জীবিকার তাগিদে আগুনে সব পুড়ে যাওয়ার ক্ষত কাটতে না কাটতেই ঢাকার বঙ্গবাজারের দোকান মালিকরা শুধু একটি চৌকি নিয়েই বসেছেন খোলা আকাশের নিচে। ঈদের কেনাকাটার মৌসুমে কিছুটা হলেও ব্যবসার আশা তাদের।
Published : 13 Apr 2023, 12:55 AM
পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজারের দোকান মালিকদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন অনেকেই। আপাতত চৌকি পেতে তাদের ঈদের আগে কেনাবেচার সুযোগও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই বঙ্গবাজারে যাদের পোশাক বিক্রি হত, সেই কারখানা মালিকদের দুশ্চিন্তা কাটছে না।
তারা বলছেন, ঈদের আগে অর্ধেক বাকিতে দোকানে দোকানে পোশাক দিয়ে আসেন তারা। এবারও দিয়েছেন। বেচাকেনা শেষে ঈদের আগের রাতে দোকান মালিকেরা তাদের বাকি টাকা পরিশোধ করে দেন। কিন্তু এবার আগুন লাগার পর দোকান মালিকরা বাকি পরিশোধের গরজ দেখাচ্ছেন না।
দেশে পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজারের একটি বঙ্গবাজার গত ৪ এপ্রিল ভয়াবহ আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এতে ৩ হাজার ৮৪৫টি দোকান পুড়ে ৩০৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তদন্ত কমিটি হিসাব দেখিয়েছে।
ঈদের আগে বিপুল পরিমাণ নতুন কাপড় তুলেছিলেন দোকানিরা; সেগুলো পুড়ে যাওয়ায় তাদের আর্তনাদ দেখে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন তাদের সহায়তায়।
পুরানো খবর:
পুড়ল বঙ্গবাজার: এক আগুনে ছাই হল হাজারো স্বপ্নপুরানো খবর:
আগুনে পোড়া বঙ্গবাজারে চৌকি পেতে ব্যবসাঅর্থ সহায়তা আসার পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ দ্রুত পরিষ্কার করে একটি অংশে বুধবার থেকে দোকানিদের চৌকি পেতে বসার সুযোগ করে দিয়েছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ।
তবে এই বঙ্গবাজারের পেছনের ব্যবসায়ীরা আড়ালেই থেকে গেছেন। তাদের কেউ কেউ বুধবার দোকানিদের নতুন ভাবে বেচাকেনার উদ্বোধন দেখতে এসেছিলেন। সেই সঙ্গে বাকি অর্থ পরিশোধের তাগাদা দেওয়াও ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
তাদের একজন ‘স্বর্ণা গার্মেন্টস’ মালিক লুৎফর রহমান জানালেন, এই ঈদে বঙ্গবাজারের আটটি দোকানে ১০ লাখ টাকার পোশাক দিয়েছেন তিনি। আগুন লাগার পর থেকে দোকানিরা বলছেন, তাদের সব মাল পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।
দোকানদাররাও এখন আমাদের পাত্তা দিচ্ছে না, আবার সরকারের পক্ষ থেকেও সহায়তার কোনো আশ্বাস নেই, বলেন তিনি।
লুৎফরের কারখানার একটা অংশ ছিল বঙ্গবাজারের তিন তলাতেই, আর বাকি অংশ তিনি সুরিটোলায় সরিয়ে নিয়ে গেছেন। তার কারখানায় মূলত মেয়েদের কামিজ তৈরি হয়।
দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বাকিতে বঙ্গবাজারে মালামাল দিয়ে আসছিলেন জানিয়ে লুৎফর বলেন, দেশীর বাজারের তৈরি পোশাকের ব্যবসার ৮০ শতাংশই এমন বাকিতে চলে। যেমন ঈদের আগে ১০ লাখ টাকার কাপড় সরবরাহ করে তিনি অগ্রিম পেয়েছিলেন ২ লাখ টাকা।
“হয়ত কোথাও ১০ লাখ টাকার মাল দিছি, ২৬-২৭ রোজায় ডাইকা হ্যারা ৮ লাখ টাকার ক্যাশ আর ১ লাখ টাকার চেক ধরায়া কইত, বাকি এক লাখ টাকা ‘লেস’ দিতে হইব। আমরাও খুশি মনে মাইনা নিই। হেই টাকায় ইসলামপুরের কাপড়ের দাম শোধ করি, কারখানার কাটিং মাস্টার, কারিগর সবার বেতন দিয়া আমার লাভ থাকে। এইবার একেবারে সব খালি। কর্মচারীগো বেতন ক্যামনে মিটামু জানি না। কাপড়ের দামের টাকাটাও তো দিতে হইবে।”
বঙ্গবাজারে আগুন লাগার পর মহানগর শপিং কমপ্লেক্স, এনেক্সকো টাওয়ার থেকে দোকানের মালামাল সরিয়ে রাস্তার উপর বসে থাকতে দেখা যায় দোকানিদের
মক্কা-মদিনা গার্মেন্টসের মালিক মনিরুল ইসলাম মধু ছয় মাস আগে বঙ্গবাজার থেকে নিজের কারখানা সরিয়ে নেন কামরাঙ্গীরচরে। ঈদের আগে ১০টি দোকানে পোশাক সরবরাহ করেছেন। তার অবস্থাও লুৎফরের মতো, এখন দোকানিদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
মনিরুল বলেন, “আমাগো দিকে কেউ তাকাইতেছে না। এই মার্কেটে যেই মাল পুড়ছে, তার অর্ধেকেরও বেশি আমাগো মতো কারখানা মালিকগো সাপ্লাই করা। ৮০ পার্সেন্টই বাকির মাল। মানে আমরা দিছি, এহনও টাকা পাই নাই। এহন দোকানদারগো দোকান পুড়ছে বইলা হ্যারা সাহায্য টোকাইতাছে। তারা আমাগো মালের ট্যাকাও দিতে চায় না, আবার সরকারও আমাগো দেখতাছে না। আমরা মানববন্ধন করলাম কিন্তু কেউ জিগাইলোও না আমরা কারা, কী চাই।”
মনিরুল, লুৎফরদের মতো অভ্যন্তরীণ বাজারে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের একটি সংগঠন রয়েছে, নাম অভ্যন্তরীণ পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতি।
তবে কত সংখ্যক ব্যবসায়ী বঙ্গবাজারে পোশাক সরবরাহ করে থাকেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি এই সমিতির নর্থ-সাউথ রোড শাখার সভাপতি আশরাফউদ্দীন।
তিনি বলেন, “আমাদের কিছু সদস্য আছে যারা বঙ্গবাজারে মাল দিত। কিন্তু এখন কে কে সেখানে ব্যবসা করত, তার পুরো তথ্য আমাদের নলেজে তো নাই। আমরা বলছি, যারা বঙ্গবাজারভিত্তিক ব্যবসা করে, তারা যেন সমিতিকে জানায়।
“কোন দোকানে তারা কত টাকা পায়, সেই প্রমাণ থাকতে হবে। বঙ্গ মার্কেট পুড়ছে, তাদের কারখানা তো আর পোড়ে নাই, কারখানা মালিকের কাছে রিসিট বা ডকুমেন্ট থাকার কথা। এই প্রমাণসহ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা তাদের দাবি-দাওয়াগুলো উত্থাপন করব। সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ তো আর কেউ পাবে না। যতখানি পারা যায়, আমরা চেষ্টা করব।”
কারখানা মালিকদের পাওনার বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমাগো দোকানদারেরা একটা কাপড় বাঁচাইতে পারে নাই। আমরা চেষ্টা করতাছি দোকানদারগো বাঁচাইতে। আর হেই পাইকারেরা আইছে টাকা চাইতে। আপনাগো কাছে গেলে আপনারা তাগো কইবেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাইতে।”
চৌকির দোকান প্রথম দিনে ‘জমেনি’
বঙ্গবাজারের সামনের রাস্তাটি আগুন লাগার পর থেকেই বন্ধ ছিল। নয় দিন পর বুধবার চৌকি বসিয়ে কেনাবেচা শুরুর সঙ্গে সেটিও খুলে দেওয়া হয়েছে।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বঙ্গবাজারের উল্টোদিকের বঙ্গ ইসলামিয়া মার্কেট, বঙ্গ হোমিও কমপ্লেক্স, পাশের এনেক্সকো টাওয়ারের দোকানগুলোও খুলেছে।
দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্থায়ী ভিত্তিতে চৌকি পেতে ব্যবসা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।
প্রথম দিনে প্রায় সাতশ জনকে দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। চৈত্রের খরতাপের মধ্যে ছাতা মাথায় চৌকির উপর কেনা-বেচা শুরু করেছেন দোকানিরা।
বঙ্গবাজার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জানান, প্রতিটি দোকানের জন্য একটি করে পাঁচ*তিন ফুটের চৌকি বসাতে দেওয়া হচ্ছে। প্রথম দিনে ৬৮৮ জনকে ব্যবসার জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শিশুদের পোশাক বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম দুপুরে বলেন, ক্রেতারা আসছে। তবে বেশিরভাগই উৎসাহী মানুষ, নেড়ে-চেড়ে দেখছে শুধু। ফলে বেচা-বিক্রি ‘জমেনি’।
আমিনুল আশা করছেন, ঈদের আগে ১০ দিন বেচা-কেনা ভালো হবে। তাদের দোকান মালিক আরও কাপড় তুলতে এর মধ্যেই পাইকারদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মালিকানাধীন ১ দশমিক ৭৯ একর জায়গার উপর গড়ে ওঠা টিন-কাঠের বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সটি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় আগুনে। গত দুদিনে টিন-গ্রিলসহ কয়েকহাজার টন লোহা সরিয়ে জায়গাটা অস্থায়ীভাবে ব্যবসার জন্য উপযুক্ত করার কাজ করছে ডিএসসিসির কর্মীরা। আগুনে পুড়ে যাওয়া চারতলা মহানগর কমপ্লেক্স ভাঙার কাজ বুধবার পর্যন্ত শেষ হয়নি।
ডিএসসিসির মেয়র তাপস বলছেন, ভবনটি ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার কাজ অচিরেই শেষ হয়ে যাবে এবং পুরো জায়গাজুড়ে ব্যবসায়ীরা বসতে পারবেন। তাদের মাথার উপর ছাউনি ও বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থাও করা হবে।