ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে কেন? এমএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান বলছেন জমি সংকটের কথা
মোবারক হোসেন বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করে ঢাকার আশপাশে টাউনশিপ গড়ে তুলতে পারলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্যও অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করা সম্ভব।
ঢাকায় ফ্ল্যাটের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ওপর কোনোপক্ষের ‘একক নিয়ন্ত্রণে নেই’ বলে মনে করেন আবাসন খাতের কোম্পানি এমএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন।
তার ভাষ্য, শুধু নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার কারণে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে–এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ জমির সংকট।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’-এ দেশের আবাসন খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, ফ্ল্যাটের দাম, নির্মাণের মান, ব্যবসার চ্যালেঞ্জ ও নিজের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন মোবারক হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।
ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার অভিজ্ঞতা থেকে যেটা দেখছি, ঢাকায় ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধির পেছনে কারণ হচ্ছে জমির অভাব। চাহিদার তুলনায় জমি কম। জমির সংকট বেশি হওয়ায় এর মূল্য বাড়ছে, যার ফলে ফ্ল্যাটের দামও বাড়ছে। এটা কারও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই।”
তিনি বলেন, শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতেও ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে। তবে ঢাকায় এ প্রবণতার পেছনে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি বেশি প্রভাব ফেলছে।
মোবারক হোসেন বলেন, মানুষের মৌলিক চাহিদার একটি বাসস্থান। নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে উচ্চ আয়ের মানুষ—সবারই আবাসনের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কারণে মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে।
এর উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে চাকরি করলেও অনেক কর্মকর্তা পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন।
ঢাকার বাইরে আবাসন গড়ার পরামর্শ
ফ্ল্যাট কেনা বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে—এমনটা মনে করেন না মোবারক হোসেন। তার মতে, মানুষের আবাসনের চাহিদা রয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। তবে এ চাহিদার চাপ কমাতে ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমরা যদি এই চাহিদাকে একটু ঢাকাকেন্দ্রিকতার বাইরে নিয়ে যেতে পারি, ঢাকার আশপাশের যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করতে পারি, বিভিন্ন জায়গায় টাউনশিপ গড়ে তুলতে পারি, তাহলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্যও কিছুটা দূরত্বে অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে মানুষের আবাসনের স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।”
আবাসন খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় হিসেবে দেখছেন তিনি।
মোবারক হোসেন বলেন, “ফ্ল্যাট কেনাবেচার অবস্থা এখন কিছুটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই খাতের পুরো পরিস্থিতিতেই পরিবর্তন আসছে। আবাসন তো ভোগ্যপণ্যের মতো নয়। যার অনেক টাকা আছে, তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট থাকার পরও যদি আরেকটি কিনতে চান, তখন বাজারে কিছুটা স্থবিরতা আসে।”
ডেভেলপারদের মুনাফা
আবাসন ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মোবারক হোসেন বলেন, একসময় এ খাতে মুনাফার সুযোগ বেশি থাকলেও এখন আর ‘আগের মত নেই’। এর কারণ হিসেবে তিনি জমির দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলেন।
বিষয়টি বোঝাতে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথোপকথনের উদাহরণ দেন তিনি। মোবারক বলেন, তার একটি প্রকল্পের জমির মালিক ছিলেন ওই ব্যবসায়ী।
জমি বিক্রি করতে এলে তিনি তাকে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন করেছিলেন, স্বর্ণের দাম যখন ভরিতে ৫০ হাজার টাকা ছিল, তখন ব্যবসায়ীদের অবস্থা ভালো ছিল, নাকি এখন দাম দেড় থেকে দুই লাখ টাকা হওয়ার পর ভালো?
মোবারকের ভাষ্য, জমির দাম কম থাকার সময় আবাসন ব্যবসায়ীদের মুনাফার সুযোগ বেশি ছিল। এখন জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই সুযোগ কমেছে।
নির্মাণসামগ্রীর মান ও ক্রেতার সচেতনতা
আবাসন প্রকল্পে রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে মোবারক হোসেন বলেন, এসব অভিযোগের ‘সব ক্ষেত্রে ভিত্তি নেই’।
তার দাবি, নির্মাণকাজে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি দেখেছেন, নির্মাণসামগ্রীর মানের পাশাপাশি সেগুলোর সঠিক অনুপাত ও ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।
“সমস্যা হতে পারে সিমেন্টের অনুপাত ঠিক না রাখা কিংবা যে পরিমাণ রড দেওয়ার কথা, তা না দেওয়া। এখন ক্রেতারা অনেক বেশি সচেতন। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনার আগে ঘরে বসেই মোবাইল ফোনে এর কাগজপত্র যাচাই করা সম্ভব।”
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ‘অস্বাভাবিক কম দামের’ প্রস্তাব দেখলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
মোবারক হোসেন বলেন, “আপনি বুঝছেন, একটি জিনিস তৈরি করতে ১০০ টাকা লাগবে। কিন্তু যিনি বিক্রি করছেন, তিনি আপনার কাছে ৬০ টাকা দাম চাইছেন। আপনি শুধু কম দাম দেখে সেখানে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন কেন? দেখে-শুনে ভালো জায়গায় বিনিয়োগ করলে ক্রেতা ও বিক্রেতা—কেউই ঠকবেন না।”
তার পরামর্শ, ফ্ল্যাট বা জমি কেনার আগে ডেভেলপার কোম্পানির পরিচিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা এবং প্রকল্পের কাগজপত্র যাচাই করা উচিত।
আবাসন প্রকল্পে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মোবারক হোসেন দাবি করেন, তার পরিচিত এবং যেসব কোম্পানির সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, সেগুলোর ভবনে এ ধরনের কোনো ঘটনার কথা তার জানা নেই।
টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ
মোবারক হোসেন বলেন, আবাসন ব্যবসায় প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবসায়িক কৌশল পরিবর্তনের পাশাপাশি ধৈর্য ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি।
“এই খাতে ফ্ল্যাট দেখে কেউ বুকিং দেন না। একজন ক্রেতা জীবনের সঞ্চিত অর্থের একটি অংশ আগাম দেন, এরপর কিস্তিতে বাকি টাকা পরিশোধ করেন। তার আমানত ও টাকা—দুটিই আমার কাছে থাকে।
“কাজেই এই খাতে ব্যবসা করতে হলে পেশাগত নৈতিকতা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করতে হবে। যারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসা করতে চান, তারা চাইলেই এই খাত থেকে সরে যেতে পারেন না।”
বিরুলিয়ায় আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনা
আবাসন ব্যবসার পাশাপাশি এমএইচ গ্রুপের পোশাক ও বায়িং ব্যবসা রয়েছে। মোবারক হোসেন জানালেন, তার নিজের প্রজন্মে শিল্প খাতে আর নতুন করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেই। তার পরবর্তী প্রজন্ম এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, সাভারের বিরুলিয়ায় তাদের ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ নামে একটি আবাসন প্রকল্প রয়েছে। তার দাবি, মূল ঢাকা থেকে সরলরেখায় প্রকল্পটির দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।
বিরুলিয়া এলাকায় বর্তমানে আটটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ সংখ্যা ১৩টিতে পৌঁছাতে পারে জানিয়ে মোবারক হোসেন বলেন, প্রকল্পে স্কুল, কলেজ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তুরাগ নদী মাঝখানে থাকায় প্রকল্পটির সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে ড্যাপের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে মোবারক হোসেনের মনে হয়েছে, এলাকাটিতে জমির দাম এখনো ‘তুলনামূলকভাবে কম’।
তিনি বলেন, “এই জায়গাটি যদি আমি নিতে পারি, তাহলে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে। মাঝে মাঝে সহকর্মীদের বলি, আমার যদি অনেক টাকা থাকত, আমি এটি বিক্রি করতাম না, রেখে দিতাম। কারণ আজ থেকে আট-দশ বছর পর এর দাম উত্তরের চেয়েও বেশি হয়ে যেতে পারে।”
