতে আসে বিনা উইকেটে ৪৫ রান।
দারুণ সব শট খেলে সাহিবজাদা ফারহান ফিফটি করেন ৩৫ বলে। ভারতের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে পঞ্চাশ স্পর্শ করলেন তিনি।
দশম ওভারে ভারুন চক্রবর্তিকে ছক্কার পরের বলে আরেকটির চেষ্টায় ক্যাচ দিয়ে শেষ হয় ৫ চার ও ৩ ছক্কায় গড়া সাহিবজাদার ৩৮ বলে ৫৭ রানের দারুণ ইনিংস।
আসরে আগের ছয় ম্যাচের চারটিতে শূন্য রানে ফেরা সাইম আইয়ুব এদিন দুটি চার মেরে শুরুটা ভালোই করেন। ত্রয়োদশ ওভারে কুলদিপের বলে সাইমের বিদায়ের পরই মূলত পাল্টে যায় চিত্র।
পরের ওভারে আকসার প্যাটেলের বলে শূন্য রানে ফেরেন হারিস। ভারুনকে একটি ছক্কা মেরে পরের বলে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন ফাখার জামান (৩৫ বলে ৪৬)। হুসাইন তালাকে ফিরিয়ে দ্বিতীয় শিকার ধরেন আকসার।
সপ্তদশ ওভারে মাত্র এক রান দিয়ে সালমান আলি আগা, আফ্রিদি ও ফাহিমের উইকেট তুলে নেন কুলদিপ। পরপর দুই ওভারে শেষ দুটি উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের ইনিংস গুটিয়ে দেন পেসার জাসপ্রিত বুমরাহ। ভারতের বিপক্ষে সুপার ফোরের ম্যাচে হাত দিয়ে বিমান বানিয়ে তা ভূপাতিত হওয়ার উদযাপন করেছিলেন রউফ, তাকে বোল্ড করে একইরকম ভঙ্গি করেন বুমরাহ।
প্রথম তিন ব্যাটসম্যান ছাড়া পাকিস্তানের আর কেউ দুই অঙ্কে যেতে পারেননি।
তখনও কে জানত, রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে শেষ হবে ফাইনাল!
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের বিপক্ষে মুখোমুখি লড়াইয়ে একচেটিয়া দাপটও ধরে রাখল ভারত। টি-টোয়েন্টিতে দুই দলের ১৬ বারের দেখায় ১৩টিতে জিতল তারা। সবশেষ পাঁচ ম্যাচের সবকটিতে জয় ভারতের।
এবারের এশিয়া কাপে এই দুই দলের ম্যাচ নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। গ্রুপ পর্বে টসের সময় পাকিস্তান অধিনায়ক সালমানের সঙ্গে হাত মেলাননি ভারত অধিনায়ক সুরিয়াকুমার। ম্যাচের পর পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত না মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটাররা মাঠ ছেড়ে ড্রেসিং রুমে গিয়ে দরজা আটকে দেন।
প্রতিবাদে সেদিন ম্যাচের পর পুরস্কার বিতরণী আয়োজন বর্জন করেন সালমান। পাকিস্তান দল পরে বর্জন করে সংবাদ সম্মেলন। সেই ঘটনার জের ধরে অনেক কিছুই হয়ে যায়। পরেও একাধিক সংবাদ সম্মেলন বর্জন করে পাকিস্তান। ম্যাচ রেফারির অপসারণের দাবি তুলে টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানো হুমকিও তারা দিয়েছিল।
ওই ম্যাচের পরের মন্তব্যের জন্য জরিমানা করা হয় সুরিয়াকুমারকে। সুপার ফোর পর্বে দুই দলের ম্যাচে বিতর্কিত উদযাপনের জন্য জরিমানা করা হয় পাকিস্তানের রউফকে, সতর্ক করা সাহিবজাদাকে।
ফাইনালে শেষেও হাত মেলায়নি দুই দল। ভারত যখন উদযাপনে ব্যস্ত, পাকিস্তান শিবির তখন হতাশার, স্বপ্নভঙ্গের আঁধারে নিমজ্জিত।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
পাকিস্তান: ১৯.১ ওভারে ১৪৬ (ফারহান ৫৭, ফাখার ৪৬, সাইম ১৪, হারিস ০, সালমান ৮, তালাত ১, নাওয়াজ ৬, আফ্রিদি ০, ফাহিম ০, রউফ ৬, আবরার ১*; দুবে ৩-০-২৩-০, বুমরাহ ৩.১-০-২৫-২, ভারুন ৪-০-৩০-২, আকসার ৪-০-২৬-২, কুলদিপ ৪-০-৩০-৪, তিলাক ১-০-৯-০)
ভারত: ১৯.৪ ওভারে ১৫০/৫ (আভিশেক ৫, গিল ১২, সুরিয়াকুমার ১, তিলাক ৬৯*, স্যামসন ২৪, দুবে ৩৩, রিঙ্কু ৪*; আফ্রিদি ৪-০-২০-১, ফাহিম ৪-০-২৯-৩, নাওয়াজ ১-০-৬-০, রউফ ৩.৪-০-৫০-০, আবরার ৪-০-২৯-১, সাইম ৩-০-১৬-০)
ফল: ভারত ৫ উইকেটে জিতে চ্যাম্পিয়ন
ম্যান অব দা ফাইনাল: তিলাক ভার্মা
ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট: আভিশেক শার্মা