Published : 30 Jun 2025, 08:21 AM
সময় শেষ হওয়ার পরেও ‘নন-ব্যাংকিং’ সম্পদ ধরে রাখায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিমানার মুখে পড়েছে অগ্রণী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে না জানিয়ে তারা ১১টি ‘নন-ব্যাংকিং’ সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে রেখেছে। এর মধ্যে ছয়টি সম্পদের বিপরীতে তাদেরকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর তার যে জামানত ব্যাংকের মালিকানায় চলে আসে, সেটাই ‘নন ব্যাংকিং’ সম্পদ।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের কাছে এ ধরনের জামানত বা সম্পদ থাকলে তা সাত বছরের মধ্যে বিক্রি করে দিতে হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে তা আরও ৫ বছর বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কোনো গ্রাহক যখন খেলাপি হন, তখন ঋণদাতা ব্যাংক তার জামানতের মালিকানা পাওয়ার জন্য অর্থঋণ আদালতে মামলা করেন। অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৩ ধারা অনুযায়ী, গ্রাহকের যে সম্পদ জামানত হিসেবে রয়েছে, তা ব্যাংকের নামে ডিক্রি করে দেয়।
নিয়ম মোতাবেক, ঋণদাতা ব্যাংককে খেলাপি ঋণের বিপরীতে পাওয়া সম্পদের মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য সহকারী ভূমি কমিশনারের কার্যালয়ে নামজারির আবেদন করতে হয়। কারণ অর্থঋণ আদালত জামানতের সম্পদের অধিকার দিলেও নামজারির আগ পর্যন্ত সম্পদটি গ্রাহকের নামেই রয়ে যায়। তাই এ সম্পদ ব্যাংকের নামে নেওয়ার জন্য নামজারির এই মামলা করা হয়। তারপর ব্যাংক এ সম্পত্তি নিজের নামে নিয়ে আসে এবং ব্যাংকটির ‘নন ব্যাংকিং’ সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে, এমন ১১টি ‘নন-ব্যাংকিং’ সম্পদ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত না করে দীর্ঘদিন নিজেদের অধিকারে রেখেছে অগ্রণী ব্যাংক। এর মধ্যে ছয়টি সম্পদের কারণে তাদের তিন লাখ টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাকি পাঁচটির মধ্যে তিনটি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, একটি ইতোমধ্যে বিক্রি করা হয়েছে; আরেকটি ব্যাংক ব্যবহার করছে।
জানা যায়, ছয়টি ‘নন-ব্যাংকিং’ সম্পদের ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের মেসার্স অঙ্গীকার, বগুড়ার শিববাটি শাখার মেসার্স বিকন ট্রেড এন্টারপ্রাইজ, দিনাজুপুরের পুরারতন বাজার শাখার ঋণগ্রহীতা মো. আলতাফ হোসেন, জয়পুরহাটের জয়পুরহাট শাখার মেসার্স উত্তরা মোটরস অ্যান্ড ফাউন্ড্রিজ, ঢাকার জিনজিরার মেসার্স বেদের হোসেন ও ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কর্পোরেড় শাখার নাইট ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আনোয়ারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জরিমানা করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “নন-ব্যাংকিং সম্পদ এতদিন ধরে রাখা হয়েছিল। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমি সিইও হিসেব দায়িত্ব নিয়েছি ২০২৪ সালের নভেম্বরে।”
তিনি বলেন, “এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও উঠে এসেছে। তাই আইন মোতাবেক এখন যা যা করার দরকার, আমরা তাই করব। ব্যাংক কোম্পানি আইন ভঙ্গ করার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংক কোম্পানি আইন মোতাবেক সব ব্যাংকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ”
তিনি বলেন, “এসব নন-ব্যাংকিং সম্পদ বিক্রি করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তা দ্রুতই করা হবে বলে আমি আশা করি।”
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, সম্পদ-কেনাবেচা ব্যাংকের মূল কাজ নয়। তাই খেলাপিদের জামানতের বিনিময়ে পাওয়া সম্পদ কোনো কারণে বিক্রি করতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হয়। অগ্রণী ব্যাংককে যে ছয়টি নন-ব্যাংকিং সম্পদের জন্য জরিমানা করা হয়েছে; সেই সম্পদগুলো সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে না জানিয়ে ধরে রেখেছিল ব্যাংকটি।
যে ছয়টি সম্পদ ধরে রাখার কারণে জরিমানা করা হয়েছে, সেগুলো ১১ থেকে ১৭ বছর নিজেদের কাছে রেখেছে অগ্রণী ব্যাংক। ছয়টি সম্পত্তির মধ্যে দুটি ২০১২ সাল থেকে, একটি ২০০৭ সাল ও বাকি তিনটি ২০১৩ সাল থেকে অগ্রণী ব্যাংকের অধীনে রয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়নি।
বিষয়টি নজরে এলে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে অগ্রণী ব্যাংক পর্যাপ্ত দর না পাওয়ার মত কারণ দেখায়।
ব্যাংকটির ঋণ অনুমোদনকালে জামানত প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকার কারণে এমন সমস্যা হয়েছে বলে জানায় অগ্রণী ব্যাংক।
অগ্রণী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব নন-ব্যাংকিং সম্পত্তি ব্যাংকে ছিল। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হওয়ায় এ বিভাগের কর্মকর্তারা বারবার বদলি হয়েছেন। তাতে অনেকটা অবহেলা করেই ফেলে রাখা হয়েছে এসব কাজ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঋণ দেওয়ার সময় এসব জামানতের বাজার মূল্যায়ন সঠিকভাবে করতে পারেনি, কিংবা ইচ্ছে করেই করেনি।
অগ্রণী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, সম্পদের মূল দামে হেরফের রয়েছে। বন্ধক রাখার সময় সম্পদের মূল্য যা দেখানো হয়েছে, সেটা মূল দামের চেয়ে অনেক বেশি দেখানো হয়েছে। তাতে সম্পত্তি বিক্রি করতে পারছে না অগ্রণী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছরের মধ্যে এসব সম্পত্তি বিক্রি করার নির্দেশনা দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংককে। এক বছরের মধ্যে এসব সম্পত্তি বিক্রি করতে না পারলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী অগ্রণী ব্যাংককে প্রতিদিনের জন্য ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক।