আম্মারকে ‘বহিষ্কারের’ কথা এখন কেন প্রকাশ্যে আনল শিবির?
“এখন এসে আম্মারের শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক নেই- এমন একটি ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারকে ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে ‘বহিষ্কারের’ এক বছর পর হঠাৎ কেন সেই তথ্য সামনে আনল ছাত্র সংগঠনটি, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আম্মার যে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত তা বুধবারের আগে স্বীকারই করেনি ছাত্রশিবির। সেদিন তাদের নেতারা বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথি’ ছিলেন আম্মার; বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
অথচ গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর রাকসু নির্বাচনে লড়তে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ নামের একটি প্যানেল ঘোষণা করেছিলেন সাবেক সমন্বয়করা। সাংবাদিকরা সেদিন প্রশ্ন রেখেছিলেন, এটি শিবিরের ‘ডামি প্যানেল’ বা ‘ছায়া দল’ কি না।
তখন সালাহউদ্দিন আম্মার বলেছিলেন, “আমার কাছে এই কথাগুলোকে অযাচিত বলে মনে হয়। কারণ আমার বিশ্বাস, শিবির কখনোই এমন কোনো প্যানেল গঠন করবে না যেটা তাদের নিজেদের নয়।
“তারা আলাদা প্যানেল দিয়েছে। আমরা আলাদা দিয়েছি। এখানে ‘ডামি’ বা ‘ছায়া দল’ হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।”
সেই প্যানেলে ভিপি পদপ্রার্থী ছিলেন মেহেদী সজীব, যিনি পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক হন।
এরপর আম্মারের শিবির সম্পৃক্ততার তথ্য এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে আনা হলো, যখন রাকসুর মেয়াদই আছে মাত্র এক মাস।
ছাত্রশিবির এখন আম্মারকে একসময়ের নিজেদের নেতা হিসেবে স্বীকার করলেও তার এই রাজনৈতিক যোগের কথা ক্যাম্পাসে আগে থেকেই চাউর ছিল। এতদিন তা স্বীকার না করা কিংবা বহিষ্কারের এক বছর পর তা প্রকাশ্যে আনার পেছনে শিবিরের ‘রাজনৈতিক কৌশল’ দেখছেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা।
তাদের ধারণা, আম্মারের সমালোচনামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ছাত্রশিবির ‘ভবিষ্যত রাজনৈতিক কৌশলের’ অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারে।
তারা প্রশ্ন তুলেছেন, আম্মার নির্বাচিত হওয়ার আগেই যদি তাকে বহিষ্কার করা হয়ে থাকে, জিএস হওয়ার পরও কেন আম্মারের ‘সব কাজে বৈধতা’ দিয়ে গেল ছাত্রশিবির?
কী বলছেন ছাত্রনেতারা
সালাউদ্দিন আম্মারকে ছাত্রশিবির থেকে বহিষ্কারের বিষয়টিকে ‘আইওয়াশ’ হিসেবে দেখছে ছাত্রদল।
সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শাকিলুর রহমান সোহাগ বলেন, “আম্মারকে শিবির থেকে বিচ্ছিন্ন দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে তিনি সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শিবিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, তার মানে এই নয় যে, আম্মার শিবির করেন না।
“এটি তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ। শিক্ষার্থীদের কাছে তাকে ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা হচ্ছে।”
ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফও আম্মারকে বহিষ্কারের বিষয়টিকে ‘লোক দেখানো’ বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, “আমরা বারবারই বলে এসেছি আম্মার শিবিরেরই অংশ। অফিসিয়ালি শিবিরের করতে না পারা কাজগুলোই আম্মার করে। এখন এসে আম্মারের শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক নেই- এমন একটি ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
“এটি নেহাতই শিবিরের আরেকটি অপকৌশল। অতীতেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সংগঠনটি তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবহার করেছে। এখনো একই ধরনের কৌশল নেওয়া হচ্ছে।”
গত জুনে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় এক হল সংসদ নেতাকে লাঞ্ছিত ও হেনস্তার অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য, হুমকি, শিক্ষার্থী পেটানো এবং ডিনদের পদত্যাগে বাধ্য করার মতো নানা ঘটনায় বিতর্ক পিছু ছাড়েনি আম্মারের।
গত ২৮ জুলাই প্রেমের প্রস্তাব সংক্রান্ত এক ছাত্রীর অভিযোগের জেরে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় পেটান আম্মারসহ রাকসু ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। প্রক্টর দপ্তরে প্রথমবার হামলার পর তারা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে রড, বাঁশ ও বেল্ট দিয়ে বেধড়ক পেটান।
এ ঘটনায় রাকসু ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ‘একপাক্ষিক’ সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তুলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ‘হুমকি’ দেন রাকসুর ভিপি, শিবির নেতা মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। সেই সংবাদ সম্মেলনে জাহিদের পাশে ছিলেন আম্মার।
সবশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাবির এক শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে রাজশাহী রেলস্টেশনে দফায় দফায় হামলা ও ভাঙচুর চালান একদল শিক্ষার্থী, যাতে নেতৃত্ব দেন আম্মার।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ কায়সার আহমেদ বলেন, “শিবিরের একটি এক্সটেন্ডেড ভার্সন হলো আম্মার। সংগঠন হিসেবে শিবির যেসব কর্মকাণ্ডের দায় নিতে পারত না, সেগুলো আম্মারকে দিয়ে করানো হয়েছে।
“রাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষের দিকে এবং আম্মারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরবর্তী নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তার পুনরায় ম্যান্ডেট পাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এ কারণেও আম্মারকে বহিষ্কার দেখিয়ে নতুন কোন ‘বি’ টিমকে সামনে আনা হতে পারে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “রাজনীতিতে মিথ্যা বা প্রতারণার কোনো সুযোগ নেই।
“আম্মারকে ঘিরে শিবিরের সাম্প্রতিক অবস্থান তাদের আগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই আমরা মনে করি।”
তিনি বলেন, “ডোমদের নাকি দুর্গন্ধ নাকে না গেলে খাবার হজম হয় না, একইভাবে শিবিরের নোংরামি ছাড়া সুস্থ ধারার রাজনীতি কখনোই পছন্দ না। আর এ কারণেই তারা বারবার রাজনীতির নামে এমন নোংরামি করে।”
আম্মারকে কেন ‘বহিষ্কার’?
শিবির নেতারা বলছেন, নৈতিক পদস্খলন, নারীদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্য, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনের কারণে সালাউদ্দিন আম্মারকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে সালাহউদ্দিন আম্মার অভিযোগের প্রমাণ দিতে ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুঁড়েছেন শিবিরকে। শিবিরের ‘সাথি’ পদে ছিলেন কি না তা স্পষ্ট না করে তিনি ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, ডানপন্থি সংস্কৃতিচর্চার কারণে তাকে শিবিরের মানদণ্ডে ফেলা যেতে পারে। তিনি শিবিরের অফিসিয়াল গানে অভিনয় করেছেন; কাজ করেছেন কলরবের সঙ্গেও।
বুধবার প্রকাশ্যে আসা তিনটি চিঠিতে আম্মারকে শিবির থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি সামনে আসে। এ প্রসঙ্গ সোশাল মিডিয়াতে সামনে এসেছে এক শিবির নেতার মাধ্যমেই।
আর চিঠিগুলো সামনে আনা হয় এমন দিনে, যেদিন ছিল রাকসুর শেষ অধিবেশন।
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শিবিরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তৎকালীন সভাপতি এবং বর্তমানে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের সই করা একটি চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে ‘পদ-বাণিজ্যের’ অভিযোগের কথা বলা হয়। চিঠিতে আম্মারের ‘সাথি’ পদ স্থগিত করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়।
পরবর্তীতে আরেকটি চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগগুলোর ‘যথাযথ জবাব’ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় আম্মারের ‘সাথী’ পদ বাতিল করে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এরপর চলতি বছরের ৩১ জুলাই শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের সই করা আরেকটি চিঠিতে বহিষ্কারের বিষয়টি জানিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের আম্মারের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ওই চিঠিতে আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং ‘ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার’ কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়।
শিবিরের ভাষ্য, তোপ উমামার
আম্মারকে ‘ডামি প্যানেল’র মাধ্যমে রাকসু নির্বাচনে জেতানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি মেহেদী হাসান।
তিনি বলেন, “আম্মার যদি আমাদের জনশক্তি হতেন বা ‘ডামি প্যানেলের’ অংশ হতেন, তাহলে রাকসু নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে তাকে বহিষ্কার করা হতো না। আমাদের কোনো ডামি প্যানেল ছিল না। আমাদের ‘এ’ টিম, ‘বি’ টিম কোনোটিই ছিল না। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রার্থী নিয়ে একটি ইনক্লুসিভ প্যানেল করার চেষ্টা করেছি।”
মেহেদী সজীবের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “রাকসু নির্বাচনের সময় তিনি শিবিরের দায়িত্বশীল ছিলেন না। পরবর্তীতে তিনি শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দায়িত্বশীল হয়েছেন।
“নির্বাচনের সময় শিবিরের পক্ষ থেকে মেহেদী সজীবকে সংগঠনের দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনো বক্তব্যও দেওয়া হয়নি।”
আম্মারকে এক বছর আগে বহিষ্কার করা হলেও সেই তথ্য কেন এখন সামনে আনা হল, এমন প্রশ্নে মেহেদী হাসান বলেন, “আমাদের সংগঠনে কাউকে বহিষ্কার করা হলে, সেটি পাবলিক করা হয় না। এটি আমাদের নীতিবিরুদ্ধ। আমাদের সাবেক এক ভাই ভুলবশত এটি করেছে। আমরা ইতোমধ্যেই তার কাছে এর জবাব চেয়েছি।”
সালাহউদ্দিন আম্মার তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ দিতে যে ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুঁড়েছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা অভিযোগ পাওয়ার পর তাকে আত্ম সমর্থনের সুযোগ দিই, কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তাই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।”
মেহেদী হাসান বলেন, “ছাত্রশিবির আম্মারের কোনো কাজ সমর্থন করেনি। তিনি রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ায় রাকসুতে আমাদের সংগঠনের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে শুধু সমন্বয় করেছে, সমর্থনের কোনো বিষয় নেই।”
এদিকে আম্মারের শিবির সংশ্লিষ্টতার কথা প্রকাশ্যে আসার পর সংগঠনটির ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিয়ে তোপ দেগেছেন সাবেক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা। তিনি অভিযোগ করেছেন, জুলাইয়ের ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ আন্দোলনকে ‘ভাই-ব্রাদার কোরাম আর শিবিরের’ হাতে বন্দি করা হয়েছে।
উমামা ফাতেমা ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “জুলাই আন্দোলনের সময় সকল ছাত্র সংগঠনকে মাইনাস করে শিবির ও ছাত্রশক্তি কোরামের (গুপ্তশিবির) লোকজনকে সমন্বয়ক কমিটির অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তার কারণে ৫ আগস্টের পরে যদু-মধু-কদু এসে সর্বেসর্বা হয়ে গেছে।”
তিনি এও লিখেছেন, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ১৭ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের সাথে ন্যূনতম সম্পর্ক না থাকা মানুষ উড়ে এসে নেতা হয়েছে। সালাউদ্দীন আম্মার তাদের অন্যতম।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রশিবির পরিচিত হলেও ছাত্রসংগঠনটি তা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। শিবিরের পাশাপাশি জামায়াতের কড়া সমালোচনা করেছেন ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক সময়ের সদস্য সচিব উমামা।
তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের জার্নি এতদিন ছিল ৫০ বছরের। এখন তো জামায়াতের কারণে হিস্ট্রি ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকে শুরু করতে হয়। একদল মোনাফেকের হাতে পড়ছে দেশের রাজনীতি।”
